• প্রচ্ছদ » » টাইম ম্যাগাজিন: ‘ভারত বাংলাদেশকে করায়ত্ত করবে, শঙ্কা ছিলো বঙ্গবন্ধুর’?


টাইম ম্যাগাজিন: ‘ভারত বাংলাদেশকে করায়ত্ত করবে, শঙ্কা ছিলো বঙ্গবন্ধুর’?

আমাদের নতুন সময় : 10/08/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় জুনিয়র অফিসার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ীতে হানা দেয় এবং তারা জাতির জনক ও তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে; একমাত্র বিদেশে থাকায় রক্ষা পান তার দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। পাশাপাশি জনপ্রিয় একটি অতিকথন হচ্ছে, যে সকল দেশ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল, তারা সম্মিলিতভাবে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবমুক্ত দলিল-দস্তাবেজ বলে আরেক কথা। তাদের মতে, ওই দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্র দেশের অভ্যন্তরেই দানা বেঁধেছিল, যা আগেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জানতো। তবু এখন সেই হত্যাকান্ডের দিনটি ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে সমাগত এবং কাকতালীয়ভাবে কাশ্মির ‘স্টেট’ থেকে ‘ইউনিয়ন টেরিটরি’ হিসেবে ভারতে অর্ন্তভুক্ত হওয়ায় সর্বত্র সরব আলোচনায় একীভূত। কাশ্মিরের সেই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রথিতযশা সাংবাদিক মনোজ জোসির ‘সাউথ এশিয়া জার্নালে’ মন্তব্য হচ্ছে, ওই পরিস্থিতি ‘এতোটাই বিব্রতকর যে সরকারি যুক্তিতে কাশ্মিরি মতামতকে দাবানো হয়েছে, তা দেশের অন্য যে কোনো অংশের উপরই আরোপ হতে পারে।’ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যে ভারত স্বাধীনতা অর্জনে সার্বিক সহযোগিতা জুগিয়েছে, তার কী সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ করায়ত্ত বা অর্ন্তভুক্ত করার কোনো আশঙ্কা ছিল? ইতিহাস বলে, ওই সময় বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক ড্যান কগিন তার একটি অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে। বস্তুত ঘটনা প্রবাহে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ১০ ও ১৭ জানুয়ারি যথাক্রমে ড্যান কগিনের প্রতিবেদন ‘পেইনফুল অ্যাডজাস্টমেন্ট’ বা ‘বেদনাত্মক সমঝোতা’ এবং প্রচ্ছদ কাহিনী ‘মুজিব’স রোড ফ্রম প্রিজন টু পাওয়ার’ টাইম ম্যাগাজিন প্রকাশ করে।
টাইমের সাংবাদিক ড্যান কগিনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু, ভারতের সঙ্গে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভুট্টো শ্যাম্পেন পানে যে আলাপচারিতাটি করেন, তা ‘বক্স কলামে দ্য ভয়েস অব পাকিস্তান’ উপশিরোনামে স্থান পায়। এতে ইসলামাবাদের সন্নিকটে কারাবন্দিত্ব থেকে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তরিত বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোনে ৩০ মিনিট ধরে ভুট্টো পাকিস্তানের অখন্ডতা বিষয়ে বোঝান। ভুট্টোর ভাষ্য- ‘ইট ক্যান বি এ ভেরি লুজ অ্যারেঞ্জমেন্ট, বাট ইট মাস্ট বি উইথইন দ্য কনসেপ্ট অব পাকিস্তান’। অর্থাৎ ঢিলেঢালা হলেও তা যেন পাকিস্তান ধারণার ভিত্তিতে অটুট থাকে। ভুট্টো বলেন, তার (বঙ্গবন্ধুর) হৃদয়ে পাকিস্তানের দীপশিখা থাকতেই আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাকে মুক্তি দিচ্ছি। ফিরে যেতেই মুক্তি পাবেন। আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করানো থেকে বিরত থেকেছি। ভীতি প্রদর্শন করে নয়, বরং পাকিস্তানের দুই প্রান্তের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা কথা বলেছি। এক বলয় থেকে আরেক বলয়ের সঙ্গে ঢিলেঢালা সম্পর্কের ভিত্তিতে হলেও অন্তত যেন পাকিস্তান নামটি থাকে। এটা আমাদের ১০০০ বছরের উত্তরাধিকার এবং আমরা তা ঘৃণাভরে (স্পার্ন) ফিরিয়ে দিতে পারি না।
ভুট্টোর সেই অভিব্যক্তিটি বজ্রনিনাদের মতো অবতারণা করা হয়েছে ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘মুজিব’স রোড ফ্রম প্রিজন টু পাওয়ার’ নিবন্ধে। (বাংলাদেশ অবজারভার সূত্রে ৩ জানুয়ারি) করাচিতে আয়োজিত ১ লাখ সমর্থকের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্রন্দনশীল হয়ে বললেন- ‘আপনারা কী চান মুজিবকে মুক্তি দেই’? পাশ্চাত্যের মানুষের দৃষ্টিতে তা মনে হবে ক্ষমতাসীন রোমান সা¤্রাজ্যের অধিপতি পোনটিয়াস পাইলেট বিপ্লবের আশংকায় ক্রুশবিদ্ধ ‘সান্ অব গড’ যিশু ও ‘বারাব্বা’কে পাসওভারে মুক্তির পথ দেখাচ্ছেন। ভুট্টোর বাগ্মিতায় অভিভূত জনতা সমস্বরে সে রায়টি দেয়। তাতে মাথা নিচু করে ভুট্টো বললেন- ‘ইউ হ্যাভ রিলিভড্ মি অব এ গ্রেট বার্ডেন’। অর্থাৎ আপনারা আমাকে এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে নিস্কৃতি দিলেন। এভাবে তা বর্ননা শেষে বলা হয়েছে- সেজন্য গত সপ্তাহে এ ঘোষনাটির আগেই টাইম প্রতিনিধি ড্যান কগিনকে ভুট্টো তার সন্মানিত বন্দি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত রাজনৈতিক নেতা যিনি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর (‘মুজিব’) রহমানের মুক্তির সিদ্ধান্তটি জানান। ৫ দিনে মুজিবের সঙ্গে দুটি বৈঠক শেষে ভুট্টো তার কথাটি রাখেন। একটি ভাড়া করা লন্ডনগামী পাকিস্তানি জেটলাইনারে মুজিবকে তুলে দিতে ভুট্টো ইসলামাবাদ এয়ারপোর্টে যান। অতি গোপনীয়তায় রাত ৩টায় বিমানটি ছাড়ে। প্রায় ১০ ঘন্টা পর ওই সংবাদটি পাকিস্তানি সাংবাদিকদের জানানো হয়, যখন ইরানের শাহ ৬ ঘন্টার এক সফরে ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ততক্ষণে মুজিব লন্ডন পৌঁছেছেন; তাকে ক্লান্ত দেখালেও সুস্থ মনে হয়েছে। পাইপের ধুমায়িত মুখে মুজিব বললেন, ‘অ্যাজ ইউ ক্যান সি, আই এম ভেরি মাচ্ অ্যালাইভ অ্যান্ড ওয়েল। অ্যাট্ দিস স্টেজ আই অনলি ওয়ান্ট টু বি সিন অ্যান্ড নট হার্ড’। অর্থাৎ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন আমি ভালভাবে বেঁচে আছি ও ভাল আছি। এ পর্যায়ে আমি নিজের দেখাটি দিচ্ছি, কোনো কিছু বলতে নয়। কয়েক ঘন্টা পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি ও ঢাকায় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে কথা শেষে ক্লারিজ হোটেলের বলরুমে মুজিব প্রেস কনফারেন্স করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত দলিল-দস্তাবেজ থেকে জানা যায়, টাইম ম্যাগাজিনের ওই সাংবাদিক ড্যান কগিনের দাবি তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় দেখা করে ১৯৭২ সালের মধ্য জানুয়ারিতে ‘ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট’ বা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানিয়েছেন যে, ‘ইস্ট্যাবলিশ সাম সোট্ অব লিঙ্ক বিটউইন বাংলাদেশ অ্যান্ড পাকিস্তান’ অর্থাৎ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে একটি বন্ধন গড়ায় তিনি আগ্রহী, যেন সম্ভাব্য পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় ‘ইন অ্যান অ্যাটেম্প্ট টু ফরস্টল অ্যানি পসিব্ল মুভ বাই ইন্ডিয়া টু অ্যানেক্স বাংলাদেশ’ ভারত বাংলাদেশকে অর্ন্তভুক্ত করতে না পারে। ‘মুজিব ওয়াজ সাস্পিশাস অ্যাবাউট ইন্ডিয়া’স আল্টিমেট ইন্টেনশন’ অর্থাৎ মুজিব ভারতের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্ধিগ্ধ ছিলেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]