• প্রচ্ছদ » » আবরার হত্যা : বেদনা কি বিবেক জাগাবে?


আবরার হত্যা : বেদনা কি বিবেক জাগাবে?

আমাদের নতুন সময় : 21/10/2019

রাজেকুজ্জামান রতন

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফাহাদ আবরারের মৃত্যু এবং নৃশংস হত্যা কাঁপিয়ে দিলো দেশের সাধারণ মানুষের মানবিক বোধকে। দশ হাজার ছাত্রের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হল নামের ছাত্রাবাসে পাঁচ শতাধিক ছাত্রের বাস। সেখানে ৬-৭ ঘণ্টা ধরে পেটানো হয়েছিলো আবরারকে। কি ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। যারা মারছিলো তারা মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে কেউ কেউ বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে, শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ক্যান্টিনে গিয়ে খেয়ে এসেছে, তারপর আবার পিটিয়েছে। ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে একজন নাকি দেড় ঘণ্টা ধরে পিটিয়েছে, মারতে মারতে ঘেমে গিয়েছে। কিন্তু মারলেই তো হবে না, মানুষের মার সহ্য করার তো একটা সীমা আছে। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে আবরার বলেছিলো, ‘ভাই, ভাইগো, আমার খুব খারাপ লাগছে’। এর পর সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর তাকে নামিয়ে এনে রাখা হলো সিঁড়ির গোড়ায়। যারা পিটিয়েছে তাদের একজন মোটরসাইকেল চালিয়ে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনলো। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন আবরার বেঁচে নেই। মৃত্যুর কথা শুনে যারা পিটিয়েছে তাদের একজন রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। এসব বর্ণনা প্রায় সব পত্রিকায় লেখা হয়েছে। পত্রিকায় গত ক’দিন ধরে এই বিষয়ে বিস্তৃত লেখা পড়ে কারও পক্ষে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার উপায় কি আছে? তাই সারাদেশে মানুষের মধ্যে এক আবেগময় উৎকণ্ঠা, বেদনাময় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, কি হচ্ছে আমাদের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? কি মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে অথবা বড় হচ্ছে আমাদের মেধাবী ছাত্ররা? মেধার সঙ্গে মানবিকতা কি মিলছে না? শিক্ষার সঙ্গে সম্মেলন ঘটছে না কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষক ও ছাত্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না? উচ্চতর শিক্ষা শুধু উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করবে, নৈতিক মান ও গণতান্ত্রিক দায়সম্পন্ন মানুষ কি তৈরি হবে না এখানে? আমাদের জীবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হত্যাকাÐ তো আর কম দেখা হলো না।
এ দেখার শুরু কবে থেকে আর শেষ কোথায় তা বলতে গেলে একমত হওয়ার উপায় নেই। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৃশংস হত্যাকাÐ দেখতে দেখতে আমরা কি মানবিক বোধগুলো হারিয়ে ফেলছি? বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের লাশ পড়ে, রক্তাক্ত হয় সবুজ ক্যাম্পাস, কিন্তু ধরা পড়ে না কেউ, শাস্তি পাওয়ার নজির নেই কারও। আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত খুন হয়েছে ৫৪ জন, যার মধ্যে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেছে ৩৯ জন। এক হিসেবে দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুন হয়েছে ১৫১ জন ছাত্র। এদের মধ্যে সংখ্যার বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জনের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৯৪ সালে বুয়েট ক্যাম্পাসে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কর্মী আহমেদকে দিনের বেলা খুন করে গিয়েছিলো কারা তা আজও জানতে পারা যায়নি। সাবেকুন নাহার সনি হত্যাকাÐ ব্যথিত করেছিলো সকলকেই, কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হয়নি আজও সেই ঘটনার। বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের বোধহীন করে ফেলছে ক্রমাগত। কিন্তু আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া মানবিকবোধগুলোও মাঝে মাঝে চমকে উঠে হত্যা প্রক্রিয়ার নৃশংসতা ও ভয়াবহতা দেখে। আবরার হত্যা যেন সেই ধরনের একটি আঘাত প্রশ্ন হতে পারে, এই আঘাত কি আমাদের জাগিয়ে তুলবে নাকি অতীতের মতো বেদনার সাগরে আলোড়ন তুলে মিলিয়ে যাবে? খুনিদের শাস্তি দেয়ার জনপ্রিয় দাবির আড়ালে কৌশলে ছাত্র সমাজের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেয়ার সুচতুর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটবে কি? সব হত্যাকাÐ বেদনার, তবে সব হত্যা সমান বিক্ষোভের জন্ম দেয় না। আবরারের হত্যাকাÐ শুধু বুয়েটের ছাত্রদেরই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে তাই নয়, সারাদেশে প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছে। আবরারের মৃত্যু ভাবিয়ে তুলেছে সকলকেই। হত্যার সঙ্গে জড়িত যে বিশজন গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের কথা ভাবলে তো আতঙ্কিত হতে হয়। কীভাবে আমাদের দেশের মেধাবী বলে স্বীকৃত যে ছাত্ররা তাদের কারও কারও মধ্যে খুনি মানসিকতার জন্ম নিয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। গ্রেপ্তারকৃত ছাত্ররা যেসব জবানবন্দি দিয়েছে এবং তার যতোটুকু পত্রিকায় এসেছে তাতে হত্যার মোটিভ খুঁজে বের করা যাবে। কিন্তু শুধু হত্যার মোটিভ বের করা এবং শাস্তি দেয়ার কাজে না লাগিয়ে ছাত্র যুবকদের মনস্তাত্তি¡ক গড়ন বোঝা এবং ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে নির্যাতন ও হত্যা খুনের কি সম্পর্ক তা জানার জন্য এসব হত্যার কারণ উদ্ঘাটন করা জরুরি। কেন দরিদ্র পরিবারের একজন মেধাবী ছাত্র এসএসসি, এইচ এস সিতে এতো ভালো ফলাফল করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নির্যাতনকারীতে পরিণত হলো? সে ঢাকায় এসেছিলো যখন তখন তার পেছনে ছিলো বাবা-মায়ের মুখ আর সামনে ছিলো তার নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। কে বা কোন প্রক্রিয়া তাকে এই পথে টেনে আনলো? দেশের মানুষের কতো আশা সে কথা ভাবতে বা বুঝতে একটা দৃষ্টিভঙ্গি লাগে। মেনে নিলাম সেই পথে ছাত্রদের একটা বড় অংশ হাঁটছে না, কিন্তু পরিবারের আশা পূরণ করতে চাইলেও তো নিজেদের জীবনে শৃঙ্খলা আনতে বা রাখতে হয়। সেটাও অনেকে ভুলে যায় কেন? কী শিখবে বিশ্ববিদ্যালয়ে? এখন প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে টর্চার সেল ছিলো, হলের গেস্ট রুমগুলোতে ম্যানার শেখানোর নামে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নির্যাতন করা হতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটা বড় ভাই সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠার কথা সেগুলো মাথা নিচু করে চলা শেখানোর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে মর্যাদা নিয়ে চলা শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা। তারাও উপরের ভাইস চ্যান্সেলর আর নিচে বড় ভাইদের দাপটে নিজের সম্মান নিজে রক্ষা করে চলার পথ অনুসরণ করছেন। ভাইস চ্যান্সেলর এখন আর আদর্শ শিক্ষাবিদের প্রতিমূর্তি নন। আনুগত্য, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতি সীমাহীন স্নেহ এবং ছাত্র স্বার্থের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার ক্ষমতা যে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার প্রধান যোগ্যতা তা প্রমাণিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলররা শ্রদ্ধার পরিবর্তে মুখরোচক আলোচনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এতে শুধু শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে তাই নয়, সাংস্কৃতিক মানেরও অধঃপতন ঘটেছে। বাংলাদেশে এখন ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আরও ৪টি অনুমোদন পেয়েছে, যেগুলোতে ২/১ বছরের মধ্যেই ক্লাস শুরু হবে। এতো সব ছাত্র সংসদ তো পরের কথা, শিক্ষা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত হয় তা কি আমরা কেউ বলতে পারি? কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করা একজন ছাত্রের জন্য মানুষ হিসেবে সুসমন্বিত বিকাশের কি কি আয়োজন আছে সমাজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে? বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র এবং পরমত সহিষ্ণুতার চর্চা না শিখলে আর কোথায় শিখবে তা? ঈষৎ সংক্ষেপিত। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]