• প্রচ্ছদ » সর্বশেষ » তিন দশকের মধ্যে চামড়ার দাম এবার সবচেয়ে কম কেউ দান করেছেন, কেউ কেউ ফেলেছেন ডাস্টবিনে


তিন দশকের মধ্যে চামড়ার দাম এবার সবচেয়ে কম কেউ দান করেছেন, কেউ কেউ ফেলেছেন ডাস্টবিনে

আমাদের নতুন সময় : 15/08/2019

মেরাজ মেভিজ, রাজু চৌধুরী, মঈন উদ্দীন ও আশরাফুল নয়ন : একদিকে পুঁজি হারিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে রাজধানীসহ সারাদেশে জমছে পচা চামড়ার স্তুপ। চামড়ার দাম এতোটাই কম ছিলো, বিশ-পঞ্চাশ-একশ’ টাকায় চামড়া বিক্রি করার চেয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়াকেই শ্রেয় মনে করেছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া। সর্বশেষ ১৯৮৮’র বন্যাপরবর্তী ঈদে এমন অবস্থা দেখা গিয়েছিলো। বিনে পয়সায় দিলেও চামড়া নিতে চাইছেন না কেউ। সাধারণ বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ক্ষোভে, রাস্তা ও ডাস্টবিন হয়েছে কাঁচা চামড়ার শেষ ঠিকানা।

অন্যদিকে অনেকেই এ সুযোগে কম অর্থে চামড়া সংগ্রহ করে পড়েছেন লবণসংকটে। আরও চার-পাঁচ দিন পর চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করবেন। আর এ কয়দিন চামড়া সংরক্ষণ করতে প্রচুর লবণ লাগবে। এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সিন্ডিকেটের কারনে লবণের দাম বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দান নয়তো ডাস্টবিনে রাজধানীর চামড়া: বিগত বছরগুলোতে নামাজের পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় অসংখ্য মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর ভিড় দেখা গেলেও এবার তাদের দেখা মেলেনি। ঈদ ও ঈদেও পরদিন ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, মানিক নগর, সবুজবাগ, রায়েরবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কোরবানি করা বেশিরভাগ পশুর চামড়াই পড়ে আছে রাস্তায়। কিছু কিছু এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হাজির হলেও তাদের দাম শুনে বেশিরভাগ কোরবানিদাতাই চামড়া বিক্রি করতে রাজি হননি। অনেকেই এবার চামড়া দান করে দিয়েছেন বিভিন্ন এতিম খানা ও মসজিদ মাদ্রাসাকে। আর বাকি চামড়াগুলোর ঠাঁই হয়েছে রাস্তা ও ডাস্টবিনে।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া মাদ্রাসার মাওলানা রফিকুল আলম বলেন, আমরা দানের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছি। যেহেতু এবার চামড়ার দাম কমে গেছে আর মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে অনেকেই চামড়া বিক্রয় করছেন না। বরং কোরবানিদাতারা কাঁচা চামড়া দান করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন।

এক লাখ পঁচা চামড়া অপসারণ করেছে চসিক: পঁচা চামড়ার স্তুপ রেখে চলে যাচ্ছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। এতে করে সম্পুর্ণ নতুন এক সমস্যায় পড়তে হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মী ও কর্মকর্তাদের। হাজার হাজার পঁচা চামড়া ট্রাকে পর ট্রাকে করে আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলতে হয়েছে তাদের। চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত আতুরার ডিপো-হামজারবাগ এলাকায় এক লাখ, বহদ্দারহাটে ৯ হাজার ও আগ্রাবাদে ১২ হাজারের বেশি পচা চামড়া পাওয়া গেছে। সেগুলো ফেলা হয়েছে নগরের দুইটি আবর্জনার ভাগাড়ে, জানিয়েছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। চসিকের হিসাবে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত ২০০ শ্রমিক ও ৮টি পে লোডারের সাহায্যে ৩২টি ট্রাকে ৯০ ট্রিপে এক লাখ পঁচা চামড়া অপসারণ করা হয়।

এরআগে লাভের আশায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ট্রাকে করে শহরে কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন মৌসুমি বেপারি আর বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। কিন্তু চামড়ার দামে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসায় প্রথমে ৩০০ টাকায় বড় চামড়া কিনছিলেন তারা। এরপর ২০০-১০০ টাকায় নেমে এলে ক্রেতার দেখা মেলেনি বাজারে। চামড়া নিয়ে যেসব ট্রাক এসেছিল অনেকে ভাড়াও তুলতে পারেনি। পরে ক্ষোভে চামড়ার স্তুপ করে ট্রাকভর্তি চামড়া ফেলেই বিদায় নেন তারা।

চলনবিলে চামড়ার বাজারে ধস, বাড়ছে লবনের দাম: চলনবিলে চামড়ার বাজারে লোকসান গুনতে হচ্ছে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত ২০-২৫ বছরেও চামড়া নিয়ে এমন বিপর্যয় তারা দেখেননি। চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় সব চেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এতিম খানা, মাদরাসা ও হতদরিদ্র মানুষেরা।

সিলেটে ২০ ট্রাক চামড়া মাটিচাপা: সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সিসিকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান বলেন, নগরী থেকে প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া ডাম্পিং করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন মোড়ে এসব চামড়া রাখা ছিল। পরে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়।

রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত: রাজশাহীতেও চামড়া একরকম পানির দরেই বিক্রি হয়েছে। এখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান থেকে কীভাবে বের হতে পারেন এ পরামর্শ জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ বলেন, যদি পর্যাপ্ত লবণ দিয়ে তারা চামড়াগুলো সংরক্ষণ করেন, তাহলে আড়ত থেকে সরকার নির্ধারিত দাম পাবেন। আর তা না করে হুজুগে পড়ে চামড়া বিক্রি করে দিলে কারোরই কিছু করার থাকবে না।

নওগাঁয় লোকসানে চামড়া ব্যবসায়ীরা: নওগাঁ সদর উপজেলার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী ফজলুল হক জানান, প্রতি বছর কোরবানী ঈদে চামড়ার ব্যবসা করেন তিনি। এবছর চামড়া কিনে শহরে নিয়ে এসেছেন বিক্রি করতে। আড়ৎদাররা যেভাবে দাম করছেন লাভতো দুরের কথা পুজিই উঠবে না।

জয়পুরহাটে দিশেহারা চামড়া ব্যবসায়ীরা : জয়পুরহাটে এবার ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে গরুর চামড়া। জয়পুরহাট সদর উপজেলার হেলকুন্ডা গ্রামের আনিছুর রহমান, কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের গোলাম রব্বানী, ক্ষেতলাল উপজেলার দাশড়া গ্রামের হানিফ হোসেনসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার কোরবানিদাতারা জানান, বিগত তিন দশকেও চামড়ার এমন মন্দা বাজার দেখেননি তারা।

নদীতে চামড়া ভাসিয়ে দিতে চান ব্যবসায়ীরা: চাহিদা অনুযায়ী চামড়া থাকলেও ক্রেতার সংকট রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। অনেক ব্যবসায়ী তাদের চামড়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় চরম হতাশায় আছেন ব্রাহ্মবাড়িয়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা।  চামড়ার বাজারমূল্য কম হওয়ায় অধিকাংশ চামড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]