• প্রচ্ছদ » » সলিমুল্লাহ খান : একজন গণবুদ্ধিজীবীর উত্থান


সলিমুল্লাহ খান : একজন গণবুদ্ধিজীবীর উত্থান

আমাদের নতুন সময় : 21/08/2019

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

নতুন সহ¯্রাব্দের অভিষেকের পূর্বেই সলিমুল্লাহ খান দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। তখন বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইতেছে। উদ্দেশ্য মহৎ : বেশি সংখ্যক কলেজ-পাস ছাত্রকে ‘উচ্চ শিক্ষা’ দিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়ানো হইয়া থাকে বটে, কিন্তু তাহার পশ্চাতে শিক্ষকদের ক্রমবর্ধমান পঠন, চিন্তা ও গবেষণা থাকিতে হয়। ইহা কাগুজে টাকার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনা জমা রাখিবার নীতির মতো। বাংলাদেশে ইহার ব্যত্যয় না ঘটাইয়া উপায় ছিলো না। ফলে ‘কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট একটি সিগনিফায়ার’ তাহা লইয়া গবেষণার ফোকর তৈরি হইলো। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জীবিকার একটি প্রশস্ত সড়কের উদ্বোধন হইয়া গেলো তাহাতে সন্দেহ নাই। স্বদেশে প্রত্যাবাসনে উন্মুখ সলিমুল্লাহ খানের সুবিধাই হইলো।
সুইডেন হইতে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর প্রণোদনায় ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরাসউদ্দিন মহোদয় তাহাকে অর্থনীতি বিভাগে ছাত্র পড়ানোর চাকুরি দিলেন। তবে এই চাকুরি দীর্ঘ জীবন লাভ করিলো না। তিনি সত্বর ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফেলোশিপ সংগ্রহ করিয়া ফেলিলেন। প্রচলিত উদ্দেশ্যের বিচারে ইহাকে ‘পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ’ বলিলেও বলা যাইতে পারে, তবে কাজের মধ্যে লন্ডন শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা, লাইব্রেরিতে গিয়া বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা, মাঝে মধ্যে সোয়াসে গিয়া বক্তৃতা দেওয়ার বেশি কিছু নহে। অতিরিক্ত, হয়তো কখনো গাঁটের পাউন্ড বিসর্জন দিয়া কভেন্ট গার্ডেন কি লেস্টারস্কয়ারে গিয়া অস্কার ওয়াইল্ডের কোনো নাটকের অভিনয় দেখিয়া থাকিবেন। তাহার লন্ডন-প্রবাসও দীর্ঘজীবন লাভ করিলো না। অন্তর্বর্তীকালে কিছুদিন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়াইয়া তিনি ২০০২ নাগাদ দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাস্থ ইউনিভার্সিটি অব ডিভেলভমেন্ট অল্টারনেটিভে শিক্ষকতার চাকুরি গ্রহণ করিলেন। ইহার পশ্চাতে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন মহোদয়ের বিশেষ প্রণোদনা ছিলো।
মানবজীবনে যৌবন ছদ্মবেশী প্রতারকের ন্যায় আবিভর্‚ত হয়। এই সময় সে প্রেমে পড়ে, কবিতা লেখে, ভুল করে। সলিমুল্লাহ খান যৌবনের প্রারম্ভে ভালোবাসিয়া আইন অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। ওকালতিতে যশ অর্জন করা সুকঠিন বিষয়। এই বিষয়ে সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল থাকিয়াও যথাথভাবে পরীক্ষা ইত্যাদি দিয়া ২০০৩ সনে তিনি ঢাকা বারের ‘সনদ’ অর্জন করিলেন এবং ২০০৫ পর্যন্ত পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন ওকালতি কী জিনিস। কৌত‚হলবশতঃ ভুল পাত্রে চুমুক দিলেও তিনি অচিরেই সঠিক পাত্রে প্রত্যাবর্তন করিলেন : ২০০৫ এর নভেম্বর হইতে ঢাকারই স্ট্যাম্পফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে তাহার একটি গালভরা পদবি লাভ হইলো যথা ‘চিফ একাডেমিক এডভাইজার’। দীর্ঘ সাত বৎসর এইখানে অতিবাহিত করিয়া ২০১২’র জানুয়ারিতে ঠিক কাহার প্রণোদনায় তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবেরেল আর্টসে যোগ দিলেন তাহার হদিস আমাদের কাছে নাই। অদ্যাবধি এই প্রতিষ্ঠানই তাহার ঠিকানা। এইখানে চাকুরিসূত্রে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের সাধারণ শিক্ষা দিয়া থাকেন। ইহার অতিরিক্ত তিনি সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড থিওরির পরিচালকও বটে। কিন্তু এইসব সাংসারিক তথ্য মাত্র।
যে সকল কথা আসল এবং বিশদ করিয়া বয়ানের দাবি রাখে তাহা হইলো ইতোমধ্যে তাহার পঠন ও লেখার ব্যাপ্তি ঘটিয়াছে, তাহার প্রকাশিত রচনাদির বিশাল পাঠকসমষ্টি জুটিয়াছে, তাহার একটি গণভাবমূর্র্তি বিকাশমান পর্যায় অতিক্রম করিয়াছে। বক্তৃতা সভায় অংশগ্রহণ ও টেলিভিশনের আড্ডায় যোগদানের মহিমায় দেশের সুধীজন দেশের এক জাদুকরী বক্তার সন্ধান লাভ করিয়াছে যিনি মাওলানা জাকির নায়েকের মতো সাক্ষী-সাবুদের নামে প্রতি সেকেন্ডে একটি বইয়ের প্রকাশকের নাম, সংস্করণের সংখ্যা ও সন, পৃষ্ঠা ও পঙক্তি সংখ্যা উল্লেখ করিয়া ধাঁধা লাগাইয়া দিতে পারেন, যাহার রচনার পশ্চাৎপটে নীরদ সি চৌধুরীর চাইতেও কয়েক কাঠি ক্ষুরধার ও অনুসন্ধিৎসু চিন্তকের অবস্থান রহিয়াছে। মোটের উপর বাংলাদেশের বুদ্ধিচর্চার মহলে আচার্য সলিমুল্লাহ খান একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসাবে আবিভর্‚ত হইয়াছেন। তাহার ‘গণবুদ্ধিজীবী’ আখ্যা জুটিয়াছে। প্রবীণেরা হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তাকে তাহার বিরুদ্ধে ব্যবহার করিয়াছেন। সলিমুল্লাহ খানের ক্ষেত্রে ইহা সম্ভব হইলো না।
সলিমুল্লাহ খানের বাংলা লেখার ভাষায় একটি বিশিষ্ট স্টাইল রহিয়াছে যাহা পাঠক পছন্দ করিয়াছে। তাহার সাধুভাষা, যুৎসই শব্দচয়ন, ক্ষেত্রবিশেষে আক্রমণাত্মক ভঙ্গি, উপযুক্ত ক্ষেত্রে যাহাকে বলে আন্ডার দ্য বেল্ট আঘাত, সৎ ও সাহসী বক্তব্য – সবই পাঠকের নিকট রুচিময় ঠেকিয়াছে। বিশ্লেষণে চুলচিরিয়া তিনি পাঠককে অভিভ‚ত করিয়াছেন। অপার কৌতুকবোধের পাড় এই ভাষাকে আদরণীয় করিয়া তুলিয়াছে। ইহার সুফল হইলো এই যে পাঠকÑ তাহার বয়স বা মানসিক পরিণয় যাহাই হউক না কেনÑ তাহাকে পাঠ করিবার কষ্ট স্বীকার করিতে কসুর করিতেছে না। কাজী আনোয়ার হোসেন এবং হুমায়ূন আহমেদ পূর্ব বাঙালীকে পয়সা খরচ করিয়া বই কিনিয়া ফিকশন পাঠ শিখাইয়াছিলেন। সম্ভবত ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান ভাতৃদ্বয় পূর্ব বাঙালিকে নন-ফিকশন পাঠ শিখাইলেন। আমার আশা : ইহার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হইবে। তাহাদের গুরু জ্ঞান করে এইরূপ ভক্ত ও অনুসরণকারীদের সংখ্যা কম নহে। সলিমুল্লাহ খান বলিয়াছেন তিনি লেখক হইবেন ভাবিয়া লেখালিখি শুরু করেন নাই। একসময় চৈতন্যোদয় হইলে হিসাব কষিয়া দেখিলেন শুদ্ধ প্রবন্ধ ছাড়া তিনি বিশেষ আর কিছু লেখেন নাই। তাহাতে কেহ এমত সংশয়ে নিপতত হইতে পারেন যে তিনি অন্য আর কিছু লিখিতে পারেন না। এই কথাটি সর্বাংশে সত্য নহে কেননা তিনি অনুবাদ কর্মও করিয়াছেন, পদ্যও লিখিয়াছেন বলিয়া জনশ্রæতি রহিয়াছে। এই জনশ্রæতির সমর্থনে পাঠকের দরবারে কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধারণ করিতেছি :
‘তোরা দেখে যা, আমি না মায়ের কোলে/বলুন পাঠক এবং পাঠিকা/কি নকল করলো কবি নজরুল থিকা/আমি না এর মধ্যে থামি, আমিনার মধ্যে থামি না/আমি অর্থ শুধু আমি না/কে এই নায়ক যদি অন্তর্যামি না/না বলেই হ্যাঁ বলি কোলে থেকে নামি না/তোরা দেখে যা, আমি না মায়ের কোলে।’
প্রসঙ্গত পাঠক ইচ্ছা করিলে শুনিয়া রাখিতে পারেন যে, কবি সলিমুল্লাহ খানের প্রথম কবিতার বই ‘এক আকাশের স্বপ’ ১৯৮১ সনে বাঙলা অ্যাকাডেমির বইমেলায় প্রকাশিত হইয়াছিলো। ইহা তাহার প্রথম এবং অদ্যাবধি সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমার প্রধান ব্যবসায় কবিতা নহে। তাহা বলিয়া কবিতা আমি ত্যাগ করেছি এমনও নহে।’ ইতোমধ্যে তাহার অনেক কয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে। পাঠক সম্যক জানেন, তিনি কোনোটির উৎসর্গপত্র কবিতায় লিখিয়াছেন। ফরাসী যুবক শার্ল বদল্যেয়ারের অনবষ বঃ ঈধশুহ কবিতাটির যে বাংলা অনুবাদ তিনি গঠন করিয়াছেন তাহা মনোরোম। তাহার ‘তরঙ্গ ও ত্রসরেণু’ কবিতাটি আমার বিশেষ প্রিয়। তাহা উদ্ধারণের আকাক্সক্ষা সংবরণ করিলাম না তরঙ্গ ও ত্রসরেণু : সলিমুল্লাহ খান
অনন্তের চুপ থেকে জেগে ওঠো তুমি/ভালোবাসা আমাদের কথা হয়ে যায়/ঘাসের প্রতিটি পাতা মুখ তুলে চায়/প্রথম চুমুর শব্দে কেঁপে ওঠে ভ‚মি।/একটি মৃগী ও দুটো মাঠের হরিণী/নাগরঙ্গ বৃক্ষতলে আসে আর যায়/অনন্তও ভালোবেসে মুহূর্ত হারায়/চিন্চিন্ ব্যথা পাই ওলো বিড়ালিনী।/তুমিও তরঙ্গ তবে? তরঙ্গ কি কণা?/বিকেলের ত্রসরেণু চুমুতে সাজায়/যেভাবে আমাকে তোমার হৃদয় টবে/অন্ধকার ভালোবাসে। এভাবে কি হবে/বলো বালিকা আমার, প্রতিটি পাতায়/যদি ফুটে থাকে ফুল, সময়ের ফণা?




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]