• প্রচ্ছদ » » ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়া যাচ্ছে না


ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়া যাচ্ছে না

আমাদের নতুন সময় : 19/10/2019

কামরুল হাসান মামুন : ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়া যাচ্ছে না। এটা অনেকটা পৈতৃক জমিদারি ব্যবস্থার মতো। জমিদারি চলে গেছে, কিন্তু সন্তানদের কেবলই দাদা, দাদার বাবা আর তার বাবার গল্প শুনিয়ে বড় করে। ফলে জমিদারি নেই, কিন্তু জমিদারির ভাব নিয়ে বড় হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের মাঝে এভাবে ঢুকিয়ে দিয়ে বড় করি। ফলে তারা বড় হয় বাস্তবতাবিবর্জিত হয়ে। আমরা আমাদের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সাংঘাতিকভাবে ড়নংবংংবফ।
দেশে আসলে যেমন জমিদারিত্ব নেই, তেমনি ছাত্ররাজনীতি বলতেও কিছু নেই। এখনকার ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতির নামে যা করছে তাকে বলা যায় অপরাজনীতি। আমাদের ছাত্ররা আসলে কি কখনো ছাত্রদের রাজনীতি করেছে বা করেছিলো? স্বাধীনতার আগে ছাত্রদের জন্য রাজনীতি করেনি সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু স্বাধীনতার পরে কি কখনো ছাত্রদের সুখ, দুঃখ, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কি কখনো রাজনীতি করেছে? আমাদের ছাত্ররা ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কতো আশা, কতো স্বপ্ন যে পড়ালেখা করে অনেক বড় বিজ্ঞানী হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডাক্তার, রাজনীতিবিদ হবে। অন্যসব বাদ দিলাম এই ছাত্ররাজনীতি করে গত ২০-৩০ বছরে একজন ভালো রাজনীতিবিদ হয়েছে? রাজনীতি করবে রাজনীতিবিদরা।
ছাত্ররা পড়পঁৎৎরপঁষধৎ বা বীঃৎধপঁৎৎরপঁষধৎ ধপঃরারঃরবং হিসেবে লিডারশিপ শিখবে। সেটা কি জাতীয় রাজনীতি করে হতে হবে? তারা স্বাধীন সংগঠন করবে। সেটা হতে আবৃত্তির সংগঠন, নাটকের সংগঠন, দেয়ালিকার সংগঠন, বিতর্কের সংগঠন অথবা প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগে মানুষকে সাহায্য করার জন্য ভলান্টিয়ার সংগঠন ইত্যাদি। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন এমআইটি হার্ভার্ড প্রিন্সটন, কেমব্রিজ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ভর্তির সময় এসব গুণ পরখ করে দেখে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তারা লিডারশিপও শিখে। তাই তো এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অনেকেই বিশ্বের অনেক দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদ, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী ইত্যাদি হয়েছে। বেশি দূরে যাওয়া লাগবে না রাজীব গান্ধী, বেনজির ভুট্টো এমনকি বর্তমান পাকিস্তনের প্রধানমন্ত্রীও অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট। ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কি আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির মতো রাজনীতি আছে? এই তো মাত্র কিছুদিন ব্রিটেনের লেবার পার্টি জানিয়েছে তারা ৪০ বছরের পুরনো তাদের ছাত্র উইং আর রাখবে না। ব্রিটেনে একমাত্র লেবার পার্টির ছাত্র সংগঠনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি অ্যাক্টিভ। তারপরও তারা তাদের মূল দল দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন রাজনীতি করে। ছাত্র সংগঠনের নেতা কারা হবে সেটা মূল দলের নেতারা ঠিক করে দেয় না।
আমাদের ছাত্ররাজনীতি একেবারেই ছাত্রকেন্দ্রিক নয়। যদি হতো তাহলে হলে হলে কিভাবে টর্চার সেল হয়? যদি থাকতো হলে হলে কিভাবে গণরুম হয়? যদি থাকতো সরকার কি করে পারতো জিডিপির মাত্র ২.১ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিতে? যদি সত্যি সত্যি ছাত্ররাজনীতি থাকতো তাহলে কিভাবে হলে হলে এবং ক্যাম্পাসে প্রায় সম্পূর্ণ একদলীয় ব্যবস্থা চালু থাকে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হওয়া উচিত পাঁচ তারকা হোটেল বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন যেখানে সব ধর্মের সব দেশের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে চলবে। মতপ্রকাশের এক অনন্য জায়গা হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে প্রশ্ন করবে, ভিন্নমত প্রকাশ করবে মাথা উঁচু করে। আছে কি এই অবস্থা? আমি তো এই ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে।
আমাদের ধারী বুড়োদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। এজন্য একটি জাতীয় সমঝোতা দরকার। এভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পোটেনশিয়াল মেধার গণহত্যা আর দেখতে চাই না। ছাত্রদের ছাত্রের মতো চলতে দিন। আবাসিক হলের সুযোগ-সুবিধা বাড়ান যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা একটি সুস্থ স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হতে পারে। স্বার্থপরের মতো তাদের ব্যবহার করবেন না। তারা কচি, তারা অবুঝ। এখন যারা ছাত্ররাজনীতি করে তাদের পড়াশোনার কি অবস্থা একটু সার্ভে করে দেখুন তো। অধিকাংশ নেতাই স্পেশাল, স্পেশালের স্পেশাল দিয়েও পাস করতে পারে না। তারা তো এমন ছিলো না। তারা তো ভালো ছাত্র হিসেবেই ভর্তি হয়েছিলো। তাহলে যেই রাজনীতি তাদের এমন বানায় সেই রাজনীতি কেন রাখতে হবে আমার বলদ মন সেটা বোঝে না।
আমার এক ছাত্রী এখন এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেখানে এক ছাত্রনেতা তাকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেয়ার জন্য প্রথমে অনুরোধ এরপর চাপ তারপর হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। তারপরও তার কথা না শোনায় এখন সে ভিসি ডিনকে দিয়েও সামান্য এই প্রভাষককে চাপ দিতে থাকে। কারণ ওই ছাত্রনেতা ক্ষমতাসীন দলের নেতা। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের শিক্ষক নেতা আর ছাত্রনেতারা মিলে কি এক নেক্সাস বা মাফিয়াতন্ত্র চালু করেছে। সে আমার কাছে জানতে চায় তার এখন কি করা উচিত? নীতিনৈতিকতা নিয়ে চলতে চাইলে চাকরি ছাড়তে হবে আর না হলে নীতিনৈতিকতা ছাড়তে হবে, উত্তর দিতে পারিনি। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]