• প্রচ্ছদ » » অভিযান সফলে বিতর্ক জন্ম না দেয়াই শ্রেয়


অভিযান সফলে বিতর্ক জন্ম না দেয়াই শ্রেয়

আমাদের নতুন সময় : 06/10/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চলে আসছে। বেশ কয়েকজনকে অবৈধ ধনসম্পদ উপার্জনের অভিযোগে কিংবা হাতেনাতে ধরার পর আইন প্রয়োগকারীদের অধীনে নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অভিযানকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেয়ার কথা দেশবাসীকে জানিয়েছেন। তার কথায় বেশিরভাগ মানুষই আস্থা স্থাপন করছেন। মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন যে, শেখ হাসিনা যা করার কথা জোর দিয়ে বলেন তা তিনি করেই ছাড়েন। অবশ্য প্রথমদিকে অনেকে তার বেশ কিছু কথা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন। বিষয়টি এমন যে শেখ হাসিনা যখন বলেছিলেন যে, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন, তখন অনেকেই এটিকে  উড়িয়ে দিতেন। যখন তিনি সত্যি সত্যি বিচারটাকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিলেন তখনো অনেকে বলতেন ‘মৃত্যুদ-’ তিনি কার্যকর করতে দেবেন না। আবার দু’একজনের মৃত্যুদ- কার্যকর হচ্ছিলো তখন অনেকেই বলতেন যে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার তিনি শেষই করবেন না মৃত্যুদ- তো দূরের কথা। যখন সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ- কার্যকর হলো তখন তারা আশ্বস্ত হলেন যে, সাকা চৌধুরীর চাইতে শেখ হাসিনা তার সিদ্ধান্তে কতো বেশি অনড় থাকতে পারেনÑ সেটির প্রমাণ তিনি করলেন। আবার যখন পদ্মাসেতুর বিষয়টি আসলো তখনো একইভাবে শেখ হাসিনার দৃঢ় সিদ্ধান্তের প্রতি বড় বড় দলের নেতারাও সন্দেহ পোষণ করেছেন। কিন্তু এখন যখন পদ্মাসেতু প্রায় শেষ হচ্ছে তখনো কেউ কেউ খুব আস্তে করে হলেও বলার চেষ্টা করেন টাকা বেশি খরচ করে ফেলেছে। বাঙালির এমন সন্দেহ বাতিকতা নিয়ে বহু আগে থেকে নানা গল্প রয়েছে। সেসব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এখন যখন শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থানের কথা বারবার বলছেন তখনো অনেকে যেন সন্দেহের সেই বাতিকতা থেকে বের হতে পারছেন না। তবে এটি অবশ্য এখন অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, শেখ হাসিনা যা বলেন তা তিনি করে দেখাতে চেষ্টা করেন। তারা বিশ্বাস করছেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অভিযান শেখ হাসিনার কোনো চমক সৃষ্টির লক্ষ্য থেকে নয় বরং বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেটি সরকারি উদ্যোগ ছাড়া, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনোদিনই কোনো দেশে হয়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেনাশাসকরা ক্ষমতা দখলের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও দুর্নীতিবাজদের নিয়েই তারা দল গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ দুর্নীতির বিরদ্ধে কেউ অভিযানের কথা বললে সন্দেহ করতে থাকেন। সন্দেহ করার যৌক্তিকতা থাকলেও সেটি কেন ঘটেছিলো, কার কারণে ঘটেছিলো, কে এই অভিযান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন সেটি ভালো করে বুঝতে হবে। সবাইকে দিয়ে দুর্নীতির মতো সমস্যার সমাধান রাষ্ট্রীয়ভাবে খুব একটা হয় না। দু’একজন রাষ্ট্র নায়কই কেবল সেই অভিযান শুরু এবং শেষ করেন। আমাদের ধারণা শেখ হাসিনা যে অভিযান শুরু করেছেন তা তিনি সফল করতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি যদি সফল না হন তাহলে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র এবং রাজনীতি আর কোনোদিন সন্ত্রাস, দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তমুক্ত হবে কিনা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
শেখ হাসিনা বলেছেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান তার নিজের ঘর থেকেই আগে শুরু করা প্রয়োজন। তার এই কথা শতভাগই খাঁটি। তিনি যদি তার দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনের বাইরে অন্যদের দুর্নীতি নিয়ে অভিযান শুরু করতেন তাহলে তিনিই সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হতেন। এটি শেখ হাসিনা বোঝেন না এমন বিশ্বাস যারা করেন তারা বোধহয় এখন বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি সমাজের মনস্তত্ত্ব জেনেই তার অভিযানের শুরুটা যথা স্থান থেকে শুরু করেছেন। এখন আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের কেউ কেউ ধরা পড়া ব্যক্তিদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে যে ধারণাটি দেয়ার চেষ্টা করেন সেটি আদৌ করার প্রয়োজন রয়েছে কী? আওয়ামী লীগ বা বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে যারা প্রবেশ করেছেন তারা জোর করে ঢোকেননি। আওয়ামী লীগ বা বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের কারও না কারও সমর্থন নিয়ে কিংবা কোনো কিছুর বিনিময়ে এরা প্রবেশ করেছেন এটি বোধহয় বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তাহলে যারা এদের অনুপ্রবেশ করতে সাহায্য করেছেন তারা দলের শৃঙ্খলা ও আদর্শ কতোটা ভঙ্গ করেছেন, তাদের এখন কি হওয়া উচিত সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। অনুপ্রবেশকারীরা যেমনিভাবে দলের ভেতরে প্রবেশ করে দলকে কলঙ্কিত করেছে, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে একইভাবে এদের অনুপ্রবেশ করতে দিয়ে অনেকেই দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সাহায্য করেছেন। সুতরাং তারাও কম অপরাধ করেননি। অনুপ্রবেশকারীরা যেমনিভাবে অপরাধ করেছেন আবার দলে অবস্থানকারী অনেকেই দলের আদর্শের বিরুদ্ধে নানাভাবে অপকর্ম করেছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভূমিদস্যুবাজি, নদী দখলকারী ইত্যাদি অপকর্মে যারা যুক্ত ছিলেন তারা তাদের বাদ দিয়ে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। সুতরাং শুধু অনুপ্রবেশকারীদের অপরাধ এবং দুর্বৃত্তায়ন সম্পর্কে বলা হলে মূল সমস্যাটি থেকে যেতে বাধ্য। সেকারণে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের উচিত হবে অনুপ্রবেশকারী এবং ভেতরে যারাই দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িয়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে তাদের সবার ব্যাপারেই দলের অবস্থান এক এবং কঠোর থাকবে এমনটি নিশ্চিত করা। কারও ব্যাপারেই ছাড় দেয়া হবে নাÑতাহলে বিষয়টি একপেশে হবে না বরং শেখ হাসিনা যে বার্তাটি দিয়েছেন সেটিই পরিপূর্ণতা পাবে। সেকারণেই বলছি দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের ঠিক হবে না। সেটি করা হলে প্রতিপক্ষ বা বিরোধীরা কথা বলার সুযোগ পাবে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবে। এমন একটি স্পর্শকাতর অভিযানকে কোনোভাবেই শাসকদলের কেউ যেন খ-িত কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে জনমনে সৃষ্ট প্রত্যাশায় হতাশার জন্ম না দেন সেটিই সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে। লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]