• প্রচ্ছদ » » সলিমুল্লাহ খান : আমাদের কালের নায়ক


সলিমুল্লাহ খান : আমাদের কালের নায়ক

আমাদের নতুন সময় : 20/08/2019

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

১৮ আগস্ট ছিলো সলিমুল্লাহ খানের জন্ম দিবস। আমরা যাহারা কার্ল মার্ক্সকে সশরীরে দেখিবার সৌভাগ্য অর্জন করি নাই তাহাদের কাছে সলিমুল্লাহ খান ছিলেন কার্ল মার্ক্সের নিকটতম তুলনা। বলিতে গেলে সলিমুল্লাহ খান ছিলেন নাদানের কার্ল মার্ক্স। ইহা সেই সময়ের কথা -১৯৭৭ কি ১৯৭৮ যখন আমরা সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় প্রথম দফা নাম লেখাইয়াছি। তাহার “প্র্যাক্সিস জার্নাল” আমাদের জন্য বিস্ময়ের বিষয় ছিল। পরবর্তীকালে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়াছে। যখন “দ্যু কোঁত্রা সোসিয়াল” পড়িতে হইল তখন মনে হইল সলিমুল্লাহ খান বাংলাদেশের জঁ জাক রুশো; এক সময় মনে হইল তিনিই আমাদের মিশেল ফুকো; আমাদের মনে হওয়ার প্রক্রিয়া এইখানেই শেষ হইল না। হালে মনে হইতেছে তিনি বাঙালা ভাষার জাক লাকাঁ। আমাদের এই মনে হওয়ার পারম্পর্য হাসিয়া উড়াইয়া দেওয়ার বিষয় নহে। সলিমুল্লাহ খান বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আইন অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। পরীক্ষায় উচ্চতম কৃতিত্ব থাকিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহার অধ্যাপকের চাকুরি হয় নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ নিয়মের ব্যতিক্রম করিল। ইহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। ইতিহাসে এই রূপ ঘটনা আরও আরও রহিয়াছে। সে যাহাই হউক, কেন তিনি আইন অধ্যয়ন করিয়াছিলেন তাহার কারণ স্বতঃস্পষ্ট নহে। তিনি অর্থনীতি পড়িলে মানাইতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তখনও আবু মাহমুদের মতো পÐিত ব্যক্তি শিক্ষকতা করিতেন। তাহাকে পছন্দ না-করিবার কোনও কারণ সলিমুল্লাহ খানের পক্ষে ছিল না। তথাপি তিনি আইনই পড়িলেন; অথচ লিংকনস ইন-এ গেলেন না, ব্যারিস্টারিও করিলেন না; লিংকনস ইন্-এর দেয়াল ঘেঁষিয়া লন্ডন স্কুল অফ ইকনম্কিস এÐ পলিটিক্যাল সায়েন্স, সেইখানেও গেলেন না, ফ্যাবিয়ান সোসাইটি কর্তৃক প্রতিষ্ঠা সত্বেও না। অন্যদিকে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন মুল্লুকের প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করিয়া দেশ ত্যাগ করিলেন। তিনি দুই দফা অধ্যাপনা করিয়াছিলেন বলিয়া জনশ্রæতি রহিয়াছে। ইহার প্রথমটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে; এই সূত্রে আহমদ ছফা তাহাকে ‘অধ্যাপক’ বলিয়া সম্বোধন করিতেন। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান নামটি বেশ ভারী; তাহাকে খুব মানায়।
১৯৮৬ অভিনেতা রোনাল্ড রেগান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদে কর্মরত। তাহার উত্তরে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে জর্জ বুশ এবং ১৯৯৩ এ উইলিয়াম ক্লিনটন পর্যাক্রমে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। ২০০১-এ জর্জ বুশ (জুনিয়র) ক্ষমতা গ্রহণের আগেই সলিমুল্লাহ খানের মতিকারেক্ট হয়, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন। মার্কিন দেশে অবস্থানের কালে তিনি ‘দর্শনের ডাক্তার’ হিসাবে প্রাতিষ্ঠিানিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। তাহার অভিসন্দর্ভের বিষয়বস্তু ছিল লÐনের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের নীতিমালা (ঞযবড়ৎরবং ড়ভ ঈবহঃৎধষ ইধহশরহম রহ ঊহমষধহফ: ১৭৯৩-১৮৭৭) ইত্যাদি। মূলত তিনি কাগুজে টাকার ইতিহাস সন্ধানে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে ব্যাংক অব ইংল্যাÐের প্রতিষ্ঠা হইলো এবং মুদ্রণ যন্ত্রের প্রচলন না-থাকা সত্বেও তাহারা অবিলম্বে হাতে-লেখা কাগুজে টাকা ব্যবহার করিতে শুরু করিল — ইহার অধিকতর জানিবার প্রয়োজন আমজনতার নাই। কিন্তু সলিমুল্লাহ খান দেখিলেন ইতিহাসের বয়ানে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন লুক্কায়িত রহিয়াছে। তিনি মনোমত গবেষণার অবকাশ খুঁজিয়া পাইলেন। তাহার অনুসিন্ধৎসার দিগদর্শন এইরূপই বটে: যাহা স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া কথিত ও গৃহীত তাহাকে প্রশ্ন করিয়া গণেশ উল্টাইয়া দিতে তাহার জুড়ি নাই। স্বাভাবিক ভাবেই এই গবেষণায় সময় বেশি লাগার কথা নহে, ইতোমধ্যে বৃত্তির মেয়াদও উত্তীর্ণ, অতএব কালক্ষেপণ না-করিয়া তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। অসাধারণ ব্যক্তিরা এক ঢিলে দুই পাখি মারিতে পারঙ্গম। তবে খান সাহেব বলিয়া কথা; তিনি এক ঢিলে তিন-চার পাখি ঘায়েল করিবার নিয়ত করিলেন। কার্যতঃ ভ্রমণগুলি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক করিলেন: কোথাও বক্তৃতা দিলেন, কোথাও ২-৩ সেমিস্টার মাস্টারি করিলেন। নানা মেলায় রথ দেখিলেন, কলাও কিছু বেচিলেন, তহবিলে নগদ কিছু আসিল। বহু বহু প্রসিদ্ধ ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করিলেন। একই সঙ্গে পুরানো বইয়ের দোকান ঘাঁটিয়া সংগ্রহ করা দুষ্প্রাপ্য বইপুস্তকের অধ্যয়ন চলিতে লাগিল। ১৯৯৭’র দিকে জাক লাঁকা (১৯০১-১৯৮১) নামীয় এক ফরাসী ব্যক্তির কবলে পড়িলেন, অপরিচিত জার্মান কবি ডরোথি জুল্লের (উড়ৎড়ঃযবব ঝস্খষষব) পাল্লায় পড়িয়া তাহার কবিতা পর্যন্ত অনুবাদ করিলেন এবং প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্রেরণ করিলেন। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্টের সাত-সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা হইয়া গেল: এক সিটি ইউনিভার্সিটিতেই সাত বছর মাস্টারি করিলেন। কাজের মধ্যে যাহা হয় নাই তাহা হইলো পিএইচডি’র জন্য অত্যাবশ্যকীয় অভিসন্দর্ভটি লিখিয়া ফেলা। অভিসন্দর্ভটি দাখিল করা হইলে মার্কিন মুল্লুকে অবস্থানের যৌক্তিকতা কিঞ্চিৎ লঘু হইয়া যায় বটে।
১৯৯৯’র জুন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। খান সাহেবের সিদ্ধান্ত হইলো পিএইচডি‘র অভিসন্দর্ভটি লিখিতে আর বিলম্ব করিবেন না। মেঘে মেঘে বেলা কম হয় নাই। জুলাইয়ে কলম ধরিলেন, নবেম্বর নাগাদ লেখা সমাপ্ত হইলো। এক নজর চোখ বুলাইয়া মনে হইলো জিনিসটি খুব একটা খারাপ হয় নাই। তিনি তাহা নিউ স্কুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করিলেন। দাখিল করিলেই তো আর হইবে না। পÐিত শিক্ষকদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া প্রমাণ করিতে হইবে তিনিই ইহার নির্ভেজাল রচয়িতা। উপযুক্ত পÐিত তালাশ করিয়া পাইতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছু সময় লাগিলো। কেন লাগিলো তাহার কারণ আছে। শুরুতে বিষয়টি এক রকম ছিলো: শুদ্ধ অর্থনীতির বিষয়; অর্থনৈতিক চিন্তার বিবর্তনের বিষয়, টাকা-কড়ির চাহিদা-সরবরাহের বিষয়। কিন্তু ১৯৯৭-এ তিনি জাকা লাকাঁর ফাঁদে ধরা দিয়াছেন; পরিণামে তাঁহার জ্ঞানচক্ষু উন্মেলিত হইয়াছে। সদ্যোণ্মেষিত জ্ঞানচক্ষুর সুবাদে ব্যাংক অব ইংল্যাÐে’র কাগুজে টাকার প্রচলন বিষয়ে মস্তিষ্কে নতুন প্রশ্নের উদয় হইয়াছে। ইহাতে যাহা হইবার তাহাই হইলো। তিনি সহজ বিষয়টিকে ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘প্রোবলেম্যাটাইজ’ করিলেন। অনিবার্যভাবে তিনি শুদ্ধ টাকা বলিতে কী বোঝায় তাহা বিশদ করিতে গিয়া দুই অধ্যায়ে অকাতরে ২০০ পৃষ্ঠা খরচ করিয়া ফেলিলেন। কারণ ঐ ২০০ পৃষ্ঠায় জাকা লাকাঁর ভাষাদর্শন ব্যবহার করিয়া তিনি দেখাইতে চেষ্টা করিলেন ‘টাকা’ জিনিসটা আসলে কী মুখের জবান কী করিয়া টাকায় পরিণত হয়। বাজারচলতি টাকার পিছনে ‘গোল্ড মানি’ অর্থাৎ একটা ‘সলিড মানির’ সমর্থন থাকিতে হয়। নিউ ইয়র্কে বসিয়া তিনি লÐনে কীভাবে তিন শত বৎসর পূর্বে কাগজকে সফলভাবে টাকা হিসাবে চালানো সম্ভব হইল তাহার কার্যকারণ সূত্রাদি আবিষ্কার করিতে চেষ্টা করিলেন। মানুষ সোনাকে টাকা মানিতে অভ্যস্ত ছিলো; এখন কাগজকে টাকা মানিতেছে। ঘটনাটা কি? এইখানে তিনি মসিউ জাক লাকাঁর প্রযুক্তি লাগসই ভাবে কাজে লাগাইলেন। তিনি দাবি করিলেন ‘মানি ইজ এ সিগনিফায়ার’। এহেন ব্যাখ্যা যাচাই করিবার সমঝদার শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় তল্লাটে সহসা পাওয়া গেল না। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হইলো। ২০০০-এর এপ্রিলে তিনি এক সাক্ষাৎকারে সমঝদার শিক্ষকদের সম্মুখে প্রমাণ করিতে সক্ষম হইলেন যে অভিসন্দর্ভটি নিখাঁদ তাহারই রচনা; তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা বুঝিয়া-শুনিয়াই লিখিয়াছেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বহিরাগত অধ্যাপক-পরীক্ষক সহকর্মীকে শুধাইলেন, “আমরা কি পাস করিয়াছি?” স্মিত হাস্যে মাথা নাড়িয়া আভ্যন্তরীক অধ্যাপক-পরীক্ষক তাহাকে আশ্বস্ত করিলেন। ফাঁড়া কাটিয়া গেল। ফাঁড়া কাহার কাটিল তাহা অনির্ণিত রহিয়া গেল। তবে অবিলম্বে তাহাকে ‘ডক্টরেট অব ফিলোসফি’ ডিগ্রি উপহার দেওয়া হইলো। তিনি বিনা প্রতিবাদে এই উপহার গ্রহণ করিলেন ও ‘ড. সলিমুল্লাহ খান’ হইলেন। স্টেথোস্কোপবিহীন ‘ডক্টর’ হইলে কিছু একটা করিতে হয়: তিনি সুইডেন গমন করিলেন। সুদীর্ঘ মার্কিন অবস্থানে প্রচুর বইপত্র সংগ্রহ করিয়াছিলেন। এই সব কোথায় গেল তাহা রহস্যই রহিয়া গেল। এতো এতো দেশ থাকিতে কেন সুইডেনকে বাছিয়া লইলেন তাহাও প্রশ্নযোগ্য। কে তাহাকে ফেলোশিপ জোগাড় করিয়া দিল এই প্রশ্নও অবান্তর নহে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]