• প্রচ্ছদ » » রুমিন ফারহানা আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন?


রুমিন ফারহানা আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন?

আমাদের নতুন সময় : 10/09/2019

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপির নারী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর দশ কাঠা জমির প্লট বরাদ্দ চেয়ে একটি আবেদন করে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছেন। তার আবেদনপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। সংবাদপত্রেও এনিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। রুমিন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আছেন, তিনি সম্ভবত আলোচনায় থাকতে পছন্দও করেন। তবে প্লট চেয়ে আবেদন করে আলোচনায় এসে তিনি কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। সেজন্যই আবেদনপত্রটি প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন। তবে তাকে ঘায়েল করার জন্য এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করা থেকে তার বিরোধীরা সহজে বিরত না-ও হতে পারে। রুমিন ফারহানা বিএনপি করেন। বিএনপির পক্ষে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার শব্দচয়ন, বলার আক্রমণাত্মক ভঙ্গি প্রতিপক্ষের জন্য সুখপ্রদ হয় না। তার হুল ফোটানো বক্তব্য অবশ্য অনেককে আকৃষ্টও করে। আবার এতে তাকে অপছন্দ করা মানুষের সংখ্যাও বাড়ে।
রুমিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দলটির সুসময়ে নয়, দুঃসময়েই। বিএনপি দ্রুত ক্ষমতায় যাবে, ক্ষমতায় গেলে তার সুবিধা হবে – এমনটা ভেবে হয়তো তিনি বিএনপিতে যোগ দেননি। বিএনপি যে রাজনীতি ধারণ করে—আওয়ামী লীগবিরোধিতা, ভারতবিরোধিতা, একটু সাম্প্রদায়িকতা, পাকিস্তানের দিকে মুখ রেখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা-ইত্যাদির প্রতি সমর্থন এবং অনুরাগ থেকেই রুমিন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তিনি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। তার বাবা অলি আহাদ, ভাষা সংগ্রামী এবং খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গেও তার সখ্য ছিলো তবে অলি আহাদ আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত করে গেছেন। রুমিন বাবার রাজনীতির ধারাবাহিকতায়ই বিএনপিতে শরিক হয়েছেন।

রুমিন বিএনপির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এককভাবেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে সরকারি হেনস্থার ভয়ে যখন বিএনপির কেউ অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, তখন রুমিন সাহসের সঙ্গেই অংশ নিয়েছেন এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি এজন্য দলের মধ্যে মূল্যায়িত হয়েছেন। রুমিন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপসম্পাদক। সর্বশেষ জাতীয় সংসদের নারী আসনে দলের মনোনয়ন পেয়ে তিনি আবার দলের মধ্যে এবং দলের বাইরেও আলোচনায় আসেন । এই পদ পাওয়ার প্রত্যাশী আরো অনেকে ছিলেন। কাজেই যাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি তারা রুমিনকে ভালো ভালো চোখে দেখবেন না- এটাই স্বাভাবিক। এক দল করলেই সে দলের সবাই সবাইকে পছন্দ করবেন, ব্যাপারটি মোটেও তেমন নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ-কোন্দল কোনো নতুন বিষয় নয়। বড় দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ রেষারেষি বেশি। বিএনপির মধ্যেও ভাগ-বিভক্তি-গ্রুপিং আছে। রুমিনকে নিয়েও বিএনপিতে স্বস্তি-অস্বস্তি দুটোই আছে। তার কারণে যার আসন টলে গেছে, ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে, তিনি রুমিনের প্রতি রুষ্ট। আবার রুমিন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে পারলে তার দলের লোকেরা খুশি হন।
রুমিন সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে যোগ দিয়ে সরকারকে অবৈধ বলে যে ঝাঁঝালো বক্তৃতা দিয়েছেন , তা অনেকেরই ভালো লাগেনি। কারণ তিনি তো এই ‘অবৈধ’ সংসদেরই সদস্য হয়েছেন। তার বক্তৃতা এবং নৈতিক অবস্থান যে এক নয়, এটা সবার কাছেই স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সরকারকে বিব্রত করতে চান, বেকায়দায় ফেলতে চান, ভালো কথা। বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে তিনি তা করতেই পারেন। কিন্তু থুতু এমনভাবে ছিটানো উচিত, যাতে তা নিজের গায়ে এসে না লাগে। সংসদকে ‘অবৈধ’ বলে সেই সংসদের সংরক্ষিত আসনে সদস্য হওয়া, সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা মোটেও শোভন নয়। তারপরও এটা বলতেই হবে যে, রুমিন সংসদে যাওয়ায় বেশি লাভবান হয়েছে সরকার। কারণ সংসদ নিয়ে সরকার সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারের কিছু বিরোধী কণ্ঠস্বর দরকার। রুমিন এই অভাব পূরণে কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। তিনি সংসদে যোগ দেওয়ার পর সংসদ যে অনেকটাই ‘ভাইব্রেন্ট’ হয়েছে- সেটা অস্বীকার করা যাবে না।
তবে প্লট চেয়ে আবেদন করে রুমিন নিজের অবস্থান আবার কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছেন। ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ পেলে তিনি ‘চির কৃতজ্ঞ’ থাকার কথা বলে তিনি তার বিরোধীদের হাতে একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। আবেদনপত্রে তিনি ভুল তথ্যও দিয়েছেন। ঢাকা শহরে তার প্লট/ ফ্ল্যাট নেই বললেও প্রকৃতপক্ষে তা আছে। তার আবেদনপত্র কীভাবে মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে গণমাধ্যমে আসে, সে প্রশ্ন থেকে আবারও নীতি-নৈতিকতার বিষয়টিই সামনে আসে। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসেবে তার কাছে যে ধরনের স্বচ্ছতা মানুষ আশা করে তিনি যে তার থেকে দূরে, তিনিও যে রাজনীতির গতানুগতিক সুবিধাবাদী ধারার বাইরে নন, প্লট কাহিনি তাই প্রমাণ করলো। তবে এরমধ্য দিয়ে বিএনপির ‘ভেতর’টা আবার দেখার সুযোগ হলো।
রুমিনের প্লট ইস্যুতে বিএনপির ভেতরের সংকটটাও বাইরে এসেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রকাশ্যেই রুমিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিবৃতি দিয়ে রুমিনকে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু দলের কেউ কেউ রুমিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে ইন্ধন যোগাচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। এমনকি রুমিনের আবেদনপত্র ‘ফাঁস’ হওয়ার পেছনেও বিএনপিরই কারো না কারো হাত আছে বলেও বিএনপির মধ্যেই প্রচার আছে। বিএনপির মধ্যম সারির নেতাদের অনেকেই রুমিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। সরকারি দলের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে বিএনপির যেসব নেতা মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন তারাও রুমিনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধ আন্দোলনের কথা বলে। কিন্তু নেতা-কর্মীরা মাঠে নামেন না। কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বা আপস করে চলেন বলেও জনশ্রুতি আছে। রুমিন দীর্ঘ দিন ধরে টক শোতে এবং সম্প্রতি সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার পরও বিএনপি নেতৃত্ব প্লট ইস্যুতে রুমিনকে একঘরে করে মূলত সরকারপক্ষকেই শক্তি যুগিয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে ।
রুমিন প্লটের জন্য যে আবেদন করেছিলেন, তা তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বিষয়টির এখানেই মধুরেণ সমাপয়েত হওয়া উচিত। রুমিন যেন এ ব্যাপারে কোনো ধরনের হয়রানি-হেনস্থার শিকার না হন, তা সব পক্ষকেই নিশ্চিত করতে হবে। দেশে অনেক বড় বড় অন্যায়-অপরাধ-অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য যেন কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করা না হয়। মওকা বিরোধী এই কণ্ঠটি সরকার স্তব্ধ করতে চাইলে তা পারবে। তবে সেটা করা ঠিক হবে না। দেশের মধ্যে কবরের নীরবতা নিশ্চিত করাটা ভালো লক্ষণ নয়। রুমিনকেও তার রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও ভাবতে হবে। বাংলা ভাষায় একটি বাক্য আছে : ‘উচিত কথায় বন্ধু ব্যাজার’। সব উচিত কথা সব সময় বলা যায় না, বলা ঠিকও না। রুমিন আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে সরকারি দলে নির্বান্ধব হয়েছেন। এটা হওয়ারই কথা। কিন্তু নিজের দলেও কেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারছেন না, সেটা তাকে বুঝতে হবে। নিজের ঘাটতিটা নিজেকেই খুঁজে বের করে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল ঠিক করতে হবে। বিএনপির দলটাও বা কেমন সেটা নিয়েও তার ভেবে দেখার সময় এসেছে বলে তার শুভাকাঙ্খীরা মনে করেন।
লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]