• প্রচ্ছদ » » রিজিয়া রহমান : তাঁর গল্পগুলো যেন ডকুমেন্টারি


রিজিয়া রহমান : তাঁর গল্পগুলো যেন ডকুমেন্টারি

আমাদের নতুন সময় : 19/08/2019

চিররঞ্জন সরকার : ১৯৮৫ কিংবা ৮৬ সালে বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায় একটি গল্প পড়েছিলাম খুব সম্ভবত ‘ভালোবাসা দাও’ শিরোনামে। একজন সদ্য বেকার যুবকের কাহিনি। যুবকের ধারণা তাকে কেউ ভালোবাসে না। এই নিয়ে তার মধ্যে একধরনের মানসিক জটিলতা সৃষ্টি হয়। সে সাইকিয়াটিস্টের কাছে যায়। সাইকিয়াটিস্ট ওই যুবককে দিনে কয়েকবার ‘আমাকে সবাই ভালোবাসে’ এই বাক্যটি আওড়াতে বলেন। গল্পটি মূলত ওই যুবকের একদিনের ঘটনার বর্ণনা। সেদিন ছিলো তার জন্মদিন। এই দিনে তার প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তিকে ঘিরে রম্যরচনার ঢংয়ে লেখা অসাধারণ ওই গল্পটি আজও স্মৃতিতে গেঁথে আছে। ওই প্রচÐ ভালোলাগা গল্পটির লেখিকা ছিলেন রিজিয়া রহমান। তার সঙ্গে পরিচয় মূলত এই গল্পপাঠের মধ্য দিয়ে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর রিজিয়া রহমানের অপরাপর গল্প উপন্যাস পাঠ করার সুযোগ ঘটে। অসম্ভব ভালো লিখতেন। তার গল্পগুলো তো যেন ডকুমেন্টারি। অভিবাসী জীবন নিয়ে অসাধারণ দুই গল্প ‘সোনার হরিণ চাই’ ও ‘একটি কালো মেয়ের গল্প’ জ্বলজ্বল করছে। ‘দূর্বা ঘাসের আকাশ’, ‘সামনে যুদ্ধ’, ‘হারকিউলিসের ভাঙন’, ‘প্যাট্রিয়া’, ‘কপালেরই দুঃখ’, ‘অন্ধকারে ফেরা’, ‘ছেঁড়া মশারি আর পুরনো মানুষ’, ‘অভিজাত’, ‘রাজা রাজা খেলা’ গল্পগুলো তো যেন বাস্তবেরই প্রতিচ্ছবি। এতো নিপুণভাবে বাস্তবের চরিত্রগুলোকে গল্পে তুলে আনা সত্যিই বিস্ময়কর। ‘নিঃসঙ্গ বসন্ত’, ‘গ্রহান্তর’, ‘বিন্দু এবং বৃত্ত’ ও ‘একটি কাক একজন কবি ও চেঙ্গিস খানের ঘোড়া’ গল্পগুলোয় উত্তম পুরুষে তিনি যাপিত জীবনের টানাপড়েন আর গভীর মনস্তাত্তি¡ক সংকটকেই তুলে ধরেছেন। আর রিজিয়া রহমানের উপন্যাসগুলো নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা সৃষ্টি। তার ‘শিলায় শিলায় আগুন’, ‘রক্তের অক্ষর’, ‘বং থেকে বাংলা’, ‘একাল চিরকাল’ প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে অমরত্বের দাবিদার। রিজিয়া রহমান অত্যন্ত সচেতনভাবে সাহিত্য রচনা করেছেন। তার সাহিত্য ‘বাজারি সাহিত্য’ নয় মোটেই। তিনি প্রতœতাত্তি¡কদের মতো ইতিহাস আর ঐতিহ্য খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে এনেছেন প্রায় প্রতিটি উপন্যাস। যেমন, ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটির ব্যাপ্তি বাঙালির জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি।
আবার নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে খুলনা অঞ্চলের এক বিপ্লবী রহিমউল্লাহর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বীরত্বগাথা নিয়ে লিখেছেন ‘অলিখিত উপাখ্যান’। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সাঁওতাল শ্রমিকদের জীবনচিত্র পর্যবেক্ষণ করে তিনি রচনা করেছেন… ‘একাল চিরকাল’। ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’ উপন্যাসে লিখেছেন ঢাকার অতীত ও বর্তমান জীবনযাপন। অপরদিকে চট্টগ্রামে হার্মাদ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন… ‘উত্তর পুরুষ’ উপন্যাসে। যাতে চিত্রিত হয়েছে আরাকান-রাজ-সন্দ-সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগিজদের ব্যবসায়ীদের নানা ফিকির। ‘রক্তের অক্ষরে’ তুলে ধরেছেন যৌনকর্মীদের জীবনের অব্যক্ত কান্নার চিত্র। তার অনেক উপন্যাসকেই বাঙালির আত্মপরিচয়-অনুসন্ধানী উপন্যাস হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু আমাদের দেশে রিজিয়া রহমানের সাহিত্য নিয়ে বড় বেশি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা হয়নি। যোগ্যদের যথাযথ মূল্যায়ন করার ব্যর্থতার খাতায় সম্ভবত রিজিয়া রহমানের নামটিও যুক্ত করতে হবে। অর্থশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রিধারী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা সাহিত্যিক কিছুটা অলক্ষ্যেই ১৬ আগস্ট প্রয়াত হয়েছেন। প্রিয় এই সাহিত্যিকের মহাপ্রয়াণে জানাই শ্রদ্ধার্ঘ্য। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]