চামড়া নিয়ে তেলেসমাতি : হত-দরিদ্ররাই হলো বঞ্চনার শিকার

আমাদের নতুন সময় : 19/08/2019

ড. সা’দত হুসাইন : সেই ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমাদের পরিবার প্রতিবছর একটি গরু কোরবানি দেয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, পঞ্চাশের দশকে, যতোদূর  মনে পড়ে ১৯৫৭ সালে কোরবানির জন্য আশি টাকা (৮০/-টাকা) দিয়ে একটি লাল গরু কেনা হয়েছিলো। দিন দুয়েক আমরা ভাই-বোনেরা, বিশেষ করে আমি গরুটিকে পরিচর্যা করেছিলাম। তারপর যথারীতি গরুটিকে কোরবানি দেয়া হয়েছিলো। বিয়ের পর পরিবার নিয়ে দেশের যেখানেই বসবাস করেছি সেখানে এককভাবে অথবা অংশীদার হয়ে কোরবানি দিয়েছি। দু-একবার ছাড়া প্রতিবার গরু কোরবানি দিয়েছি।

গরু-ছাগল যাই কোরবানি দিই না কেন, কোরবানির শেষে  গ্রহণযোগ্য দামে পশুর চামড়া বিক্রি ছিলো একটি আনন্দের ব্যাপার। বিক্রয়লব্ধ টাকা বাসার কাজের লোক এবং পরিচিতি গরিব, হতদরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এটি ছিলো অতীব তৃপ্তির ব্যাপার। গরিব লোকগুলো অধীর আগ্রহে চামড়ার টাকা পাওয়ার জন্য অপক্ষো করতো। তাদের হাতে সামান্য বাড়তি টাকা তুলে দিয়ে আমরা বড় শান্তি পেতাম। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলে আসছিলো। কোনো বছর এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

গত কয়েক দশক ধরে দেখতে  পেয়েছিলাম যে পাড়া-মহল্লা এবং আশে-পাশের এলাকার কিছু যুবক চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েছে। তারা রিকশা নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কিনছে। স্বাভাবিক দামে। তাতে জোর-জবরদস্তি বা চাঁদাবাজির রেশ মাত্র ছিলো না। তাদের মধ্যে নির্মল প্রতিযোগিতার কারণে চামড়ার দাম একটু বেড়েছে। গরিব-দুঃখী লোকেরা এর ফলে দু’পয়সা বেশি সাহায্য পেয়েছে। বিষয়টিকে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন প্রবণতা বলে মনে হয়েছিলো। শহরের মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানার লোক বিনা পয়সায় চামড়া নেয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি ধর্ণা দিতো। কোনো কোনো পরিবার এসব প্রতিষ্ঠানকে বিনা মূল্যে চামড়া দিয়ে দিতো।

গত বছর (২০১৮ সাল) থেকে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেছে। এলাকার যুবকরা রিকশা নিয়ে এলো না। অন্য কোনো ব্যবসায়ী-ক্রেতাও চামড়া কিনতে আসেনি। বিকালের দিকে মাদ্রাসা, এতিমখানার লোক এসে জানিয়ে গেলো এবার চামড়া কিনতে কেউ আসবে না। অতএব তাদেরকেই মাগনা চামড়া দিতে হবে। অনেক চেষ্টা করেও চামড়া বিক্রি করতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে সন্ধ্যার পর মাদ্রাসা এতিমখানাকে বিনামূল্যে চামড়া দিতে হলো। হত-দরিদ্রদের কপাল পুড়লো। চামড়া বিক্রির টাকা থেকে যে সামান্য অর্থ-সাহায্য তারা  পেতো, সে সাহায্য থেকে তারা বঞ্চিত হলো। মাদ্রাসা এতিমখানার সিন্ডিকেট তাদের ভাগ্য হরণ করলো।

এবার আরো ক্ষমতাধর বড় সিন্ডিকেট মাদ্রাসা এতিমখানার ছোট সিন্ডিকেটকে কাবু করে ফেলেছে। যে ছোট সিন্ডিকেট গত বছর (২০১৮সন) হত-দরিদ্রদের হক কেড়ে নিয়েছিলো, এবার বড় সিন্ডিকেটের দাপটে তারা  পর্যুদস্ত হয়েছে। মাদ্রাসা এতিমখানার লোকরা এবার তাদের সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। হয় রাস্তা ঘাটে ফেলে দিয়েছে, অথবা মাটিতে পুতে ফেলেছে। গরিবদের হক অবশ্য এবারও মারা পড়েছে। চামড়ার বদৌলতে তারা  এবারও কোনো অর্থ সাহায্য পায়নি।

পরিস্থিতির জটিলতা বোঝা গেলো ঈদের পরের দিন সকালে। জানা গেলো ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে অস্বীকার করায় চামড়ার খুচরা বিক্রেতা এবং কতিপয় আড়তদার তাদের কেনা চামড়া নিয়ে দারুন বিপাকে পড়েছে। সংক্ষুব্ধ বিক্রেতাদের একাংশ তাদের চামড়া পরিত্যাক্ত অবস্থার রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। সিটি কর্পোরেশন বর্জ্য হিসাবে এ চামড়া ভাগাড়ে ফেলার জন্য নিয়ে গেছে। একমাত্র চট্টগ্রাম নাকি লক্ষাধিক চামড়া এভাবে বিনষ্ট করা হয়েছে। সারা দেশেই অবিক্রিত চামড়ার এভাবে ভাগাড়ে স্থান পেয়েছে।

ট্যানারি মালিকরা কেন চামড়া না কিনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করল তার সুনির্দিষ্ট জবাব পেতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। তবে যে দুটি কারণ সাধারণ্যে প্রকাশ পেয়েছে তার একটি হলো তাদের বাজার ক্ষমতা (গধৎশবঃ ঢ়ড়বিৎ) সবাইকে জানান দেয়া যাতে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠি এবং কর্তৃপক্ষ তাদেরকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়। অন্যটি হচ্ছে তাদের উৎপাদিত পণ্যের মান গ্রহণযোগ্য বিবেচিত না হওয়ায় বিশ্ববাজারে সে পণ্যের  চাহিদা কমে যাওয়া। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত  কয়েক বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ধারাবহিকভাবে কমে গেছে। এটি ছিলো একটি অশনি সংকেত, যা আমরা জানতে পারিনি। উন্নয়নের জোয়ারে এ তথ্যের সলিল সমাধি হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তড়ি-ঘড়ি করে কাঁচা চামড়া রপ্তানির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো তা প্রত্যাহার করে, যাতে কাঁচা চামড়ার বিক্রেতারা চামড়া বিক্রির ক্ষেত্রে ট্যানারি মালিকের কাছে জিম্মি না থাকে। চামড়ার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ আদেশ আরো কয়েক দিন আগে দিলে তারা এর সুফল পেতো। এমন সময়ে এ আদেশ দেয়া হলো যখন অনেক চামড়া বর্জ্য হিসাবে ভাগাড়ে চলে গেছে। এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি নিখাদ অপচয় (উবধফ বিরমযঃ ষড়ংং) ট্যানারি মালিকরা যে চামড়া কিনতে চাচ্ছেনা এ তথ্য তো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জানা থাকার কথা। তা সত্ত্বেও কেন তারা চামড়ার রপ্তানি আগেই অবারিত করেনি তা বেধিগম্য নয়। মন্ত্রণালয়গুলো অনেক কিছু করে, তবে অনেক দেরীতে করে। বড় রকমের সংকট না হলে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙে না।

সবশেষে আবার গরিবের হক রক্ষা করার কথায় আসি। কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা যেহেতু গরিবদের মধ্যে বন্টন করা হয় তাই সরকার আইন করে চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে। মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা যারাই চামড়া সংগ্রহ করুক না কেন, তাদের ওই ন্যূনতম দাম কোরবানি দাতাকে পরিশোধ করতে হবে। আমার ধারণা, কোরবানির চামড়ার টাকা শতভাগ হতো-গরিবদের মাঝে বিতরণ করা হয়, মালিকরা কেউ তা ভোগ করে না। তাই চামড়ার দাম বাড়লে গরিবরা উপকৃত হবে। গরিবের স্বার্থরক্ষা আমাদের সকলের নৈতিক, সামাজিক এবং জাতীয় কর্তব্য।

লেখক :  সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]