• প্রচ্ছদ » » বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাবলীর উপাখ্যান


বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাবলীর উপাখ্যান

আমাদের নতুন সময় : 11/08/2019

কামরুল হাসান মামুন

বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে নিয়মগুলো ব্যতিক্রম কিন্তু ব্যতিক্রমীদের জন্য ব্যতিক্রমী নিয়ম বা ব্যবস্থা নেই। ধৈর্য ধরুন একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি। আমাদের নিয়মগুলো ইউনিভার্সাল না অর্থাৎ বিশ্বের নিয়মের সঙ্গে আমাদের নিয়মগুলো কেন জানি মিলে না। যদিও যারা নিয়মটিয়ম বানায় তারা প্রায়ই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মটিয়ম জানতে ভ্রমণে যান, কিন্তু দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু। ভ্রমণে গিয়ে কিছু শিখে আসেন তা তাদের তৈরি নিয়ম দেখে মনে হয় না। এমনকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মটিয়ম যারা বানান তারাও অনেকটা এ রকম। ইউজিসির গত টার্মের চেয়ারম্যান এবং তার সদস্যরাও দলবল নিয়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন জানার জন্য নানা দেশে ঘুরেছেন। ঘুরে এসে এমন নিয়ম বানানোর প্রস্তাব দেন যা সত্যিই পীড়াদায়ক।
সমস্যা ১. আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোটাদাগে শুধু নিজেদের গ্রাজুয়েটদেরই শিক্ষক হিসেবে নেয়। নিজেদের মধ্যে মানে যেই বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ হবে সেই বিভাগেরই ছাত্র হবে। একটি উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে এক ছাত্র বিভাগ ‘ঢ’ থেকে অনার্স পাস করে মাস্টার্সের জন্য সেই বিষয়েরই তত্ত¡ীয় ‘ণ’ গিয়ে মাস্টার্স করেছে। সে এখন ‘ঢ’ বিভাগে প্রভাষক পদে দরখাস্ত করেছে। কিন্তু ‘ঢ’ বিভাগ তার দরখাস্তই ফরওয়ার্ড করতে চায় না কারণ সে আর এখন ‘ঢ’ বিভাগের নয়। এখন বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে প্রার্থী ‘ঢ’ বিভাগের হলেই চলবে না তাকে ‘অ’ দলের শিক্ষক ‘অ’ অধ্যাপকের থিসিস ছাত্র হতে হবে। অথচ সারা পৃথিবীর কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজের ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিতে এক ধরনের আপত্তি বা অনাগ্রহ স্পষ্ট। হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের।
নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে বিভাগে এক ধরনের ভাগাড় বা মাফিয়াইজমে পরিণত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। এ কারণেই বিশ্বের কোথাও এ রকমটি দেখা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটদের সাধারণত নেয় না। অন্যরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের নেয় না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে তারা নিতে বাধ্য হয় পরে নিজের গ্রাজুয়েট তৈরি হতে শুরু করলে তারাও পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হয়ে যায়। এতে বিভাগে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে জুনিয়র শিক্ষকরা তার থিসিস সুপারভাইজার, যিনি তার দলের নেতা এবং নিয়োগকর্তাও বটে, তার মতের বাইরে গিয়ে নিজের আপন অভিমত দিতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রমোশোনে সমস্যার কথা ভেবেও অনেকে চুপ থাকেন। অথচ প্রমোশন নীতি স্ট্রিক্টলি ফলো করলে এসবের উপর নির্ভর করতে হতো না।
সমস্যা ২. আমাদের দেশে এখন তিন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ৭৩-এর অধ্যাদেশের আওতায় চারটি এলিট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বাকি ৪১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারে না। হতে কোনো লিখিত বাধা নেই। তবে সম্প্রতি আমার একটি লেখা প্রথম আলোতে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে নর্থ আমেরিকা থেকে পিএইচডি করা একজন ছাত্র মেইল করেছে। সে কেবল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার কারণে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারছে না। এ রকম অভিযোগ আগেও শুনেছি। ব্যতিক্রম হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিভাগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলো আর সেটা ক্যাম্পাসে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলো। ওয়েল এই ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব মতামত হলো যে অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পাস করুক না কেন সে যদি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ/ফেলোশিপ/টিচিং বা রিসার্চ এসিস্টেন্টশিপ পেয়ে পিএইচডি করে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে পারে তাকে নিতে কোনো অসুবিধা দেখি না।
সমস্যা ৩. আমাদের ছাত্ররা এডমিশন টেস্ট দেয় আন্ডারগ্রাজুয়েটে ভর্তি হওয়ার জন্য। যারা মেধাবী কিন্তু অল্পের জন্য চান্স পায়নি তাদের অনেকেই তখন প্রাইভেট কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের কলেজে আন্ডারগ্রাজুয়েট করে। ওই একবার অনার্স পড়ার তারা চান্স পায়নি বলে মাস্টার্স করার চান্সও পাবে না? তারা কি এই দেশের নাগরিক নয়? তাদের তো দ্বিতীয় আরেকটি সুযোগ দেয়া উচিত। যারা অনার্সে সুযোগ পেয়েও বছরের পর বছর ফেল করবে আর চার বছরের কোর্স ৬ বা ৭ বছরে পাস করে আবার বিনা ভর্তি পরীক্ষায় মাস্টার্স পড়ার সুযোগ পাবে? আমরা যদি মাস্টার্সে আবার ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ছাত্র ভর্তি করতাম তাহলে যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবা-মায়ের অনেক টাকা খরচ করে পড়ছে কিংবা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তারা কি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দ্বিতীয় আরেকটি সুযোগ ডিজার্ভ করে না? এই সুযোগ দিলে যারা ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তাদের মধ্যে একধরনের চাপ কাজ করতো আর যারা অন্যত্র পড়ছে তাদের মধ্যে একধরনের আশা কাজ করতো। ফলে সবাই পড়াশোনার প্রতি একটু মনোযোগী হতো। এটা হতো সবার জন্যই মঙ্গলজনক।
অথচ বাই ডিফল্ট সবাইকে ভর্তির সুযোগ দিয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি ভাগাড়ে রূপান্তর করেছি। ক্লাসে গেলে বুঝতে পারি কোনো ধরনের প্রাণ নেই। সবচেয়ে বড় যেই সমস্যা ইদানীং টের পাচ্ছি সেটা হলো ইদানীং আমাদের অনেক ভালো ছাত্রই চার বছরের অনার্স করে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে কিছু সিট কিন্তু ফাঁকা হচ্ছে। এরা চলে যাওয়ার ফলে ক্লাসে ভালো ছাত্রের সংখ্যা কমে যায়। মাস্টার্সের কোর্সগুলো একটু অ্যাডভান্সড যেখানে ভালো ছাত্ররা না থাকলে পড়িয়ে আনন্দ পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষকরাও তার পোটেনশিয়ালের পুরোটা দিতে পারে না। নিতে পারার মানুষ না থাকলে দিতেও উৎসাহ থাকে না। এই অপচয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি নেই বললেই চলে। প্রথম আলোতে আমার লেখাটি প্রকাশের পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ছাত্র একাধিক দীর্ঘ ই-মেইল করে। তার লেখা কয়েকটি লাইন শেয়ার না করে পারছি না : ‘আপনারা অহংকারে ধ্বংস হয়ে গেছেন। আপনাদের দেশে পাঁচ বছর ধরে কোনো গানও আসে না। খেয়াল করে দেখেন স্যার । অর্ণব, আর্টসেল, শিরোনামহীন বা নতুন কেউ আপনাদের দেশে এখন কোনো নতুন গান গায় না। আছে শুধু ভাইরাল ‘মাইয়া ও মাইয়া তুই অপরাধী রে’ আপনারা আরও ডুববেন, অহংকার আসেই ডোবানোর জন্য।
সমস্যা ৪. এটি বৈষম্য দূর করার নামে অমানবিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরছি। আমাদের ঢাকা তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা হলো এসএসসি ও এইচএসসির মোট জিপিএ-৮, কিন্তু আলাদাভাবে কোনোটিতেই ৩.৫ এর কম থাকা চলবে না। অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসির দুটোতেই জিপিএ-৪ কিংবা ৪.৫ এর নিচে পেয়ে ভর্তি হতে পারে এবং কেউ কেউ পায়ও। অথচ প্রভাষক হিসেবে শিক্ষক হওয়ার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ধরা হয়েছে জিপিএ ৪.৫! কি হাস্যকর এবং দুঃখেরও বটে। যেই ছেলেটি এসএসসি ও এইচএসসি দুটোতেই জিপিএ-৪ কিংবা ৪.৫ এর নিচে পেয়ে ভর্তি হলো তাকে ভর্তির দিন থেকেই বলে দেয়া হলো তুমি বাবা অনার্স মাস্টার্সে যতো ভালোই করো এবং এমআইটি হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি করো, ভালো গবেষণা করো, কিন্তু তুমি আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবা না। এর চেয়ে বলদামি নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে আর হতে পারে না।
সমস্যা ৫. আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যারা অনার্স করেই উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে চলে যাচ্ছে। যাদের কেউ কেউ মাস্টার্স ছাড়াই পিএইচডি করে ফেলে। তারপর এখানে যখন শিক্ষকতার জন্য দরখাস্ত করে প্রশ্ন করা হয় ‘তোমার কি মাস্টার্স আছে’? কি বলদামি প্রশ্ন? যার পিএইচডি আছে তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তোমার এসএসসি বা এইচএসসি ডিগ্রি বা অনার্স ডিগ্রি কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রি আছে কিনা সেটা কতোটা যৌক্তিক? যদি এসব ছাড়াই ভালো মানের পিএইচডি করে থাকে তাহলে বরং তাকে ক্রেডিট দেয়া উচিত। সেসঙ্গে আরেকটি সমস্যা হলো অনেকেরই সিজিপিএ-৩.৫ এর নিচে, কিন্তু তাদের অনেকেই আমেরিকার ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাচ্ছে। গত পরশুও আমার এক ছাত্র আমেরিকায় পিএইচডি করতে গেছে যার সিজিপিএ-৩.৫ এর বেশ নিচে, কিন্তু আমি জানতাম সে আমাদের অনেক বেস্টের চেয়েও বেটার। সে ফিজিক্স জিআরই ও টোয়েফলেও তা প্রমাণ করে গেছে। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। এদের অনেকেই হয়তো খুব ভালো পিএইচডি করবে এবং ভালো পোস্ট-ডকও পাবে। এমনকি ওখানকার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকও হতে পারবে, কিন্তু বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্য দরখাস্তই করতে পারবে না। কি হাস্যকর না? আমরা এমনই। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]