• প্রচ্ছদ » » সরকারি কেনাকাটায় ‘গলাকাটা’ এই জল্লাদ কারা?


সরকারি কেনাকাটায় ‘গলাকাটা’ এই জল্লাদ কারা?

আমাদের নতুন সময় : 14/09/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী  : সম্প্রতি সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী ক্রয়ের মূল্য নির্ধারণে অবিশ্বাস্য রকম দুর্নীতির বিষয়ে দেশব্যাপী সমালোচনা চলছে। গণমাধ্যমে ওইসব দরদাম নিয়ে যেসব বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছে তা শুনে সাধারণ মানুষই শুধু নয় দেশের নীতি নির্ধারক থেকে সমাজের উচ্চবৃত্তের অনেকেই বেশ ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছে। রূপপুর প্রকল্পের বালিশ কেনার মূল্য, হাসপাতালের পর্দা ক্রয়, খাগড়াছড়িতে পুলিশ ব্যাটালিয়নের ঘর নির্মাণের টেউটিন, ফরিদপুরের হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি কেনাকাটায় কর্তৃপক্ষ যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গলাকাটা ছাড়া আর কিছু বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে। এসব কেনাকাটায় দরপত্র দেয়ার আগে প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তারা পণ্যের বাজারদাম যাচাই-বাচাই করেই সরকারি বিধি মোতাবেক প্রাক্কলিত মূল্য দরদাতাদের জন্য নির্ধারণ করে থাকে। কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে সব ধাপ অতিক্রম করেই তারপর দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। দরপত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে থাকে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সর্বনি¤œ দরদাতাই কর্মাদেশ পেয়ে থাকেন। তাহলে বোঝা যাচ্ছে একটি পণ্যের দাম সম্পর্কে যাচাই-বাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তির চোখ এতে ফেলতে হয়। তারা অনুমোদন দেয়ার পরই দরপত্র বিজ্ঞপ্তি কার্যাদেশ প্রাপ্তি ঘটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যে

কিন্তু যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের উল্লেখিত পণ্য ক্রয়ের কার্যাদেশ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সেই পণ্যসমূহের দাম বাংলাদেশের বাজারে তো নয়ই বিশ্বের কোনো ধনী দেশের বাজারেও এতো বেশি দামে বিক্রির কোন সম্ভাবনা নেই। এ রকম অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে যারা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ক্রয় ও নির্মাণে যুক্ত ছিলেন তাদের আসলে মানুষ হিসেবে কতোটা যোগ্যতা থাকে সেটি এখন বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা বালিশের দাম যদি হয় ৬-৭ হাজার টাকা, একটি টিনের দাম যদি হয় এক লাখ টাকা তাহলে এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সরকারি আমলা কর্মচারীদের চোর, ডাকাত, ঘুষখোর ইত্যাদি নামেই শুধু অভিহিত করা যাবে না, তারা আসলে প্রতিষ্ঠানের গলাকাটা জল্লাদ হিসেবে আখ্যায়িত হলে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে কী? আমাদের এই সরকারি কর্মকর্তারা কি মূল্য প্রাক্কলনের আগে একবারও ভাবেননি এমন অস্বাভাবিক দামের বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে জানাজানি হয়ে যেতে পারে। তখন তারা এর কি জবাব দেবেন। তাদের চক্ষুলজ্জা বলে কিছু আছে এমন দাবি তারা করতে পারেন কী? এখন এসব দাম দরপত্র নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে, কেউ কেউ ভুল হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করছে। কিন্তু এই ভুল যদি জানাজানি না হতো তাহলে এটাকে কি ভুল বলা হতো? বোঝা যাচ্ছে আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তারা নিজেদের ‘কর্মকর্তা’ নামে পরিচয় করিয়ে একটা বিশেষ ‘মর্যাদার’ আসনে নিজেদের দেখাতে চান। খুবই ভালো কথা, কর্মকর্তা পদটি তো ছোট নয়। যারা মোটামুটি শিক্ষিত, বিবেক বিবেচনা, প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন, দেশের আইন ইত্যাদি মেনেই কর্মকর্তা পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এখানে কর্মকর্তারও অনেক ধরনের র‌্যাংক আছে। সেখানেও তো অনেক ‘উচ্চশিক্ষিত’ দীর্ঘ অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকেন। তাদের তো দেশের আইন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, নীতি নৈতিকতা, ইত্যাদি চর্চা করেই চাকরি করতে হয়। চাকরির জন্য তারা মাসিক বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বিধি মোতাবেক পান। কিন্তু সেসব বিধি মোতাবেক প্রাপ্তিতে যারা সন্তুষ্ট না, বাড়তি প্রাপ্তির জন্য প্রতিষ্ঠানের গলাকাটতে যাদের এতোটুকু বিবেক কাজ করে না তাদের প্রতিষ্ঠানের রক্ষক নাকি ভক্ষক, নাকি জল্লাদ হিসেবে অভিহিত করা হবে সেটি বোধহয় ভেবে দেখার বিষয়। আমাদের দেশে সর্বত্র একটা বিরাট সংখ্যক পদ-পদবিধারী ব্যক্তি এতোটাই নির্লজ্জ, বেহায়া, বিবেকহীন এবং অর্থপিশাচে পরিণত হচ্ছেন যে, তারা দেশটার প্রতি সামান্যতম দায়বোধ করেন না। যারা এই দেশটার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন আবার যারা সততা, নিয়মনিষ্ঠা মেনে কাজ করছেন তাদের প্রতি এদের সামান্যতম বিবেকবোধ কাজ করছে বলে মনে হয় না। সমাজের সর্বত্র টাকার পেছনে একটা বিরাট সংখ্যক মানুষের এভাবে ছোটা সত্যিই ভয়ংকর বিষয়। এসব দরপত্রের এপাশে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা, ওপাশে থাকেন কিছু দরপত্রদাতা। এই দরপত্রদাতারাও একইরকম অর্থ লোপাটে নানা ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এখানেই দেখা গেছে একই দরদাতার দুটো ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কাজ পেয়ে নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে বিরাট অঙ্কের অর্থ কাজ সম্পন্ন না করেই তুলে নিয়েছে। অর্থ তুলে নেয়ার পেছনে ওইসব সরকারি কর্মকর্তা ফাইলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দরদাতাকে অগ্রিম অর্থ তুলে নিতে সাহায্য করেছেন। নিশ্চয় তিনি বা তারা বিপুল অঙ্কের লেনদেনই ফাইলে এমন সুপারিশ লিখতে পেরেছেন। কোনো সভ্য, শিক্ষিত মানুষের কলম থেকে এমন মিথ্যাচার লেখা কীভাবে সম্ভব হয় তা আমাদের জানা নেই। আসলে এদের লেখাপড়াটি হচ্ছে লোক দেখানো, সার্টিফিকেট সর্বস্ব, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, ব্যক্তিগত লাভালাভ ইত্যাদির বাইরে দেশ, জাতি এমনকি একজন মানুষ হিসেবেও যে ন্যূনতম শিক্ষা থাকা দরকার তা তাদের আছে বলে মনে হয় না। অথচ এই মানুষদের অনেকেই সমাজে বেশ বিত্তশালী হিসেবে নানা ধরনের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠান করে থাকেন। হালাল-হারামের নানা অবস্থানও তারা দেখিয়ে থাকেন, কিন্তু উপার্জনের ক্ষেত্রে হালালের চর্চা কতোটা করেন সেটাই মস্তবড় প্রশ্ন।
আমরা আশা করবো সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত সম্পন্ন করে সঠিক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে থাকে তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। আবার যদি তদন্ত কমিটির মধ্যেও মিথ্যাচারের কোনো নমুনা পাওয়া যায় তাহলে সেই তদন্তকারীদের বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা রেখে নতুন করে তদন্ত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় (দরপত্রদাতাসহ) সবাইকেই তাদের অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। দেশে সরকারি নির্মাণ, ক্রয়-বিক্রয়, ইত্যাদি নিয়ে যেভাবে দুর্নীতি বিস্তৃত হচ্ছে তা থেকে দেশ অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সমাজ নীতিনৈতিকতার দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নিয়ে চলছে দেশ-বিদেশ সফরের নানা তুঘলুকি কা-, অর্থ লোপাট এবং মানহীন প্রকল্প বাস্তবায়ন। এটি বলতে দ্বিধা নেই বিদেশি নানা সংস্থার অর্থায়নে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের অর্থ বাংলাদেশকে সুদে আসলে দিতে হচ্ছে। কিন্তু মধ্যখানে সরকারি আমলা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যক্তি, গোষ্ঠী বিদেশ সফর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, আর্থিকভাবে সুযোগ-সুবিধা লাভ করা ইত্যাদির একটি ধারা বহু বছর থেকেই চলে আসছে। এসব প্রকল্পের সত্যিকার অর্থমূল্যের চাইতে বাড়তি সুবিধাভোগকারীরা বিরাট অংশের টাকা ব্যক্তিগত পকেটে পাওয়ার সুযোগ পায়। সরকারের উচিত হবে এসব বিষয়ে আরও রশি টেনে ধরা। অনেক প্রকল্পই শেষ পর্যন্ত আমাদের খুব বেশি লাভবান করে না, কিন্তু দেনার ভার মাথায় রেখে যায়। মধ্যখানে সুযোগ-সুবিধা লাভ করে নেয় সরকারি আমলাসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী যাদের এতো প্রকল্প বিষয়ক যোগ্যতা কাজে লাগেনি। অথচ তাড়াই প্রকল্প সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা, বিদেশ সফর করে নিয়েছেন। আমাদের দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে তখন এই বাড়তি অপচয়, দুর্নীতি, অপব্যবহার ইত্যাদি রোধ করতে পারলে আমাদের উন্নয়নের গতি অনেকগুণ বৃদ্ধি পেতোই। সরকারকে দেশের উন্নয়নে বর্তমান, দরপত্র প্রথা ও বিদেশি অর্থায়নে প্রকল্প প্রথাকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে দেশে দুর্নীতি রোধের উদ্যোগ নিতে হবে, সব দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থা করতেই হবে। তাহলেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে এতোসব জল্লাদের আবির্ভাব ঘটতে পারবে না। লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]