• প্রচ্ছদ » » আনিসুজ্জামান স্যার তাঁর বই ‘বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে’-এ লেখেন, ‘নারীদের আমরা এখনো মেয়েমানুষ বলে দেখি, সবসময়ে মানুষ বলে দেখতে পারি না’


আনিসুজ্জামান স্যার তাঁর বই ‘বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে’-এ লেখেন, ‘নারীদের আমরা এখনো মেয়েমানুষ বলে দেখি, সবসময়ে মানুষ বলে দেখতে পারি না’

আমাদের নতুন সময় : 09/09/2019

ফারহানা আজিম শিউলি

সাত সেপ্টেম্বর … লাইব্রেরিতে গিয়ে একটা বইয়ে চোখ আটকে গেলো : আনিসুজ্জামান স্যারের লেখা ‘বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে।’ সম্প্রতি আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ বিষয়ক লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এর প্রতিক্রিয়াই হয়তো এই বইয়ের দিকে চোখ যেতে মনসতাত্ত্বিকভাবে প্ররোচিত করেছে।… বইটা বেশ ছোট কিন্তু ঠাসা বুনোট। বাঙালি নারীর উপস্থাপনে, পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে উনবিংশ শতকের সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা ঠাঁই পেয়েছে এতে। আজ পড়ে ফেললাম এবং এই শাড়ির ডামাডোলে, আর কিছু না হোক, অন্তত এইটুকু লাভ হলো। কিছুটা জানাও হলো।…‘আমাদের দেশে হয়তো পিতৃতান্ত্রিক অন্য সমাজেও নারী সম্পর্কে দ্বৈত মনোভাব দেখা যায়। ইতিহাসবিদ ব্যাশাম বলেছেন যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে নারীকে দেখা হতো একাধারে দেবী ও ক্রীতদাসীরূপে, সন্তনারী গণিকা হিসেবে। এ কথার সত্যতা আমরা অনুভব করি যখন দেখি যে, শাস্ত্রীয় নির্দেশে সামাজিক আচরণে এবং সাহিত্যিক রূপায়ণে নারীর বিপরীতধর্মী চিত্র এবং নারী সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী মনোভাবের পরিচয় বিধৃত রয়েছে। পরস্পরবিরোধী হলেও দুই রূপই সামাজিক সত্য বহন করে।
‘রবীন্দ্রনাথ মনুসংহিতার উদ্ধৃতি দিলেন’ তুলাদ-ের একদিকে যম, বায়ু, মৃত্যু, পাতাল, বাড়বানল, ক্ষুরধার, বিষ, সর্প ও বহ্নি এবং অপরদিকে স্ত্রীজাতির সংস্থাপন করিলে স্ত্রীজাতি কখনোই ভয়ানকত্বে উহাদের অপেক্ষা ন্যূন হইবে না’। তারপর রবীন্দ্রনাথের ছোট মন্তব্য যে, ‘এ সকল শ্লোকের দ্বারা স্ত্রীলোকের সম্মান কিছুমাত্র প্রকাশ পায় না’ এবং ‘স্ত্রীলোকের চরিত্র সম্বন্ধে যাহাদের এরূপ বিশ্বাস তাহারা স্ত্রীলোককে যথার্থ সম্মান করিতে অক্ষম’। রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন, ‘যে দেশে বহুবিবাহ প্রচলিত, সেখানে দাম্পত্য সম্পর্কের একীকরণ হয় না’ : ‘বিবাহের যতো কিছু আদর্শের উচ্চতা সে কেবল পতœীর বেলায়, পতিকে সেই আদর্শ স্পর্শ করিতেছে না’। তিনি বলেছেন, ‘স্ত্রী-পুরুষে শিক্ষার ঐক্য নাই, ধর্মব্রত-পালনের ঐক্য নাই, কেবলমাত্র জাতিকুলের ঐক্য আছে’। মনুর বচন ‘স্ত্রীগণ অপত্যের উৎপাদন, অপত্যের পালন ও প্রত্যহ-লোকযাত্রার প্রত্যক্ষ নিদান হয়েন’ উদ্ধৃত করে রবীন্দ্রনাথ দেখাচ্ছেন যে, ‘হিন্দু বিবাহের আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার দাবি টেকে না, সংসার ধর্মের প্রতি আসক্তিই এতে প্রবল এবং এর ফলেই বহুবিবাহ প্রচলিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন যে, ‘হিন্দু বিবাহে স্বামী-স্ত্রী সমকক্ষ নয়, তাই স্ত্রী অসতী হলে তাকে ত্যাগ করা যায়, কিন্তু ব্যভিচারী স্বামীকে ত্যাগ করার কোনো উপায় স্ত্রীর নেই।’ …‘যে মূঢ় দেশে যুক্তির চেয়ে শাস্ত্র বড়, প্রেরণার চাইতে আদেশ বড়, সেখানে শাস্ত্রবিচার না করে উপায় নেই। বিদ্যাসাগর আক্ষেপ করে বলেছেন ‘হা ধর্ম! তোমার মর্ম বোঝা ভার! কিসে তোমার রক্ষা হয় আর কিসে তোমার লোপ হয়, তা তুমিই জানো’!… বিদ্যাসাগর পুরুষদের তিরস্কার করেছেন আর মেয়েদের জন্য করেছেন আক্ষেপ : ‘তোমরা মনে করো প্রতিবিয়োগ হইলেই স্ত্রীজাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়, দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয় না, যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া বোধ হয় না, দুর্জয় রিপুবর্গ এককালে নির্মূল হইয়া যায়। কিন্তু তোমাদের এই সিদ্ধান্ত যে নিতান্ত ভ্রান্তিমূলক, পদে পদে তাহার উদাহরণ প্রাপ্ত হইতেছ’। হায় কী পরিতাপের বিষয়! যে দেশের পুরুষ জাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায়-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদসদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিক রক্ষাই প্রধান কর্ম ও পরম ধর্ম, আর যেন সেই দেশে হতভাগা অবলা জাতি জন্ম গ্রহণ না করে। হা অবলাগণ! তোমরা কী পাপে ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ করো, বলিতে পারি না। আনিসুজ্জামান বইটা শেষ করছেন এই বলে ‘বিশ শতকে আমরা অনেক সুবিধা পেয়েছি, তবে ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে দিতে উন্মুখ ব্যক্তির কিছু অভাব নেই। নারীদের আমরা এখনো মেয়েমানুষ বলে দেখি, সবসময়ে মানুষ বলে দেখতে পারি না, উনিশ শতকেই নারীকে মানুষ বলে দেখা ও ভাবার সূচনা হয়।’… ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]