আবরার হত্যা, মেধা ও মানবিকতা এবং ড. মাঈমুলের আত্মজিজ্ঞাসা

আমাদের নতুন সময় : 09/10/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছেন। সে সংবাদ দাবদাহের মতো এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। ফ্রান্সের বার্তা সংস্থা, এএফপি’র একটি সংবাদের শিরোনাম- ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্ট কিলিং স্পার্কস ইউনিভার্সিটি প্রোটেস্ট’। অর্থাৎ শিক্ষার্থী হত্যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবাদমুখর, যা ভয়েস অব আমেরিকাও প্রচার করেছে। এতে নিজের সন্তানের কথা ভেবে যতোটা না আবেগতাড়িত, ততোটাই মর্মাহত। কারণ, সে কানাডার রায়ারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশলের একই বর্ষের শিক্ষার্থী।

আবরার তার ফেসবুকে যে ‘লিনিয়ার সার্কিট অ্যানালাইজার’-এর অ্যাসাইনমেন্টটি গতমাসে তুলে ধরে লিখে গেছে: ‘ফার্স্ট প্রজেক্ট ইন ভার্সিটি লাইফ সাকসেসফুলি কমপ্লিটেড’। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন। আমার ছেলেও তা প্রথম বর্ষেই করেছে।

এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের একটি সুউচ্চ মর্যাদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানবিকতা কতোখানি বিপর্যস্ত; যেখানে একমাত্র মেধার সমাবেশ থাকলেও সতীর্থের প্রতি কিংবা নিজের পরিবারের ভাবনাগুলোর সঙ্গে মানবিকতার বিবেচনাটি কতোটা বিদূরিত ও ক্ষয়িষ্ণু হলে একটি দেশের জাতীয় রাজনীতির প্রভাবে পরমত সহিষ্ণুতা পুরোপুরি তিরোহিত হয়। অথচ মেধা ও মানবিকতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বে একটি প্রচলিত কথা হচ্ছে- ‘অবজার্ভ মেরিট, অ্যাপ্রিশিয়েট কাইন্ডনেস’। অর্থাৎ মেধার পরখে মানবিক স্বীকৃতি। এই আলোকিত মূল্যবোধটুকু যে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক আগেই উবে গেছে, তা অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময়ে অব্যাহতভাবে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রামাণ্য দলিল থেকে সহজেই প্রতিভাত।

সে জন্য গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাঈমুল আহসান খানের শিক্ষার্থীরা তার প্রতি সন্মান প্রদর্শনপূর্বক সামাজিক মাধ্যমে যে উদ্ধৃতিটি তুলে ধরেছেন, সেটি বোধ করি এখানে প্রণিধানযোগ্য। কেননা তার ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন ‘জুরিসপ্রুডেন্স’ বা মানবিক আইনের বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ে। তিনি লিখেছেন, “আমাদের দেশে দলীয় রাজনীতির সৃষ্ট ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ আমাদের আরও বর্বর ও অসভ্য করছে। আমরা আমাদের প্রাণের মূল্য ভুলে গেছি। মানবিক মর্যাদাও সংরক্ষিত হচ্ছে না। অবচেতনভাবে আমরা খুবই উদ্যত প্রকৃতির হচ্ছি। এমনকী আমাদের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষকরাও অসভ্য ও বিশৃঙ্খল হচ্ছেন। সমাজে এখন শিক্ষকদের ভূমিকা ও অবস্থান খুবই নিচে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এটির পরিবেশ তৈরি করেছে। এখন অধিকাংশ শিক্ষকের যোগ্যতা আছে কিনা সেটিই প্রশ্নবিদ্ধ। এটি অনেক বড় ভুল নীতিমালারই প্রতিফলন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সভ্যতায় শিক্ষকদের পবিত্রসত্তা মনে করা হতো। এমনকী আরব, পারস্য ও চীন সংস্কৃতিতে শিক্ষকরা ছিলেন নবীদের উত্তরসূরির মতো। কিছু ইউরোপিয়ান দেশ তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যতিরেকেই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার কাজ করছে। আমেরিকা এবং জার্মানির রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থায় শিক্ষা সংক্রান্ত স্বাধীনতা ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। বোধহীন-অজ্ঞ শিক্ষক শয়তানি শক্তিরই প্রতিচ্ছবি, যা বর্তমানে মোদি ও ট্রাম্পদের সঙ্গে জোটভুক্ত এবং আমাদের ওপর কর্তৃত্ব¡ করছে। বৃহত্তর বাংলা ব-দ্বীপ অঞ্চলে ছাত্র ও শিক্ষক সম্প্রদায়ের গৌরব পুনরুদ্ধারে আমাদের সংগ্রাম অপরিহার্য। একই সঙ্গে প্রতিটি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ পরিচর্যা ও মর্যাদায় লালিত হবার অধিকারটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।”

আজ যে প্রতিবাদমুখর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবরার হত্যার সুষ্ঠুু ও সর্বোচ্চ বিচার দাবি করেছেন, তাদের প্রত্যেকের সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ড. মাঈমুল আহসান খানের বর্ণিত আত্মজিজ্ঞাসাটি গভীরভাবে হৃদয়াঙ্গম ও অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। কারণ, ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর আবরার ফাহাদ তার ফেসবুকে লিখে গেছেন, ‘অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে।’ আর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তার প্রোফাইলের মাস্টহেডে পুষ্পাঞ্জলীর শ্রদ্ধার্ঘ্যে লিখেছে- ‘উই হোপ পিপল হু লাভ আবরার উইল ফাইন্ড কমফোর্ট ইন ভিজিটিং হিজ প্রোফাইল টু রিমেম্বার অ্যান্ড সেলিব্রেট হিজ লাইফ’। অর্থাৎ আমাদের প্রত্যাশা যারা আবরারকে ভালবাসতেন, তারা তার প্রোফাইলে এসে তাকে স্মরণ ও তার জীবনের জয়গান গাইবেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]