• প্রচ্ছদ » » শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের আশা : সব শিশুর বাসযোগ্য হোক এ দেশ


শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের আশা : সব শিশুর বাসযোগ্য হোক এ দেশ

আমাদের নতুন সময় : 18/10/2019

বিভুরঞ্জন সরকার

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শেখ রাসেল। দুই কন্যা, তিন পুত্র। কন্যা দু’জন বেঁচে আছেন। একজন শেখ হাসিনা, অন্যজন শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠতম শেখ রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা-মায়ের সঙ্গেই। একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে, যিনি আবার সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা-স্থপতি, সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার নজির পৃথিবীতে বিরল। সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রনেতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রতিহিংসাবশত বা অন্য কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিবাদে হত্যা কিংবা গুপ্ত হত্যার ঘটনা একাধিক ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্র পিতাকে সপরিবার হত্যার ঘটনা বাংলাদেশেই ঘটেছে। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট এমন অনেককে হত্যা করা হয়েছে, যাদের কোনো রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা ছিলো না, যাদের বিরুদ্ধে ছিলো না কোনো ধরনের অভিযোগ কিংবা তাদের কারও আবার অপরাধ সংঘটনেরও কোনো ক্ষমতা বা সুযোগ ছিলো না। কিন্তু ঘাতক দল বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাউকে মার্জনা করেনি, বিবেচনা করেনি কারও বয়স। ভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে থাকায় জীবন রক্ষা পায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানা। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, তখন মাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, দশ বছরের শিশু। তার চোখের সামনেই একে একে হত্যা করা হয়েছে বাবা, ভাই, ভাবিদের। মায়ের কাছে গিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়ে হতবিহŸল রাসেল ঘাতকদের কাছে উপহার পেয়েছিলো তপ্ত বুলেট এবং স্নেহময়ী জননীর রক্তাক্ত দেহ। সেদিন অমন নিষ্ঠুর হত্যাকাÐ সংঘটিত হলেও আকাশ ভেঙে পড়েনি কিংবা শিশু হত্যার বিক্ষোভে সেদিন কেঁপে উঠেনি বসুন্ধরা। সব শিশুর বাসযোগ্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু তার জীবনের উজ্জ্বল সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু দেশ স্বাধীন করে নিজেকে জীবন দিতে হলো, এমনকি শিশু পুত্রের জীবনও রক্ষা করা গেলো না। কিছু বিশ্বাসঘাতক প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকাÐে শরিক হলো, আর পুরো জাতি প্রতিবাদহীন নীরবতায় সব মেনে নিলো। যে জাতিকে অমিত সাহসে বলীয়ান করে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার মন্ত্রে করেছিলেন উজ্জীবিত, সেই জাতির এমন অসহায় আত্মসমর্পণ বড় কষ্ট এবং বেদনার। আজ ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেলের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এমন এক হেমন্তের মৃদু শিশিরস্নাত রাতে মুজিবদম্পতির ঘরে জন্ম হয়েছিলো এক শিশুর। তার নাম রাখা হয়েছিলো রাসেল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক-চিন্তাবিদ-শান্তি আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক রার্টান্ড রাসেলের ভক্ত। রাসেলের লেখা তিনি পড়তেন। রাসেলকে নিয়ে বেগম মুজিবের সঙ্গে আলেচনাও করতেন। বেগম মুজিব গৃহবধূ হয়েও যে প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়ে উঠেছিলেন, তার পেছনেও ছিলো বঙ্গবন্ধুরই অবদান। বঙ্গবন্ধুর জীবন ছিলো ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। জেল-জুলুম ছিলো নিত্যসঙ্গী। সংসার সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সুখ-দুঃখের খবরাখবরও বেগম মুজিব রাখতেন। যে অল্প সময় স্বামীর সান্নিধ্য পেতেন সে সময়টুকুতেই নিতেন রাজনীতির পাঠ। বঙ্গবন্ধুর কাছে শুনে শুনে বেগম মুজিবও হয়ে উঠেছিলেন রাসেলভক্ত। আর সেকারণেই হয়তো কনিষ্ঠ সন্তানের নাম রেখেছিলেন রাসেল। মনে হয়তো প্রচ্ছন্ন আশা ছিলো তাদের ছোট ছেলেটিও যদি বার্টান্ড রাসেলের মতো যশস্বী-মনস্বী হয়ে ওঠে। তেমন সম্ভাবনাও ছিলো। সব শিশুর মধ্যেই থাকে অপার সম্ভাবনা। নানা উপায় বা কারণে কারও ভেতরের সম্ভাবনা বিকশিত হয়, কারওটা প্রতিক‚লতার মুখে বাধাপ্রাপ্ত হয়, ব্যাহত হয়। শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে কি হতেন সে আলোচনা এখন অর্থহীন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাগান শোভিত করে যে পুষ্প কলি মেলেছিলো, তা প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই একদল পাষÐ সব তছনছ করে দিলো। ফুলটি ফুটতে পারলো না। সৌরভ ছড়াতে পারলো না। শেখ রাসেলের জন্মগ্রহণের সময়টি বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইতিহাসের জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ কাল। বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন ৪০। তিনি তখন রাজনৈতিক মঞ্চে আরোহণের জন্য একটির পর একটি সিঁড়ি ভাঙছেন। তার সময়ের অন্যসব বাঙালি নেতাদের আপোসকামিতা-ভীরুতার বিপরীতে তিনি এক আপোসহীন সাহসী মানুষ হিসেবে জনগণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছেন। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু তাকে পরাভ‚ত করতে পারছে না। রাসেলের জন্মের পরের বছরগুলোই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত উত্থানপর্ব। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, পরের বছর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, কারামুক্তি, বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভ‚ষিত, ১৯৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক গণরায় লাভ এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। এই তোলপাড় করা সময়েই শিশু রাসেলের হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে ওঠা। পিতার স্নেহ-সান্নিধ্য তেমন না পেলেও পিতার জনগণঅধিনায়ক হয়ে ওঠা দেখেছে শিশু রাসেল। তার মানসগঠনে বিশেষ ভ‚মিকা রাখছিলো ওই টালমাটাল সময়কাল। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ায় রাসেল স্বাভাবিকভাবেই সবার চোখের মণি হয়ে উঠেছিলো। তাকে নিয়ে ভাইবোনদেরও আদিখ্যেতার শেষ ছিলো না। অতি আদরে বখে না গিয়ে রাসেল কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত এবং একজন চৌকস শিশু হিসেবেই বেড়ে উঠছিলো। অন্য ছেলেমেয়েরা বাবার আদর-ভালোবাসা যতোটুকু পায়নি, রাসেল সেটা পেতে শুরু করেছিলো। বঙ্গবন্ধু সরকারপ্রধান হওয়ার পরও শিশু রাসেল তার সঙ্গলাভ থেকে বঞ্চিত হয়নি। দেশে কিংবা দেশের বাইরে বঙ্গবন্ধু রাসেলকে সঙ্গী করে আনন্দ পেতেন। এই ছোট ছেলেটিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মনে এবং চোখে ছিলো অন্য রকম স্বপ্ন-কল্পনা। রাসেলকে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু হায়েনার দল তার স্বপ্ন পূরণ করতে দিলো না। ঘাতকরা সপরিবারে মুজিব পরিবারকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। এই নৃশংস হত্যাকাÐের বিচারের পথও আইন করে বন্ধ করা হয়েছিলো। ঘাতকদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিলো। হত্যা, শিশু ও নারী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার পরও যাদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি, তারা একটা সময় পর্যন্ত সদম্ভে আস্ফালন করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। রাসেলের বড় বোন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে পঁচাত্তরের খুনিদের বিচারের আওতায় এনেছেন। শিশুদের সুরক্ষা দেয়া যে রাষ্ট্রের কর্তব্য সেটা প্রতিষ্ঠিত করার পথে দেশ অগ্রসর হচ্ছে। রাসেলের জন্ম হয়েছিলো বড় বোন শেখ হাসিনার ঘরেই। রাসেল পৃথিবীর আলো দেখার সময় সম্ভবত আগে দেখেছিলো ‘হাসু আপু’র মুখ। শেখ হাসিনার আদর-স্নেহেই বড় হয়ে উঠছিলো রাসেল। এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, রাসেল হয়ে উঠেছিলো শেখ হাসিনার ‘কলিজার টুকরা’। এই ভাইটিকে হারানোর দুঃসহ বেদনা যে ভোলার নয়! এই দুঃখভার বুকে নিয়ে, উদ্গত কান্না চেপে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাকে। আজ যারা বিচারহীনতার কথা বলে, যারা আইনের শাসন নিয়ে কুম্ভীরাশ্রæ বর্ষণ করে তারা কিন্তু রাসেল হত্যার বিচার বন্ধের বিরুদ্ধে টুঁশব্দ করেননি। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে হত্যার পর অপরাধীদের দায়মুক্তি দেয়ার যে অপসংস্কৃতি দেশে চালু হয়েছিলো তা থেকে বেরিয়ে আসার ধারা শুরু হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আর অসহিষ্ণুতা নয়, আর অপরাধীদের প্রশ্রয় বা দায়মুক্তি নয়। বাংলাদেশ হোক সব শিশুর, সব মানুষের নিরাপদ বাসভ‚মি। লেখক : গ্রæপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]