উপাচার্য কথন

আমাদের নতুন সময় : 14/10/2019

জায়েদুল আহসান পিন্টু

টুকরো স্মৃতি-১ : ১৯৯১ সালের কথা। একটা সিরিজ প্রতিবেদন ছাপা হতো। অধিকাংশ সময় আমার একজন অগ্রজ লিখতেন। কখনো কখনো আমি লিখতাম। কোনো একটা পর্বে অগ্রজ লিখলেন, পেছনের দরজা ব্যবহার করেন উপাচার্য। এই শিরোনাম দেখে উপাচার্য মহোদয় মনে করলেন সেটা আমি লিখেছি। কারণ আমিই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ছিলাম। তিনি টিএসসি মিলনায়তনে সাংবাদিক সমিতির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বললেন, ‘আমি অভিশাপ দিচ্ছি সেই ছেলে কোনোদিন বড় সাংবাদিক হতে পারবে না।’ তিনি বললেন, দেয়াল আর গেটের সংস্কার কাজ চলছে বলে পেছেনের দরজা ব্যবহার করেন। আর রিপোর্টার লিখলো, ছাত্র সংগঠনের ভয়ে আমি নাকি পেছনের দরজা দিয়ে চলি। আসলে অনেকদিন ধরেই সংস্কার কাজ চলছিলো। মাসের পর মাস। গেট আর ঠিক করা হয় না। উপাচার্য আর ওই অগ্রজ সাংবাদিক দুজনই বেঁচে নেই।
টুকরো স্মৃতি-২ : ১৯৯৮ সালের দিকের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক রায় পিনাকী লিখলেন, হলগুলো অপহরণকারীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। এই রিপোর্ট পড়ে উপাচার্য মহোদয় প্রচÐ ক্ষিপ্ত হলেন। তিনি ওই প্রতিবেদককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করবেন বলে হাঁকডাক দেয়া শুরু করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্টকারীর ছাত্রত্ব রাখা যায় না। এবার অগ্রজ হিসেবে আমি গেলাম। উপাচার্যকে বললাম, আপনি বলছেন অনেক ক্ষতি হয়েছে, কী করা যায় বলেন। পাশ থেকে একজন, যিনি পরবর্তীতে উপাচার্য হয়েছিলেন বললেন, ভিসির একটা সাক্ষাৎকার নাও। আমি বললাম তাই হবে। তবে ওই প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।
সাক্ষাৎকার শেষে এসে লিখলাম, ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ওই সময় আযার্চ মানে রাষ্ট্রপতি ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা বলতেন। তাই রেফারেন্স হিসেবে সাক্ষাৎকারের ওই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির অবস্থানের কথাও বলা ছিলো। পরদিন শিরোনাম হলো, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বিমত উপাচার্যের…। সকালে ঘুমই ভাঙ্গলো প্রক্টরের ফোনে। উপাচার্য রেগেমেগে আগুন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বিমত একথা শিরোনাম হলো কেন? মানতেই পারছেন না। প্রক্টরের ফোনেই উপাচার্যের সঙ্গে কথা বললাম, জানতে চাইলাম, রাষ্ট্রপতি তো ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কথা বলছেন, আর আপনি তো বলছেন, কোনো অবস্থাতেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা ঠিক হবে না। এতে কি দ্বিমত হলো না? তিনি মানতে চাইলেন না, বললেন, এখনোই পদত্যাগ করতে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি ভুল বোঝার আগেই তিনি পদত্যাগপত্র দেবেন। একপর্যায়ে কেঁদে দিলেন। আমরা সবাই নাকি তার শত্রæ। সন্ধ্যায় পত্রিকার প্রকাশক যিনি নিউজ নিয়ে কোনো মাথা ঘামান না কখনো, একটি নোট পাঠালেন, লিখলেন ‘শিরোনামের প্রতিবাদটি প্রথম পাতায় বক্স করে ছাপানো হোক।’ শুনেছি উপাচার্য প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলেন। দু’জনের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিলো। তার পরদিন দুই নম্বর পাতায় এক ইঞ্চি মাপের একটা প্রতিবাদ ছাপা হলো, ‘প্রকাশিত শিরোনামের প্রতিবাদ করলেন ঢাবি উপাচার্য।’
টুকরো স্মৃতি-৩ : এটাও ১৯৯৮ সালেরই কথা হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উৎসবের খবরে বিক্ষোভ চলছে। গেলাম সেখানে। জাবি বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ড. হারুন রশীদ সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করলেন। শুরু হলো প্রশ্ন আর উত্তর। উপাচার্যের সঙ্গে আরও দু-একজনও উত্তর কী হওয়া উচিত পরামর্শ দিচ্ছিলেন। আর এদিকে উপাচার্যের জবাব শুনে আমার কান গরম হতে শুরু করলো। একি বলেন তিনি। ক্রমাগত তার ছাত্রীদের সম্পর্কে অকথ্য কথা বলতে থাকলেন। সেখানে নাকি অবাধ যৌনাচার চলে। শিক্ষকরা নাকি লজ্জায় মাথা নিচু করে হেঁটে যায়। হলে অনেক ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করে। তারা রাতদিন মানে না। আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন রাত তিনটায় বা বেলা তিনটায় যখনই যাই আমি নাকি মাঠেঘাটে যৌনকর্ম দেখতে পাবো। বললেন এটা ছোটখাটো হলিউড হয়ে গেছে। আরও কী কী সব বললেন। একারণে নতুন নিয়ম চালু করার প্রস্তাব দিলেন। আমি প্রতিবেদনে ছাত্রীদের সম্পর্কে বাজে কথা প্রায় সবই এড়িয়ে গেলাম। শুধু দুয়েকটা কথা যা তার বক্তব্যের সবচেয়ে শালীন ছিলো, সেটা তুলে ধরলাম। পরদিন ওই প্রতিবেদন পড়ে উপাচার্যকে ক্ষমা চাইতে বললো বিভিন্ন সংগঠন। নারীপক্ষ বের করলো ঝাড়ু মিছিল। আরও অনেকে প্রতিবাদ হলো। উপাচার্য তার অবস্থানে অনড় রইলেন। এই তিনজন উপাচার্যই রাজনৈতিক দলগুলোকে উপদেশ দেন বা দিতেন। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]