শাড়ির পাড়

আমাদের নতুন সময় : 08/08/2019

কাকলী আহমেদ

আমাদের মা খালারা শাড়ি পরতেন। মা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চিরায়ত শাড়ি পরা নারী। খালা মানেও যেন তাই। সময়ের বিবর্তনে এ-যুগে মা খালারা এখন আর ঠিক শাড়ি পরা নারী হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। সে যুগে নানী-দাদীরা পরতেন সাদা রঙের শাড়ি। বয়সের তারতম্যভেদে রঙের বাছ-বিচার শাড়ি পরায় অনেকবেশি গুরুত্ব বহন করতো। আমার মায়ের কাছে শুনেছি, মা ক্লাস সেভেন থেকে এইটে ওঠার সময় লম্বা ফ্রক আর পায়জামা ছেড়ে শাড়ি পরা ধরেছেন। পরনের পোশাক বলতে শাড়িই ছিলো তার একমাত্র ভূষণ। সে যুগে বিধবা মাত্রেই পাড়ছাড়া সাদা ধবধবে শাড়ি পরতেন। ক্বচিৎ সাদা ধুতি আর এক কড়ের চার ভাগের এক ভাগ সমান চিকন নীল, গাঢ় খয়েরি অথবা হালকা খয়েরি পাড়ওয়ালা শাড়িই ছিলো বৈধব্যের বেশ।
ষাটের দশকে মায়েরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তেন, সাদা শাড়ি আর নকশাদার পাড়ের শাড়ি পরতেন। চিকন সুতোর এই সূতি শাড়িই ছিলো বেশ দামী। যতো সূ² বুনন, ততো বেশি দাম। শাড়ির পাড়ের বৈচিত্র্য ও নকশা ছিলো নানা রকমের। নানা রকম পাড়ের নকশার কারণে শাড়ি মনে দাগ কেটে যেতো । সাদা শাড়ির সাথে সুচিত্রা সেন-কাট গলার বøাউজ পরা ছিলো তখনকার দিনের ফ্যাশন। ষাটের দশকে সিøভলেস বøাউজেরও চল ছিলো। গোল গলা, সুচিত্রা সেন-গলা, বোট গলাÑÑএমনতর নানা রকম ডিজাইন দেখা যেতো বøাউজের গলায়। সিনেমায় ও ছবিতে সে-যুগের অনেকের শাড়ি ও বøাউজের ফ্যাশন-এর ধরন চোখে পড়ে। মা-খালাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে শাড়ির রঙ বেশ সরাসরি একটা প্রভাব ফেলতো। চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে এক ধরনের রঙ পরলেও পঞ্চাশের সীমানায় এসে অনেকেই চড়া রঙের শাড়ি পরতে খুব বেশি কুণ্ঠাবোধ করতেন, যা আজকাল একেবারেই কেউ মেনে চলে বলে হয় না। দোকানে শাড়ি কিনতে গেলে হালকা রঙের শাড়ি দেখতে চাইলেই আজো দোকানিরা বলে ওঠে, “কী মুরুব্বী-র জন্যে লইবেন?”
লাল শাড়ি ছিলো কেবল নতুন বউয়ের রঙ। নতুন বৌ মানেই লাল বেনারসি অথবা কাতান। বিয়ের পরের দিন বাসর ঘর থেকে বের হতো লাল টুকটুকে তাঁতের শাড়ি, জরির পাড়। প্রায় আধ হাত ঘোমটা। বৌ মানেই মাস, বছর, বছরের পর বছর সে ঘোমটার আড়ালেই তার ব্যক্তিত্ব চাপা পড়ে থাকা।
এমন কি সত্তরের দশকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিয়ের শাড়ি হিসেবে ‘মালা শাড়ি’ ও লাল আর ক্যাটকেটে হাওয়াই মিঠাই রঙে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো সময়ের র্ঘূনে ভূষণে এসেছে পরিবর্তন। এখন মা-খালাদের আর শাড়ি পরতে দেখাই যায় না। আমি যে যুগে বৌ বা মা হয়েছি, সে সময়ে আমিও শ্যালোয়ার কামিজ, জিন্স টপস, ফতুয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। আমার সন্তানের চোখে মা মানে চিরায়ত আটপৌরে সূতি শাড়ি পরা মা আর চোখে ভাসবে না। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে কলিং বেল দিলে সূতিশাড়ি পরা লম্বা চুলের সেই মা দরোজা খুলে দিচ্ছে, এমনটাও হবে না। এখনকার মায়েরা শাড়ির চেয়ে সালওয়ার-কামিজসহ আরো নানা পোশাকেই নিজেকে আধুনিক ও আরামদায়ক মনে করে। অতি আধুনিকতার ছাঁটেও নিজকে বøাউজের নানা রকম ফ্যাশানে হালের স্মার্ট ভদ্রমহিলা ভেবে মনে মনে সুখ কুড়োয়। শাড়ি আর মা এই অভিন্ন সত্তার যে ভালোবাসা-নিংড়ানো সুখ, তাও বুঝি আর এ প্রজন্ম খুঁজবে না। মায়ের শাড়ির খুঁট ধরে থপ থপ করে ছোট ছেলেমেয়েকে হাঁটতে দেখি না। মায়ের গায়ের গন্ধ খুঁজে পেলেও মায়ের শাড়ির গন্ধ পাওয়া যায়ূ না! আলাদাভাবে তেমন করে এসব মনচোখে জ্বলজ্বল করে ভাসবে না। সন্তান মায়ের কোলে বড় না হয়ে কাজের মানুষের কোলেই বড় হচ্ছে। কর্মজীবী মায়ের কর্মস্থলে কাজের ফাঁকে দীর্ঘশ্বাস থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। এদেশের ঐতিহ্য যুগপরম্পরায় মা, দাদী,নানীর পুরনো শাড়ি দিয়ে তৈরি কাঁথা। মায়ের শাড়ির জমিন আর নানীর শাড়ির রেখে দেয়া নকশাদার পাড় দিয়ে নিখুঁত সেলাইয়ে কী সুন্দর কাঁথা তৈরি হতো! কাঁথা শীতনিবারণে বংশপরম্পরার ভালোবাসার ওমে অল্প বা অধিক শীতে শরীর কেবল নয়, মনটাকেও সেঁকে দিতো। সে-কাঁথায় শুয়ে ঘুমের তোড়ে স্বপ্নসুখে ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম কি ময়ুরপঙ্খি নাওয়ে দুলে দুলে রাত কাটাবে না?




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]