• প্রচ্ছদ » শেষ পাতা » রোবট প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি টিকতে পারবে?


রোবট প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প কি টিকতে পারবে?

আমাদের নতুন সময় : 16/09/2019

ফাতেমা আহমেদ : উজ্জ্বল আলোর নীচে লাইন ধরে বসানো সারি সারি সেলাই মেশিন। কাজ করছেন শত শত নারী শ্রমিক। এটা বাংলাদেশের যে কোন গার্মেন্টস কারখানার চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু দশ বছর পরের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। কেমন হবে তখন বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানা? বিবিসি বাংলা। নিউইয়র্কের শিমি
টেকনোলজি নামের এক প্রযুক্তি কোম্পানীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারাহ ক্রেসলির ভাষায়, ‘দশ বছর পর পোশাক কারখানায় খুব অল্প শ্রমিকই কাজ করবে। রোবটিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তখনো আমরা হয়তো কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখবো। কারখানা জুড়ে তখন বেশি থাকবে অনেক কম্পিউটার এবং নানা ধরণের স্বয়ংক্রিয় রোবটিক যন্ত্রপাতি। কারখানার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ডিজাইন রুম। বেশিরভাগ কর্মী কাজ করবে ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে।’ তিনি মনে করেন, অটোমেশন যেভাবে গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে পাল্টে দিয়েছে, এবার পোশাক শিল্পে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে।
সারাহ ক্রেসলি বলছেন, ৬০ থেকে ৮৮ শতাংশ শ্রমিক কাজ হারাবে অটোমেশনের কারণে। অর্থাৎ লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হবে। এটা আমার হিসেব নয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসেব।’ তার মতে, বাংলাদেশের সামনে বিপদ অনেক রকমের। প্রথমটা হচ্ছে এই অটোমেশন, যেটা ইতোমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ড, যেটা বিরাট প্রভাব ফেলছে পোশাকের ব্রান্ডগুলোর ওপর। সবশেষে আছে অটোমেশনের চূড়ান্ত ধাপে পোশাক শিল্পের ‘রিশোরিং’ বা ‘নিয়ারশোরিং।’ অর্থাৎ যেখান থেকে এই পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসেছে, এই শিল্পের সেখানেই ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি।

দেশের গার্মেন্টস খাতের সফল উদ্যোক্তা বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, পোশাক শিল্প খাতে অটোমেশনের যে ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে তিনি বিপদ হিসেবে দেখতে রাজী নন।’ তবে অটোমেশন যে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, সেটা স্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘একটা মাঝারি আকারের কারখানার কাটিং সেকশনে দেড়শো-দুশো লোক লাগতো। সেখানে অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, শ্রমিক লাগে দশ থেকে বারো জন। আগামী দশ বছরে এই শিল্পে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।’ ফজলুল হক বলছেন, বাংলাদেশে অটোমেশনের কারণে যত লোক কাজ হারাচ্ছেন, তাদের আবার এই শিল্পেই কোন না কোনভাবে কর্মসংস্থান হয়ে যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে এখনো এই শিল্পের আকার বাড়ছে।’
তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘দেশে এখন যত বড় ফ্যাক্টরি আছে, বিশেষ করে এ এবং বি ক্যাটাগরির ফ্যাক্টরিগুলোতে অনেক নতুন মেশিন আনা হয়েছে। এসব মেশিনে এমন বহু কাজ হচ্ছে, যেগুলো আগে শ্রমিকদের করতে হতো। যেমন- সুতা কাটা, আয়রন করা, কাটিং, ড্রয়িং, লে-আউট, লোডিং-আনলোডিং। এখন বিভিন্ন ধরণের মেশিন চলে আসছে। তাই আগের মতো শ্রমিকের দরকার হচ্ছে না।’
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে এই পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে তিন-চার বছর আগে থেকেই। এই খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ফজলুল হক জানালেন, তিনি নিজের কারখানাতেও এরকম প্রযুক্তি চালু করেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের প্রতিটি কারখানায় বেশিরভাগ মেশিনে দুজন করে লোক লাগতো। গত তিন চার বছরে পর্যায়ক্রমে হেল্পারের পদ খালি করে জায়গা দখল করেছে মেশিন। ’
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে কী ধরণের মেশিন বা যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে, তা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। প্রতিষ্ঠানটির ফেলো অর্থনীতিবিদ ড: মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ‘একটা পরিবর্তন যে শুরু হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। আগে যে মেশিন আমদানি করা হতো, এখন তারচেয়ে অনেক ভিন্ন ধরনের মেশিন আনা হচ্ছে। অনেকে রোবটও আনছেন। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।’ তার মতে, ‘এর একটা কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসলে তখন বিনা শুল্কের সুবিধা পাবে না। তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। তখন কারখানা মালিকরা প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকবেন।’ ড: মুস্তাফিজুর মনে করেন, ‘গত কয়েক দশকে দেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে পোশাক শিল্পে। এখন সেটি স্তিমিত হয়ে আসছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ছাঁটাই শুরু হয়েছে। বড় ধাক্কাটা নারী কর্মীদের ওপরই পড়ছে। ’
আশির দশকের মাঝামাঝিতে শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে এ ধরণের শিল্প যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিলো তখন এর নাম দেয়া হয়েছিলো অফশোরিং। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসি কনসালটেন্সি এক রিপোর্টে বলছে, অটোমেশনের ফলে এসব শিল্প এখন অনশোরিং, অর্থাৎ আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া, কিংবা নিয়ারশোরিং, অর্থাৎ কাছাকাছি কোন দেশে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ফজলুল হক এরকম আশঙ্কা দেখছেন না। যেটা বলা হচ্ছে রোবট এসে সব দখল করে নেবে এবং এর ফলে এই শিল্প আর বাংলাদেশে থাকবে না, ইউরোপ-আমেরিকাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু এই কথার মধ্যে আমি একটা ফাঁক দেখছি। মানুষের জায়গায় রোবট বসালে তার খরচ কী দাঁড়াবে এবং সেই বিনিয়োগ সবাই করতে পারবে কীনা বা এই রোবটের অপারেশনাল খরচ কী হবে- এগুলোর কোন পরিস্কার জবাব কিন্তু এখনো আমি কোন স্টাডিতে দেখিনি।’ এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই শিল্পকে ধরে রাখার সুযোগ আমাদের এখনো আছে।’ সম্পাদনা : ইকবাল খান




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]