• প্রচ্ছদ » » ভারতের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসে ঋতুমতী বোনের লাঞ্ছনা!


ভারতের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসে ঋতুমতী বোনের লাঞ্ছনা!

আমাদের নতুন সময় : 23/08/2019

সুবীর পাল, কলকাতা

দেখতে দেখতে ভারতের ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসও পেরিয়ে গেলো। যে যখন শাসক, তখনই তাদের সেকি স্বর্গনিনাদ দাবি, ‘মেরা ভারত মহান’। আর ভোটাররা বড্ড ভুল পথে চালিত হলেন বলে শাসক-পরিবর্তিত বিরোধীদের মতৈক্য,আর ভারত এক ডুবন্ত টাইটানিক। তবু বিশ্বের দরবারে আমার ভারত আজ ডিজিটাল ইন্ডিয়া। সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীন ভারতকে সমীহ করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিতেও দেশীয় ওয়্যাল বুল যেন তেজী ঘোড়া। তবু বিশ্বাস করতে খারাপ লাগলেও এতোকিছুর পরেও আমাদের দেশের কিছু স্বঘোষিত শাহেনশাহ নিজেদের আদিমতার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে আজো অক্ষমই রয়ে গেলো। দেশ ঠিকই স্বাধীন। ভারত বাস্তবিকই স্বনির্ভর। কিন্তু এই শাহানশাহরাই মানসিক দিক থেকে বর্বর ও দেশের কলঙ্ক। এরা নারীজাতির লজ্জা ও করুণার। এদের জন্যই আজো সমাজে কুণ্ঠিত ঋতুমতী নারী।
ভাবতেই পারেন ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসের প্রসঙ্গ তুলে ঋতুমতী নারীর কুণ্ঠার ব্যাপরটা চলে আসছে কেন? এসব কী বলে চলেছি আমি? আসলে প্রসঙ্গটা বছর দুই আগেকার। চলুন মূল দৃশ্যপটে আসা যাক।
কোনো একটি তথাকথিত মিডিয়া হাউস। তখন আমি ইনপুট এডিটর হিসেবে সবে কাজে যোগ দিয়েছি। আমারই অধীনস্থ একটি মেয়ে আমার সামনের ডেস্কে বসে কপি এডিটিং করছিলো। সঙ্গে একেবারে নিজের চেষ্টায় নিউজ রিডারের কাজটাও বেশ শিখে ফেলেছে। ঝকঝকে চেহারা। খুবই মিশুক। মুখে হাসি লেগেই আছে। কাজের ফাঁকে কিপটে বলে রাগাতাম ওকে। এখন সে প্রতিষ্ঠিত এক নিউজ চ্যানেলের খুবই পরিচিত মুখ। নামি সংবাদপাঠিকা।
মাত্র দু’দিন আগের কথা। সেদিন বিকেলে সে জানায়, তার মা হাসপাতালে ভর্তি। মুখটা ছিলো খুবই থমথমে। মাথা নীচু করে অনুরোধ করলো, ঘণ্টাাখানেক ছুটি দরকার। অসুস্থ মাকে ওষুধ কিনে দিতে হবে। তৎক্ষণাৎ আমি তাকে হেসে বলি, “দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মায়ের কাছে যা। আর কোনও দরকার হলে এই দাদাটাকে বলিস।” ঠিক দুদিন পর আবার মেয়েটি আমাকে ডকে বললো, “সুবীরদা, একটা পার্সোনাল কথা ছিলো। তখন ঘড়িতে বেলা বারোটা ছুঁই ছুঁই। সবে অফিসে ঢুকেছি। সে কিন্তু আমার অনেক আগেই হাজির। তবু ওর মুখ দেখেই মনে হলো, বেশ চিন্তিত এবং আরষ্টও। যেন আমারই জন্য অপেক্ষা করছিলো। অফিসে কয়েকজন নারী ও পুরুষ সহকর্মী ইতিমধ্যেই উপস্থিত। সবাইকে দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি বললাম, “বল, কী বলবি?” মেয়েটি অবাক করে জানালো, কিছু কথা একমাত্র সে আমাকেই বলতে চায়। তারপর চুপিসারে বললো, “দাদা এখানে নয়, অফিসের বাইরে লন-এ চলুন। গেলামও তাই। শুধু দু’জনে।
হঠাৎই আমাকে বললো, “দাদা, আপনাকে বাবার চোখে দেখি। সেই ভরসায় আমি বাধ্য হয়ে আপনার একটা হেল্প চাইছি।” ওকে দেখেই বুঝলাম মেয়েটি বিপদগ্রস্ত। কিন্তুএকটা চাপা আতঙ্কে কাউকে কিছু বলতে পারছে না। আমি নির্ভয় দিতেই সে চোখটা নামিয়ে জানালো, কিছুক্ষণ হলো তার মাসিক শুরু হয়ে গেছে। তাই তার আবার ছুটি চাই। কিন্তু কাকে বলবে সে-কথা? তেমন কেউ নেই যে, যাকে ভরসা করে এটা বলা যাবে। আবার সবে দু’দিন আগে ছুটি নিয়েছে! তাই ছুটি যে সে পাবে না, তা নিশ্চিত। সঙ্গে সঙ্গে এও বললো, বেশি দেরি হলে তার পরনের পোশাকও নষ্ট হয়ে যাবে। সেটাও যে তার কাছে ভারি লজ্জার। আমি জানতে চাইলাম, “অফিসে তো ফাস্টএইড বক্স আছে। অফিস স্টকে স্যানিটারি প্যাড রাখা থাকে তো বল, আমি নিজে যোগাড় করে দিচ্ছি।” খানিকটা উষ্মা প্রকাশ করেই বললো, “আপনি পাগল হয়েছেন দাদা। ওসবের মর্ম যদি অফিস বুঝতো তাহলে কি আপনাকে বলতাম? কেউ জানলে তো আমি ফিসফিসানির বিষয় হয়ে যাবো অফিসে। উলটো ছুটিও পাবো না।” ওর কথার সারমর্ম যে কতো কঠিন বাস্তব, তা আমি তখনই অনুমান করেছিলাম। আমার পেছনের কাপড়টা খারাপ হয়ে যায়নি তো দাদা? একটু পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে এ’কথা বলতেই আমি বললাম, “না রে পাগলি, তোর কুর্তাটা ঠিকই আছে। বরং ওড়নাটা আর একটু নামিয়ে রাখ, আগাম সেফটি হিসেবে। ‘প্লিজ দাদা আমাকে বাঁচান। এবারের মতো আপনি ছুটি দিন। আমি জানি আমাকে কেউ ছুটি দেবে না।” ওর এই করুণ আর্তিটা কানে যেতেই আমার প্রায় যুবতী মেয়েটির কথা মনে পড়লো। পরম স্নেহে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “আমাকে তুই এতো ভরসা করিস? কাউকে কিছু বলতে হবে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি সুবীরদা ছুটি দিয়েছে। নিশ্চিন্তে বাড়ি যা এখুনি। যথারীতি মেয়েটা চলে গেলো কিছুটা নিশ্চিন্তে। এরপরই বাঁধলো গোল। আমি বলবো, অসভ্যতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘেমে নেয়ে হাজির সুদর্শন এক সিনিয়র নিউজ রিডার। বরাবরি সে আমাকে সম্মান দিতে কার্পণ্য করেনি। সে বললো, “দাদা তুমি নাকি ওকে ছুটি দিয়ে দিয়েছো। এখন নিউজ কে পড়বে তাহলে?” আমি হেসে বললাম, “কন তুই তো আছিস। সে কিছটা মৃদু প্রতিবাদ করেই বললো, “এই তো দু’দিন আগে ছুটি নিলো। আবার আজকে আচমকা চলে গেলো? এতে তো অফিসের সিস্টেম ভেঙে পড়বে। আমি তাকে শুধু জানালাম, “ওর বড্ড বিপদ বলে ওকে ছেড়ে দিয়েছি। আর সহকর্মীর বিপদে তো সহকর্মীদের পাশে থাকতেই হয় তাই না?” ওই সুদর্শন নিউজ রিডার আমার মুখের ওপর কিছু বললো না ঠিকই; কিন্তু সেযে আমার কথাটা মেনে নিতে পারেনি, তা উপলব্ধি করলাম হাবেভাবে। কারণ কিছুক্ষণ পরেই মালিক কাম এডিটরের গম্ভীর তলব। আমাকে একাকী। তার চেম্বারে। যদিও এডিটর বিলক্ষণ জানে আমি ভীষণ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সাংবাদিক। চাকরির তোয়াক্কা আমি কোনোদিনই করিনি। কোনও মিডিয়াতেই না। তবু এডিটর আমাকে সরাসরি বললো, “তুমি ওকে বারবার ছেড়ে দিচ্ছো কেন?” আমি তখনই জবাব দিলাম, “এডিটোরিয়াল বিভাগটা আমার অধীনস্থ। আমার কাজ ওঠানোর কথা। কাজ উঠে তো যাচ্ছে। তাই আমার এইটুকু স্বাধীনতা আছেই, খুব জরুরী কাউকে ছুটি দেয়ার।” ক্রমেই তর্কের মাত্রা বাড়তেই লাগলো। তাই বাধ্য হয়েই সব বিষয়টা আমি এডিটরকে খুলে বললাম। ভাবলাম সুরাহা হবে মানবিক পর্যায়ে। কিন্তু কাকে বললাম ওই কথাটা? সে সরাসরি ঐ মেয়েটির উদ্দেশ্যে ছুড়লো দু’চারটে কাঁচা কাঁচা অকথ্য নির্লজ্জ গালি। আর আমাকে বলল, “ওইরকম সব মাগীদের কথায় ভরসা করতে হয়? দেখ গে যাও, ফলস মেরে কার সঙ্গে এখন পার্কে জড়াজড়ি করে বসে আছে।” আরও কুৎসিতভাবে সে বললো, “তুমি কি দেখেছো তার মাসিক হয়েছে? আর তোমাকেই বা সে বলতে গেলো কেন? অফিসে অন্য মেয়েরাও তো ছিলো। অফিস চালাতে গেলে একটা ডিসিপ্লিন মানতে হয়। সেটা কিন্তু সিনিয়র হলেও তোমারও মানা উচিত সুবীর।” তখন মনে হচ্ছিলো আমার উল্টোদিকে বসে আছে একটা অশিক্ষিত জানোয়ার, যে কিনা কোনো শ্রদ্ধেয় মহিলার গর্ভেই জন্ম নিয়েছে। হায় ঈশ্বর। আমি এই কথা শুনে এডিটরের মুখের ওপর রাগত ভাবেই জানালাম, “এই নিয়ে যদি আর একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলো তো, আমি এক্ষুনি তোমার চাকরি ছেড়ে দিতে তৈরি।” আমার এহেন একরোখা স্পষ্ট উত্তরে খানিকটা বাধ্য হয়েই সে তখনকার মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো।
ভাবতে পারেন, ডিজিটাল যুগের মিডিয়া হাউসের এহেন হালহকিকৎ? এই মিডিয়া হাউস থেকে কতোই না অন্যের সমালোচনায় মুখর হয়ে প্রচারিত হয় নানা সংবাদ। কতোই না নীতির কথা প্রচারিত হয় অহরহ। অথচ এখানকারই এক নারীকর্মী প্রকৃতির নিয়মেই আচমকা ঋতুমতী। আর তাকেই উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ দিচ্ছে তারই এডিটর। তার আদৌ মাসিক হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে জানতে চাইছে, আমি তার মাসিক অবস্থা দেখেছি কি না? এই পশুসুলভ আচরণ যাঁরা করেন, ভাবি তাঁরা আদৌ কি মানুষ? আর কতোদিন এভাবে রজঃশীলা মেয়েরা সামাজিক পর্যায়ে নানা হেনস্থার শিকার হবেন? ভাবতেও লজ্জা হয়। এহেন পুরুষতান্ত্রিক অজ্ঞ অসভ্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন সবাই। আমরাও হই। ঋতুপ্রক্রিয়া মেয়েদের শরীরের ক্ষেত্রে একটা স্বাভাবিক অবস্থা। এই নিয়ে এতো সমালোচনা, এতো টিপ্পনী, এতো গালিগালাজ, এতো ছোট করা আজো মেয়েদের সহ্য করতে হয় কেন? তবু মন্দের ভাল, সম্প্রতি মুম্বাইয়ের দু’টি সংস্থা নারীকর্মীদের ঋতুকালীন সবেতন ছুটি ঘোষণা করেছে। এই দৃষ্টান্ত বাধ্যতামূলকভাবে সারাদেশে চালু হোক। সরকারও এই নজির স্থাপন করুক। যেখানে নারী কর্মীরা রয়েছেন, সেই কর্মস্থলে আবশ্যিকভাবে স্যানিটারি প্যাড স্টকে রাখারও ব্যবস্থা থাকুক। নয়তো সেদিনের মতো আমার ওই বোনের উদ্দেশ্যে কুকথার স্বেচ্ছাচারিতা সগর্বে চালিয়ে যাবেই দুই পা-ওয়ালা জন্তুর দল। চুলকানি পার্টিরা শরমহীন প্রশ্ন তুলতেই পারেন। এর সঙ্গে স্বাধীনতার ৭৩তম দিবস অতিক্রান্ত হওয়ার কী সম্পর্ক? কী বলি বলুন তো? সোস্যাল মিডিয়ার পেজ খুললেই কতোই না বিজ্ঞের সচেতনতার পোস্ট। হাজারে হাজারে। সঙ্গে কাতারে কাতারে লাইক ও কমেন্ট। ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতে আমরা কতোই না আধুনিকতা মনস্ক। আমরা কতোই না সমঝদার। আর ব্যবহারিক জীবনে, অফিসে পাশে বসা ঋতুমতী সহকর্মী কখন যে ‘মাগী’ হয়ে যাবে, তা ভাবলেই গা রিরি করে ওঠে। আজো কলকাতার বুকে মিনিবাসে মাসিক হওয়া যুবতীকে প্রকাশ্যে টিপ্পনী শুনতে হয়। অথচ সোস্যাল মিডিয়ার কোনো অতিবিপ্লবী শান্ত বিনয়ীর লেবেলে মুখ ঢেকে কিন্তু নীরব থেকে যান। সব নিজের চোখে দেখেও। তখনই চুলকানিওয়ালা ষাঁড় বুক টুকে বলে, “আরে দম হ্যায় তো আও না?” স্বাধীনতার ৭৩তম দিবস অতিক্রান্ত। আর মাত্র দুবছর অপেক্ষা। সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে ৭৫তম দিবস থেকে শুরু হবে আরো এক নতুন ভারতের বিজয়উৎসব। কী যেন কথাটা? ৭৫তম দিবসের নবতম ভারতের নতুন সূর্য আহŸানের প্রস্তুতি? আচ্ছা, এই শিক্ষিত বা অশিক্ষিত চুলাকানিযুক্ত বাহুবলীরা সেদিনও কি ফাজিল হাসি হেসে বলতে পারবে, “দম হ্যায় মেরা।” আরো একটা প্রশ্ন, সেদিনও কি ঋতুমতী মেয়েরা রাস্তায়, অফিসে কিংবা নিজের ঘরে ‘মাগী’ বনে যাবেন না তো?




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]