আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়ি নাকি নারীবন্দনা?

আমাদের নতুন সময় : 03/09/2019

মরিয়ম সুলতানা : স¤প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ বিষয়ক একটা লেখা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ তিনি তার সেই লেখার মধ্য দিয়ে নিসংকোচে পুরুষতন্ত্রের গলায় বরমাল্য পরিয়েছেন। বর্ণবাদ কিংবা লিঙ্গবৈষম্যের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তার লেখাতে এটা প্রকাশ্য দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার যে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই বঙ্গদেশের পুরুষদের চোখে নারী স্রেফ এক ভোগ্যবস্তু বৈ ভিন্ন কিছু নয়। তিনি তার সেই বহুল বিতর্কিত ‘শাড়ি’ রচনায় লিখেছেন- ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল। আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ বাঙালি মেয়েকে শাড়ি ছাড়া আর হয়তো কিছুতেই মানায় না। শাড়ি সুকুমার ও নমনীয় শরীরের জন্যই কেবল সত্যিকার অর্থে মধুর। তবে মাঝে মাঝে এ দেশেও যে এক-আধজন সুন্দর মুখের দেখা পাওয়া যায় না, তাও নয়। তবে একটিমাত্র কারণেই কেবল তা হতে পারে; যদি তারা তাদের কমনীয় শাড়িগুলোকে নান্দনিক বা সুরুচিসম্মতভাবে পরতে পারে। বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা : আমার ধারণা ‘উচ্চতা’। দৈহিক সৌন্দর্য ছেলেদের বড় ব্যাপার নয় বলে এ নিয়েও তারা কোনোমতে পার পেয়ে যায়। আমার ধারণা, একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪-এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। শাড়ি একটা রহস্যময় পোশাক। নারী দেহকে কতোটা প্রদর্শন করলে আর কতোটা অপ্রকাশিত রাখলে তা শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে, তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে। সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট কি এর সমকক্ষ? শেষের গুলো তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল। শাড়ির মধ্যে আছে এই দুইয়ের মিলিত জাদু। এ সৌন্দর্যের লালসাকেও বাদ দেয় না আবার আলোয়-ছায়ায়, মেঘে-রৌদ্রে শরীরকে যেন স্বপ্নরাজ্য বানিয়ে দেয়। তাদের শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে শাড়ি এই দুর্লভ কাজটি করে। শাড়িও তেমনি নারীর শরীরে সৌন্দর্যের প্রতিটি ঢেউ আর সরণিকে আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করে আঁচলের কাছে এসে একঝাঁক সাদা পায়রার মতো নীল আকাশে উড়তে থাকে। যেকোনো অসমতাকে আড়ালে রেখে মানসম্মত দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়ানোর পথ একটাইÑইংরেজিতে যাকে বলে মেকআপ, যার গভীরতর মানে মেকআপ দ্য লস’।
এই লেখার পরতে পরতে রয়েছে এরকম আরও অসংখ্য বাক্য যেগুলো একজন সাধারণ এবং সচেতন পাঠক হিসেবে আমাকে, আমাদেরকে আহত করে। এই অতি আপত্তিকর লেখা যে তার মতো সর্বজন গৃহীত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমÐলে খ্যাত একজন মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত; এ যেন বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। এ লেখা আমাদের সেই চিরচেনা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং নতুন করে এক কট্টরপন্থী রক্ষণশীল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্ম দেয়। আমি হলফ করে বলতে পারি যে, পোশাক হিসেবে মোটামুটি সব বাঙালি নারীর কাছে আজও শাড়ি-ই হলো প্রথম পছন্দ। তিনি তার লেখায় বাঙালি নারীর সেই শাড়ির বন্দনা-ই করেছেন, এ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু শাড়ি বন্দনা করতে গিয়ে যেভাবে তিনি নারী বন্দনা করেছেন, তা ছিলো আপত্তিকর। শাড়িকে মহিমান্বিত রূপে ফুটিয়ে তোলার জন্য যেসব অসম্ভব সুন্দর কারুকার্যখচিত উপমা তিনি ব্যবহার করেছেন, তার এ লেখায় তা সার্থকতা পায়নি। বরং এগুলোই তার চিন্তার দীনতা, হীনতা, কদর্যতা এবং সংকীর্ণতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন- তিনি তার লেখার শুরুটাই করেছেন এভাবে, ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক’। অর্থাৎ শাড়ীর মাঝে তিনি সর্বপ্রথম আবেদনটাই খুঁজে পান। তবে সুযোগ পেলে তার কাছে আমি বিনীতভাবে অতি অবশ্যই জানতে চাইতাম, শালীনতার মানদÐ ঠিক কী? তিনি শাড়ির কথা বলতে গিয়ে নারীর শরীর এবং সৌন্দর্যের যে রগরগে চুলচেরা বর্ণনা দিয়েছেন, তা আমায় হতভম্ব করে দেয়। তার ওই লেখা পড়ে আমার সর্বপ্রথম যে কথাটা মনে এসেছিলো তা হলো- ‘মাথার ভেতরটা নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই…’। নারী মানে তো শাড়িবন্দী কোনো নির্জীব পুতুল না, তবে কেন এই একপেশে সৌন্দর্য বর্ণনা?
তিনি বাঙালি নারী এবং শাড়িকে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত করতে গিয়ে অন্যান্য দেশের নারী এবং তাদের পোশাককে (সংস্কৃতি) হেয় করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট কি এর সমকক্ষ? শেষেরগুলো তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল’। দেশীয় পোশাক তথা সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে উদ্বুদ্ধ করবেন, ভালো কথা। তাই বলে এভাবে? তিনি সুস্পষ্টভাবে নারীর দৈহিক সৌন্দর্যের অপরিহার্যতার কথা বলেছেন। এভাবে, ‘দৈহিক সৌন্দর্য ছেলেদের বড় ব্যাপার নয় বলে এ নিয়েও তারা কোনোমতে পার পেয়ে যায়’। তিনি সুন্দরী হওয়ার শর্ত হিসেবে নারীর উচ্চতাকেও মূখ্য মনে করেন। তাইতো তিনি হাই হিলের গোপন রহস্যে অভিভ‚ত হন এবং শাড়িকে আখ্যা দেন ‘মেকআপ দ্য লস’ হিসেবে। সর্বোপরি, ‘নারী দেহকে কতোটা প্রদর্শন করলে আর কতোটা অপ্রকাশিত রাখলে তা শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে, তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে’। এর মধ্য দিয়ে কি তিনি এটাই বলতে চান নি যে নারী শাড়ি পরে প্রদর্শনের জন্য? শাড়ির মাঝ দিয়ে দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে ওঠাই কি নারীর ধ্যান-জ্ঞান?
বঙ্গদেশে কিছু কথা প্রচলিত আছে। ‘মেয়েদের লম্বা না হলেও চলে, কিন্তু ছেলেদের অতি অবশ্যই লম্বা হওয়া চাই’। এদিকে আবার ‘ছেলেদের গায়ের রঙ ময়লা হলেও সমস্যা নাই, কিন্তু মেয়েদের গায়ে রঙ যদি ময়লা হয় তবে আর রক্ষা নাই’। এ সমাজের অধিকাংশ মানুষ আজও মনে করে সুশ্রী মেয়ে হওয়ার জন্য পটলচেরা চোখ, টিকালো নাক, রাজহংসী গ্রীবা, ভরাট কোমর, ভারি নিতম্ব, মেঘের মতন ঢেউ খেলানো কালো চুল, চিরল দাঁত প্রভৃতির জুড়ি নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতন অনুসরণীয় ব্যক্তিও যে সেই চিরাচরিত তালিকায় নাম লেখাবেন, ভাবিনি। অথচ আমরা, বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবন্ত বুদ্ধিজীবী হিসেবে নির্দ্বিধায় যাদের নাম শ্রদ্ধাবনত চিত্তে উচ্চারণ করতাম, তাদের মাঝে ‘আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ’ নামটার অবস্থান ছিলো একেবারে প্রথমদিককার সারিতে। যিনি স্যার না হয়েও আমাদের সকলের কাছে ‘স্যার’ হয়ে উঠেছিলেন। যিনি আমার মতো আরও অনেকের কাছে ছিলেন সাক্ষাৎ এক আলোকবর্তিকা, যেই আলোয় আমরাও আলোকিত হতে চাইতাম। ঘরে ঘরে নিরলসভাবে আলো পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টার জন্য হলেও আমরা তাকে সত্যিকারের ‘আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর’ হিসেবে এতকাল ধরে পূজো করে এসেছি, অর্ঘ্য দান করেছি। কিন্তু আমরা বোধহয় বিস্মৃত হতে বসেছিলাম আলো’র বিপরীতেই রয়েছে অন্ধকার। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]