• প্রচ্ছদ » » যারা মৌলিক গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের পক্ষে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব


যারা মৌলিক গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের পক্ষে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব

আমাদের নতুন সময় : 19/09/2019

সুজিত মোস্তফা : বাংলাদেশে আমরা যারা বেসিক গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত অর্থাৎ যারা আমরা মূল বাংলা গান, রবীন্দ্র, নজরুল, লোক বা উচ্চাঙ্গ সংগীত নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, তাদের পক্ষে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব। কারণ এখানে প্রকৃত গুণীর মূল্যায়ন হয় কালেভদ্রে। আর অবকাঠামো এতোই দুর্বল যে একজন সংগীত শিল্পীকে তার ব্যক্তিগত চর্চা বাদ দিয়ে বা কম্প্রোমাইজ করে শুধু জীবনধারণ ও সংসার যাপনের জন্য সংগীত শিক্ষকের ভ‚মিকায় বা অন্য কোনো চাকরিতে যুক্ত হতে হয়। সময় ব্যয় হয়, কণ্ঠ জৌলুস হারায়, অসামান্য সম্ভাবনাময় অজস্র প্রতিভার অকাল মৃত্যু হয়। শুধু বেতার, সরকারি টিভি চ্যানেল এবং শিল্পকলা একাডেমির পরিকল্পনায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলে এবং অর্থ, তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিছু ডায়নামিক উদ্যোগ নিলে অবস্থানের একটা বিশাল পরিবর্তন সম্ভব। কথা হচ্ছে আমিতো মুক্ত মানুষ। আমার বক্তব্যে কোনো ফল হবে কি? আমিতো যখনই সুযোগ পাই, সচিব, মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সবার কাছেই বিষয়গুলো তুলে ধরছি। তবে কি কেউ কো-অর্ডিনেশনের কোনো চেষ্টা করছেন না? কেন করছেন না? এদেশের মন্ত্রী, সচিব, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তো আমাদেরই ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সুহৃদ সবাই কর্মরত। আমি সম্প্রতি বিটিভির মাননীয় ডিজি হারুন ভাইয়ের সঙ্গে আরও অনেক গুণী সংস্কৃতি কর্মীসহ একটা মতবিনিময় সভায় বসেছিলাম। ক’দিন পরে বাংলাদেশ বেতারের মাননীয় ডিজি আমার বাল্যবন্ধু নারায়ণ চন্দ্র শীলের সঙ্গেও বেতারের কর্মকর্তাদের নিয়ে বসেছিলাম। আমি বিভিন্ন সময় মাননীয় তথ্য এবং সংস্কৃতি মন্ত্রীদেরও আমার কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছি।
বিটিভিতে এই মুহূর্তে যে পরিমাণ তালিকাভুক্ত সংগীত শিল্পী আছেন তাদের সঠিক ফ্রিকোয়েন্সি মেইনটেইন করে নিয়মিত অনুষ্ঠান দিতে গেলে একজন শিল্পী গড়ে সাড়ে আট বছরে পাবেন একটি প্রোগ্রাম। দীর্ঘদিন অডিশন হয় না। নতুন শিল্পীদের বিশাল আবেদন তালিকা পড়ে আছে। সেখান থেকে নতুন অন্তর্ভুক্তি হলে কি অবস্থা হবে, ভাবা যায়? সমস্যা হচ্ছে আমাদের এতো শিল্পী, কিন্তু ভালো প্রোগ্রাম দিতে গেলে সংগীতের প্রতিটি বিষয়ে গড়ে দশজন ভালো শিল্পী পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। ধরলাম আমাদের সংগীতের প্রতিটা বিষয়ে উপস্থাপিত হওয়ার মতো ৫০ জন করে শিল্পী আছেন। ধরলাম সংগীতে আমরা আটটা বিষয় নেবো। অর্থাৎ আমাদের সর্বোচ্চ ৪০০ শিল্পী দরকার। আছে কতোজন জানেন? সম্ভবত ১০,০০০। কীভাবে তাদের নিয়মিত উপযুক্ত সম্মানী দিয়ে অনুষ্ঠান দেবেন? তাহলে কি করা উচিত? প্রথম কাজ স্বজনপ্রীতি বাদ। নতুন করে অডিশন। অডিশনে শুধু গ্রেডেশন নয়, ডিগ্রেডেশনও চালু করতে হবে। গানের অডিশনের সঙ্গে বেতারের একটা যৌথ ভ‚মিকা থাকতে হবে। বেতারের যারা কণ্ঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না তারা বিটিভির স্ক্রিন টেস্টের জন্য কোয়ালিফাই করবে না। যেহেতু বেতারের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততার কথা বলছি বিটিভি একটা বিশাল ঝামেলা থেকেও বেঁচে যাবে। এই ব্যবস্থা ভারতের দূরদর্শনেও আছে। বেতারের অডিশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদল করতে হবে, যে বিষয়ে আমি বেতার কর্তৃপক্ষকে আমার মতামত জানিয়েছি। এতো বেশি প্রভাব, অনুরোধ, নির্দেশ আসে যে শিল্পী নির্বাচন বা গ্রেডেশনে কর্মকর্তা এবং বিচারকদের হিমশিম খেতে হয়। বাংলাদেশ বেতারের শুধু ঢাকার শিল্পী সংখ্যা ৪০০০। সবগুলো আঞ্চলিক কেন্দ্র মিলিয়ে এই সংখ্যা ১৬,০০০। আপনি কীভাবে এতো শিল্পীদের প্রোগ্রাম দেবেন? সম্মানজনক সম্মানীই বা কীভাবে দেবেন? অডিশন সিস্টেম বদলানোর একটা চমকপ্রদ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। প্রতি শিল্পীর বিষয় অনুযায়ী একটি করে গান শুধু হারমোনিয়াম বা তানপুরা এবং তবলা সহযোগে রেকর্ড করা হবে। সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০/৩০ বা ৪০ জন বিচারক নির্ধারণ করা হবে যাদের প্রত্যেকের কাছে গানগুলো সিডিতে বা শ্রæতিযোগ্য পদ্ধতিতে একটা করে কোড নম্বর দিয়ে পাঠানো হবে। কঠোর গোপোনীয়তায় এই পরীক্ষার ফল কেন্দ্রে আসলে নম্বরগুলোকে মানে পরিবর্তন করে যোগ দিয়ে গড় করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। টার্গেট থাকবে সারাদেশের মোট সংগীত শিল্পীর সংখ্যা ১৬০০০ থেকে ২০০০ বা একটা গ্রহণযোগ্য সংখ্যায় নামিয়ে আনা। বাদপড়া অসংখ্য শিল্পী মর্মান্তিক কষ্ট পাবেন, কিন্তু ভালো করার উৎসাহটা কতোখানি বাড়বে সেটা চিন্তা করুন। বিশেষ গ্রেডের উপর নতুন করে প্রিমিয়াম ১ এবং ২ দুটো গ্রেড সৃষ্টি করতে হবে। এখন সর্বোচ্চ গ্রেডে যে ১৩৫০ টাকা দেয়া হয় (২০০০ হতে পারে, ঠিক নিশ্চিত নই) সেটা বাড়িয়ে অন্তত ২০,০০০ টাকা করা উচিত। আরও বেশি হলে আরও ভালো। ইংল্যান্ডের অপেরা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সেদেশের সরকার ৩০ বছর বিশাল ভর্তুকি দিয়েছে। এখন আপনি ৬ মাস আগে অনুষ্ঠানের টিকিট পাবেন না। বাংলাদেশে সিরিয়াস শুধু সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য সরকার ইচ্ছা করলে উপযুক্ত পদ্ধতিতে শিল্পী নির্বাচন করে তাদের গৃহায়ণ ও মাসোহারার ব্যবস্থা করতে পারে। এ রকম ব্যবস্থা অনেক দেশেই আছে বলে শুনেছি।
আমাদের দেশে প্রতিটা জেলায় শিল্পকলা একাডেমির শাখা আছে। এই শাখাগুলোতে গড়ে দশজন করে সংগীত ও নৃত্য প্রশিক্ষক আছেন। তাদের মাসিক বেতন কতো জানেন? যেটা কিছুদিন আগে ছয়শত ছিলো, জনাব লিয়াকত আলী লাকী শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার পর দুইধাপে সেটা হয়েছে ১২০০ এবং এখন ২৩০০ টাকা। এই টাকাও সম্মানী হিসেবে ৬ মাস পর পর একসঙ্গে ১৪৪০০ টাকা দেয়া হয়। চিন্তা করা যায় এই সময়ে শিল্পকলা একাডেমির একজন প্রশিক্ষকের ৬ মাসের বেতন ১৪,৪০০ টাকা? কীভাবে তারা জীবনযাপন করবেন, সংস্কৃতি চর্চা করবেন, নবীনদের পেছনে সময় দিয়ে তাদের গড়ে তুলবেন?আমাদের প্রাইভেট টিভি এবং এফ এম চ্যানেলগুলোতে চাইলেই তথ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অনুষ্ঠানগুলোর সময়সীমা বাড়াতে এবং প্রাত্যহিক করতে স্পনসরদের রাজি করানোর উদ্যোগ নিতে পারে। এই কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের কর্মীরাও তো আমাদেরই স্বজন। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশ ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে। যে দেশ প্রগতিশীল বলে আমরা পরিচয় দিই। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন একটা জাতির মনন তৈরি করে। আজ যে নানা বিষয়ে অস্থিরতা, বৈষম্য, অসততার বিস্তার আমরা দেখছি একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ সেই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। হয়তো রাতারাতি আমরা পারবো না। কিন্তু আর বিলম্বের কি অবকাশ আছে? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]