• প্রচ্ছদ » » ডেঙ্গুর দিনগুলোতে রবীন্দ্রচর্চা


ডেঙ্গুর দিনগুলোতে রবীন্দ্রচর্চা

আমাদের নতুন সময় : 11/08/2019

মাসকাওয়াথ : গত এক সপ্তাহের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখলে মনে হবে না ডেঙ্গু আক্রান্ত জনপদে উপায়হীন মৃত্যুর অপেক্ষায় অসহায় মানুষ। বরং মনে হবে কোথায় এক ভিডিওতে কে একজন ‘জাতীয় সংগীত অনুভ‚তিতে আঘাত দিয়েছে, সেটাই প্রথম এবং প্রধান সমস্যা। ভারতে যে শিবসেনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বৃথা সংকল্প নিয়ে ঘুরছে, সেই শিবসেনাই আবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের অবাস্তব প্রলাপে ‘জাতীয় সংগীত’ অনুভ‚তিতে আহত হয়ে আহাজারি জুড়ে দেবার ব্যাপারটা বেশ বিনোদন দিয়েছে। আর শিবসেনার জমজ ভাই শিবির এসে যোগ দিয়েছে ‘কলতলার’ রবীন্দ্রনাথ বিতর্কে। এখন এই যে শিবসেনা ও শিবিরের কাইজ্জার দিনরাত্রি, এটা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার হাজার বছরের ঐতিহ্য। যেকোনো সুস্থ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে, ডেঙ্গুতে মানুষ মরছে, এই খরখরে বাস্তবতা বাদ দিয়ে কাল্পনিক ‘রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক’ আর ‘জাতীয় সংগীত অনুভ‚তি’তে আঘাতের বিষয়টি এতো প্রধান হয়ে দাঁড়ালো কীভাবে! এই তো হয় এখানে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ছেড়ে কাল্পনিক বিষয়াদি নিয়ে কাইজ্জা করে করেই তো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আজ ‘দোজখে’ রূপান্তরিত হয়েছে। প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার বুঝতে না পারাটাই যে অসভ্যতা। আপনার মনে হতে পারে কেবল শিবসেনা আর শিবিরই তো নয়, অনেক শিক্ষিত মানুষকেও তো এই অলীক বিতর্কে তাপিত হতে দেখলাম। এটা শৈশবের চুলকানি থেকে ধারাবাহিকভাবে শরীরে বাসা বাঁধা রোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট, সংস্কৃতি সভায় মাথা দোলানো, হজ বা তীর্থ যাত্রার আত্মার পরিশোধন প্রক্রিয়ায়ও এ রোগ যাওয়ার নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি শিশু তাদের সামনে বড়দের অবসর যাপন মানেই পরচর্চা করতে দেখেছে। প্রতিবেশী চিংড়ি মাছ খেয়েছে নাকি রুই মাছ খেয়েছে তাই নিয়ে রগড় যাদের বিনোদন সংস্কৃতি, তারা গ্রিস ঘুরতে গিয়ে ফেসবুকে এথেন্সের ছবি দিয়ে সাক্ষাৎ সক্রেটিস হিসেবে হাজির হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পরচর্চা দেখলে ভ্রমণ বাদ দিয়ে হোটেলে ফিরবে, ভালো ইন্টারনেট স্পিড পেলে ঝগড়া জমবে ভালো, এই হচ্ছে শিকড় সঞ্জাত টানাপড়েন। প্রতিবেশীর সঙ্গে তুলনামূলক জীবনযাপন, প্রতিবেশীর সমালোচনা, এই হচ্ছে দক্ষিণ এশিয় কমপ্লিট কোড অফ লাইফ। সেখানে হিন্দু-মুসলমান প্রতিবেশী মানে সোনায়-সোহাগা, ওটা শিবসেনা বনাম শিবিরের যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে বাধ্য। এই প্রতিবেশীরা কাইজ্জার দিনরাত্রিতে এতো ব্যস্ত যে, এদের বাসায় অবাধে এডিস মশা বাসা বাঁধতে পারে। ডেঙ্গুর কামড় খেয়ে মরতে মরতেও ‘এইডা তোর দোষ, না এইডা তোর দোষ বলে’ কাইজ্জা করতে থাকবে। এমনকি অনাবাসে শরণার্থী হয়ে এসেও সুখ সহ্য হয় না দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের। হয় অমুক সমিতি, তমুক সমিতি বানিয়ে কাইজ্জা, কিংবা হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের সমালোচনা, এই হচ্ছে অবসর বিনোদনের প্রধান উপাদান। এই যে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের যে স্বভাব, সেখানে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজন খোঁজা কান নেয়া চিলের পিছে দৌড়ানোর মতো। কেউ কারও ভালো চায় না যেখানে, শুধু নিজে ভালো থাকতে চায়, সেই কাঁকড়া সভ্যতার মানুষের জীবনে পরমতসহিষ্ণুতা, অহিংসা, অসাম্প্রদায়িকতা, এগুলো খুব ভারি ভারি শব্দ। কেউ কেউ আয়াত কিংবা মন্ত্র উচ্চারণের মতো এসব ভারি ভারি শব্দের ডালি নিয়ে হাজির হন। কিন্তু সব নৈতিকতাই ঠোঁটে রয়ে যায়, হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছায় না। এতো হিংস্র কাঁকড়া মানস যে সমাজে উপস্থিত, সেখানে ঘৃণা-বিদ্বেষ-বিভাজন ছড়ানোটাই ব্যবসার সবচেয়ে বড় উপাদান। সেই ব্যবসা করেই এ উপমহাদেশে ধন-সম্পদ অর্জন সম্ভব, সম্পদ লুণ্ঠন করে পশ্চিমে সেকেন্ড হোম তৈরি সম্ভব। এটাকে কাঁকড়ার বাচ্চার অর্থনীতিও বলা যায়। আজকের বাণিজ্য বাস্তবতায় কাঁকড়াদের জন্য শিবসেনা ও শিবিরের উসকানি আছে, কট্টরপন্থী ইসলামিক স্টেট বনাম কট্টরপন্থী হিন্দু স্টেটের উন্মাদনা আছে। ফলে মানুষের জীবন এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে এই উপমহাদেশে। যারা কট্টরপন্থী ইসলামিক স্টেট বনাম কট্টরপন্থী হিন্দু স্টেটের মানসিক উন্মাদনার উসকানিতে উত্তপ্ত হবে, তারা অসভ্যতার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হবে। জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলসের লিলিপুটিয়ান ও বেøফুসকুডিয়ানদের মতো একটা ডিমের সামনের না পেছনের দিক থেকে ভাঙলে সঠিক হবে, তাই নিয়ে নিরন্তর কাইজ্জার আড়ালে হারিয়ে যাবে অসংখ্য জীবন। অলীক অনুভ‚তির বিতর্ক যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, বাস্তব সংকট আড়াল করে, তখন দক্ষিণ এশীয় কাঁকড়া মননকে প্রত্যাখ্যান করে, যৌক্তিক চিন্তা করে, মাথা ঠাÐা রেখে যারা মানবিক সংকট মোকাবেলায় স্থিতধী থাকতে পারবে, তারাই অতিক্রম করবে সভ্যতার পরীক্ষা। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]