সংঘাতময় বিশ্বে টিকে থাকা : বাঙালি জাতির জন্য একটি রূপরেখা

আমাদের নতুন সময় : 17/08/2019

মাসুদ রানা : আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি যেভাবে ক্রমশঃ সাংঘর্ষিক রূপ নিচ্ছে এবং যে তা শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যেতে পারে এমন আশঙ্কার কথা আমি ২০১০ সাল থেকে বলে আসছি বস্তুনিষ্ঠ তত্ত্বায়নের মাধ্যমে। এটি বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি যে, ক্রমবর্ধমান এই সাংঘর্ষিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবেশে জাতি হিসেবে বাঙালির সংহতি ও প্রস্তুতির প্রয়োজন। আমাদের সংহতি ও প্রস্তুতির ভিত্তি হবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্যবোধ ও প্রতিশ্রুতি।
দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতা লাভের অব্যবহতি পরে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত, জাতিগতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞতা, বিপ্লবোত্তর স্বাভাবিক প্রতিবিপ্লবী প্রবণতা এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক রাজনৈতি সংস্কৃতিতে বিকশিত হওয়ার ঘাটতিসহ নানা ভ্যারিয়েবল বা চলের কারণে আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই গেছে। স্বাধীন জাতি হিসেবে চলতে গিয়ে আমাদের অনেকে অর্জন ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আজ যার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরাসক্ত বিশ্লেষণ এবং অর্জনসমূহের উদ্যাপন ও ব্যর্থতাসমূহের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংশোধন প্রয়োজন।

আমি মনে করি, সংহতির প্রয়োজনে আমাদের উচিত হবে নিজের বোধ ও আবেগ সঙ্গে সঙ্গে অন্যের বোধ ও আবেগকেও বিবেচনায় নেয়া। এটিই স্বাভাবিক যে, একটি জাতির সবাই একই রকমের রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে না, কিন্তু কতিপয় মৌলিক বিষয়ে অতি-অবশ্যই সবার একমত হওয়া চাই, যা ছাড়া জাতি হিসেবে এই জটিল বিশ্বে টিকে থাকা অসম্ভব।
জাতিময় ও জাতিবিভক্ত এই বিশ্বের গত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে নিরাপদে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, যুগে যুগে বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী জাতিসমূহ যে চারটি বোধিক বিষয় ধারণ ও আচরণে পালন করে সফল হয়েছে তাহলো : ১. আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয়, ২. সেন্স অফ হিস্টোরি বা ইতিহাসবোধ, ৩. রুলস অফ লিভিং বা বেঁচে থাকার নীতি ও ৪ গ্লোবাল রোল এন্ড ডেস্টিনি বা বৈশ্ববিক ভূমিকা বা নিয়তি তথা অভীষ্টবোধ। আমি বাঙালি জাতির কাক্সিক্ষত বিকাশ ও সাফল্যের জন্য উপরের এই চারটি বোধিক বিষয়কে যেভাবে দেখি, তা নি¤œরূপ : প্রথমত : আমাদের একমত হতে হবে আমাদের জাতিগত আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে। আমরা জানি, জাতিগত আত্মপরিচয় প্রসঙ্গ এলেই আমাদের একদিকে আমাদের ভাষাজনজাতিক ও অন্যদিকে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসগত উপাদানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক কারণ আছে।

আমাদের উচিত হবে এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার না করে তা নিরসনের উপায় অনুসন্ধান করা এবং সচেতন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা নিরসন করা। দ্বিতীয়ত : আমাদের জাতির প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক ইতিহাস সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান ও বোধ গড়ে তুলতে হবে আবেগ সংবরণ করে বৈশ্বিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। কারণ একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংহতি ও প্রগতির জন্য তার ইতিহাসবোধ প্রয়োজন। এই ইতিহাসবোধের অংশ হিসেবেই আমাদের ইতিহাসের সব জাতীয় বীর নারী ও পুরুষের স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে হবে। অভিন্ন জাতির সদস্য হয়ে আমরা আমাদের এক বীরকে সম্মান ও অন্য বীরকে অসম্মান করতে পারি না। আমাদের বর্তমান জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক বিভক্তি একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে জাতীয় বীরদের স্বীকৃতি ও সম্মানের ব্যাপারে আমাদের মতভিন্নতা। তৃতীয়ত : আমাদের প্রয়োজন আধুনিক বিশ্বে বিকাশমান সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি সুসভ্য জাতি হিসেবে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করা, যা জাতি হিসেবে আমাদের সংস্কৃতি ও আচরণকে সংজ্ঞায়িত করে বৈশিষ্ট্য দান করবে। ফরাসি বিপ্লবের তিন মন্ত্র… স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব যেমন ফরাসি জাতির আধুনিক বিকাশের পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে, আমাদেরও স্বাধীনতা যুদ্ধের তিনমন্ত্র… সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার… একটি সভ্য জাতি হিসেবে বিকশিত হওয়ার পথনির্দেশ হিসেবে শক্তভাবে ধারণ ও পালন করতে হবে। চতুর্থত : একটি জাতি কখনোই তার অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না, যদি না সে তার বাইরে জাতিময় ও জাতিবিভক্ত বিশ্ব পরিসর সম্পর্কে সচেতন ও সেখানে তার ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ ও প্রয়াসী হয়। বাঙালি জাতি বিশ্বের সর্ববৃহৎ না হলেও নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাজনজাতি। বিশ্বের এতো বৃহৎ ভাষাজনজাতি হিসেবে আমাদের আমাদের নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সম্পদ ও শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে তার ভিত্তিতে বিশ্ব পরিসরে ইতিবাচক যোগ্য ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ ও প্রয়াসী হতে হবে। বাঙালির মতো সংখ্যায় এতো গুরু কিন্তু মর্যাদায় এতো লঘু জাতি ইতোপূর্বে বিশ্বে দেখা যায়নি।

আমি মনে করি জাতি হিসেবে আমাদের এখন সময় এসেছে অবিভাজ্য বাঙালি আত্মপরিচয়ে ঐক্যবব্ধ, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসবোধে বলীয়ান এবং আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি অনুসারে সাম্য, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে চালিত একটি সুসভ্য জাতি হিসেবে বিশ্ব পরিসরে ভূমিকা পালনকে নিয়তি মনে করার। আমি আরও মনে করি, বাঙালি জাতির মধ্যে সংহতি এনে ইতিবাচক বিকাশ ও প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার এই বোধের ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]