এটা কিসের রাজনীতি রে ভাই!

আমাদের নতুন সময় : 23/08/2019

নাজমুল হাসান পাপন

আমার সামনে তখন লাশের স্ত‚প… আম্মার কাছে যেতে হলে সেই লাশ ডিঙিয়ে যেতে হবে, উপায় নেই যাওয়ার কোনো। আমি তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আম্মা তুমি চিন্তা করো না, আমি চলে আসছি।’ জানি না কেন যেন আম্মা মাথাটা নাড়লেন তখন, বুঝলাম যে উনি বেঁচে আছেন। ওখানে যারা ছিলো তাদের জিজ্ঞেস করলাম যে এখন কি করতে হবে। ওরা একটা লিস্ট দিয়ে বললেন, এক্ষুণি এই এই ওষুধগুলা লাগবে। আমি বললাম যে, ঠিক আছে, আপনাদের এখানেই তো ফার্মেসি আছে তাই না? ওরা বললো যে না হাসপাতালের ফার্মেসি বন্ধ। এটা আজকে আর খুলবে না। আশপাশে অনেক ওষুধের দোকান শত শত। সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, কোনো ওষুধ পাবে না কেউ।’ ‘এর মধ্যে অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে কারণ রক্তক্ষরণ থামানো যাচ্ছে না। একজন এসে বললো, এই মুহূর্তে অপারেশন করতে হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডাক্তারের অভাব নেই। আমি বললাম, তাড়াতাড়ি ডাকেন তাহলে। ওরা বললো, কাকে ডাকবো? কোনো ডাক্তার নেই। আম্মাকে যে একটু দেখবে, সার্জারি করবে, সেরকম একটা ডাক্তারও তখন নেই, সবাইকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দেখতে দেখতে প্রায় তিন ঘণ্টা চলে গেলো।’ ‘আমরা ঠিক করলাম, আম্মাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে আম্মা একটু চিকিৎসা পেতে পারে। অলরেডি এতো রক্তক্ষরণ হয়েছে কোনো রকমে আম্মাকে ধরে তুললাম, একটা অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে সেটাতে ওঠালাম। পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাবো। গেট দিয়ে বের হবো, এমন সময় চারদিক থেকে পুলিশের বাধা, কোথায় নাকি যাওয়া যাবে না। আহত কাউকে কোথাও নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি বললাম, তাহলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন আপনারা। ডাক্তার আনেন, ওষুধ আনেন। ওরা বললো, উপরের নির্দেশ, আমরা কোথাও যেতে দিতে পারবো না।’
‘যাই হোক, তখন আমিও ফোনটোন করা শুরু করলাম। একটা পর্যায়ে তারা বললো, আম্মাকে শুধু সিএমএইচে আমরা নিয়ে যেতে পারবো, আর কোথাও না। ভেবে দেখলাম, এখানে তো কোনো চিকিৎসাই হচ্ছে না, পানির মতো রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে শরীর থেকে। সিএমএইচ তো ভালো, ওখানে গেলে নিশ্চয়ই চিকিৎসা হবে।’
‘এই কাহিনিগুলো বলার মতো নয় আসলে। ক্যান্টনমেন্টের গেটে বসিয়ে রাখলো একঘণ্টা, ঢুকতে দেবে না। সিএমএইচে যাওয়ার পর বলে, আর্মি অফিসারের রিকমেন্ডেশন লাগবে। আমার আম্মা ওখানে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়, মানুষটা মারা যাচ্ছে, এ রকম অবস্থায় টানা আট-নয়টা ঘণ্টা আমার আম্মাকে কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি।’ ‘একুশ তারিখে গ্রেনেড হামলাটা হয়, তেইশ তারিখ রাত বারোটায় আমি সিএমএইচ থেকে বাসায় আসি। পরদিন থেকে আটচল্লিশ বা বাহাত্তর ঘণ্টার হরতাল, আওয়ামী লীগ ডেকেছিলো। ঠিক রাত দুটোর সময় আমাকে ফোন করা হলো বললো, খবর পেয়েছেন তো? আমি বললাম কি খবর? বললো, আপনার আম্মা তো মারা গেছেন। একটু আগে দেখে গেলাম মানুষটা বেঁচে আছেন, এর মধ্যেই মরে গেলেন! আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি আসছি।’
‘ফোনের ওপাশ থেকে বললো, এসে কোনো লাভ নেই, আমরা দাফন করে দিচ্ছি। আমি বললাম, দাফন করবেন মানে? আমাদের আত্মীয়-স্বজন আছে, আমার আব্বা আছেন, সবাইকে জানাতে হবে, জানাজা পড়াতে হবে, কবর দেয়া… এগুলো আমরা করবো। ওরা বললো যে না, উপরের নির্দেশ, সব এখানেই করতে হবে। লাশ বাইরে নেয়া যাবে না। কিসের মধ্যে দিয়ে যে গেছি আমি, আজ পর্যন্ত এগুলো কাউকে বলিনি।’ ‘কি বলবো বলেন? এতো কিছু করার পরও মানুষের মধ্যে তো মনুষ্যত্ববোধ বলে একটা জিনিস থাকে। এরা কি রাজনীতি করে? বোমা মারলো, হামলা করলো, শত শত মানুষ আহত-নিহত, তাদের চিকিৎসাটাও করতে দিলো না। লাশও নাকি দেবে না। এটা কিসের রাজনীতি রে ভাই?’ লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]