• প্রচ্ছদ » » আমাদের সময়ে বুয়েট নামটাই ছিলো বিরাট সম্মানের


আমাদের সময়ে বুয়েট নামটাই ছিলো বিরাট সম্মানের

আমাদের নতুন সময় : 14/10/2019

আবদুন নূর তুষার

আমার স্কুল ও কলেজের অনেক বন্ধু বুয়েটে পড়েছে। আমার ছোট ভাই ও বোন দু’জনই বুয়েট থেকে পড়ে স্থপতি ও প্রকৌশলী হয়েছে। আমার বোন বুয়েটের শিক্ষকও হয়েছে। আমাদের সময়ে বুয়েট নামটাই ছিলো বিরাট সম্মানের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট এই দুটো প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি। পলাশীর মোড় থেকে বকশীবাজারের মোড়Ñ এই রাস্তাটা ছিলো উজ্জ্বল সব মেধাবীদের আনাগোনায় আলোকিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো তখন খুব উত্তপ্ত। প্রতিদিন কোনো না কোনো রাজনৈতিক বিবাদ, কারণ সময় ছিলো স্বৈরাচারের। এরশাদ তখন ক্ষমতায়, ছাত্ররা কিছুতেই তাকে মেনে নেয়নি। পলাশী যাবো কিংবা বকশীবাজার, বললে রিকশাওয়ালারা পয়সা কম নিতো, বাসে মাঝে মাঝে ভাড়া নিতো না। এমনই ছিলো সম্মানের নমুনা। দেশে তখন এতো মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নেই। বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারে কেবল তিন হাজার সেরা মেধাবী যাদের অঙ্ক ও বিজ্ঞানের নম্বরের সমষ্টি দিয়ে বাছাই করা হয়। পরীক্ষাই দিতে পারে না অনেকে, তাই বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারাটাও একটা অর্জন ছিলো যে আপনি বিজ্ঞানের বিষয়ে দেশের সেরা তিন হাজারের একজন। টিউশনিতে বুয়েটের ছাত্র হলে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা দিতেন অভিভাবকেরা। আমাদের সময় তো এতো ডিজিটাল ব্যবসা-বাণিজ্য ছিলো না। টিউটরিং ছিলো পকেট খরচ তোলার একটা রাস্তা। আমার বন্ধু গাজী, ওহি, সোহেল , লিটন, মিঠুল, ইকবাল, তনু, আফফান, মামনুন, বাবু , ইফতু, জুলকার, আসিফ, ফয়সালÑ সবার নাম লেখা যাচ্ছে না তাহলে অনেক নাম লিখতে হবে, সিনিয়ররা রাফেল ভাই, ফয়েজ ভাই, মোশতাক ভাই, কবিরুল ভাই, সালেক ভাই, শাফকাত ভাই, মিঠু ভাই, রম্য, মিটুন ভাই (লেখক আনিসুল হক), মোজাম্মেল বাবু ভাই আর টিংকু ভাই বন্ধু, তাই বাবু ভাইও। জুনিয়রদেরও চিনতাম, সাগুফতা, বিপা, আরিফ, রানা, বাবর অনেক নাম।
বিতর্ক আর ছাত্র রাজনীতির কারণেÑ হ্যাঁ, ছাত্র রাজনীতিÑ বুয়েটে আর মেডিকেলে সেই রকম ছিলো রাজনীতি। মেধাবীদের রাজনীতি, পরীক্ষার সময় থাকে না। তবে যখন থাকে তখন সত্যিকারের রাজনীতি হয়। রেজাল্ট যেমন ভালো, রাজনীতিও সেইরকম বুদ্ধির খেলা। পোস্টার লিখতাম হাতে, বক্তব্য মাইক ছাড়া টুলের উপরে দাঁড়িয়ে। বুয়েট ক্যান্টিনের আখনি পোলাও। মেডিকেল আর বুয়েটে একই ঠিকাদার ক্যান্টিন চালাতো, কিন্তু আখনি পোলাও দিতো বুয়েটে, আট টাকা প্লেট, এটা নিয়ে একটু হতাশা ছিলো, তাদেরটা ভার্সিটি আর আমাদেরটা কলেজ। জিনিসটাকে কেন আখনি বলে সেটা জানতাম নাÑ এখনো জানি না। বুয়েটের দারুণ অডিটোরিয়াম ছিলো। মেডিকেলে ছিলো না। দলবেঁধে বুয়েটে যেতাম কনসার্ট দেখতে।
আমি গাজীর সঙ্গে এক সপ্তাহ বুয়েটে ক্লাসও করেছিÑ ম্যাথ ক্লাস
স্যারের নাম কুদ্দুসÑতাকে বুয়েটে ডাকতো ডেল কুদ্দুস। বুয়েটের মাঠে ফুটবল খেলেছি, ক্রিকেটও। শহীদ স্মৃতি হল, রশীদ হল, শেরে বাংলা হলে গিয়ে বন্ধুদের রুমে ঘুমও দিয়েছি। শহীদ স্মৃতি হলটা অন্য রকম ছিলোÑ লাল ইট, আমাদের হলের কাছে। বুয়েট আমাদের কাছে খুবই রেসপেক্ট পেতো, আমরাও পেতাম। বুয়েটে ভিপি পদপ্রার্থীরা বিতর্ক করেছিলো। এই নিয়ে আমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিলো, মেডিকেলে কেন আমরা আগে এটা করতে পারিনি।
আমার ৮৬ ব্যাচের বন্ধুরা আমেরিকায় সম্মিলনী করে, সেখানে আমি গিয়ে তাদের টি-শার্ট পরে তাদের সঙ্গে আড্ডা দিই, মঞ্চে উঠে কথা বলিÑ বুয়েটের সঙ্গে আমার এমনি সম্পর্ক। যেখানে আমার সহোদর ভাইবোন পড়েছে, বন্ধুরা পড়েছে, সেখানে টর্চার সেল? বিশ্বাস হয় না। বিশ্বাস হয় না, সেখানে মানুষ পেটানোর চল হয়েছে। র‌্যাগ হয় বড় ভাইয়েরা মারে, অপমান করে, নির্যাতন করে। ১৮ বছরের যে সদ্য কৈশোর পেরুনো ছেলেটি বিরাট স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটে আসে তার পাওয়ার কথা বড়দের স্নেহ, পরামর্শ, সাহায্য। কি বিশাল তার কাছে তার এই অর্জন, বুয়েটের বিশাল বিশাল ভবন, হলের নামকরণ, ইতিহাস এসবের গল্প বলে তাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বড়দের। সেটা না করে, তারা নাকি রুমে নিয়ে, হলের ছাদে নিয়ে পেটায়। যে ছেলেটি কোনোদিন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি, তার তীব্র ভীতি ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি চিন্তা করলেই আমি কষ্ট পাচ্ছি। এভাবে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসে একজন ছাত্রের পড়াশোনা থেকে চিরতরে মন উঠে যেতে পারে। সে নিজে এ রকম দানবেও পরিণত হতে পারে। বুয়েটের ডি এস ডাবলু কি করতো? শিক্ষকেরা? হলের প্রভোস্ট? ভিসি? কেউ কথা বলবে না। দায় তাদেরও নিতে হবে।
কেন এই ভয় দেখানো যায়? পেটানো যায়? কারণ এই নেতাদের জনপ্রিয়তা লাগে না। তারা মাফিয়া বড় ভাই, তাদের অনুসারীরা স্নেহভাজন নয়, তারা অনুগ্রহভাজন। তাদের ভোট দরকার নেই। কারও সমর্থন দরকার নেই। তাদের দরকার আজ্ঞাবহ ভৃত্য। রাজনীতি বন্ধ হচ্ছে কারণ সেখানে রাজনীতি ছিলোই না। যেটা ছিলো সেটা জবরদস্তি। আজকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথাই হতো না যদি একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা বুয়েটে থাকতো। ছাত্রনেতারা এতোই অজনপ্রিয় যে, তাদের কারণে রাজনীতিকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের একাংশ। রাজনীতি না থাকলে নাকি শিবির মাথাচাড়া দেবে, বুয়েটে জঙ্গি হবে, এসব বলা হচ্ছে। রাজনীতি যে এভাবে পরিত্যক্ত হচ্ছে এর জন্য কে দায়ী, কারা দায়ী? কাদের বাড়াবাড়ি ও কুকাজের কারণে আজকে এমনটা হচ্ছে।
মারপিট, সন্ত্রাস এগুলোতো দেশের বিপক্ষে যারা তাদের কাজ। কেউ যদি জঙ্গি হয়, সন্ত্রাস করে, নিজের দল যখন ক্ষমতায়, তখন প্রশাসন পুলিশ ডাকবে, স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাÐ করলে সেটা আইনের শাসন দিয়ে প্রতিহত করা হবে। অপরাজনীতির জবাব কি অপরাজনীতি? ক্যান্সারের জবাব কি ক্যান্সার? এই যে কাজ, যে কারণে বিরাজনীতিকীকরণ হলো বা হচ্ছে সেটা কার দায়? বুয়েট নিয়ে আমার পরিবারের গর্ব আছে। ভাইবোনের কারণে। আমার নিজের বাড়তি গর্ব আমার আগুনের মতো উত্তপ্ত মেধাবী বন্ধুদের কারণে। তারা সব ইন্টেল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, উবার, এসব জায়ান্টদের বড় বড় কর্তা। বাংলাদেশের গর্ব আছে বুয়েট নিয়েÑ দেশের প্রযুক্তিজ্ঞান শিক্ষার শুরুই তো হয়েছে এখানে। সব কেমন যেন শূন্য হয়ে গেছে। বুয়েট বললেই ক্রিকেটের স্ট্যাম্প, টর্চার সেল, নির্যাতন, মৃত্যু, নৃশংসতাÑ মনের মধ্যে পুরনো শ্রদ্ধাবোধ আর নেই, নামটা ভীতি ও আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। তারা জানে নাÑ তারা কতো বড় ক্ষতি করেছে।
শুধু আবরার নয়, তারা বুয়েটের রাজনীতিকেও খুন করেছে। বুয়েটের প্রতি মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধাকেও খুন করেছে। নিজেদের বাবা-মায়ের গর্বকে হত্যা করেছে। তারা কেবল আবরারকে নয়, মেধার প্রতি মানুষের মর্যাদাকে হত্যা করেছে। এখন কেবল সুবিচারের মাধ্যমেই হয়তো এই ক্ষতকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু ক্ষত শুকালেও দাগ থেকে যাবে। সেই দাগ মুছবে কে? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]