• প্রচ্ছদ » » শিক্ষকদের মানুষ কেন এখন সম্মান করবে?


শিক্ষকদের মানুষ কেন এখন সম্মান করবে?

আমাদের নতুন সময় : 21/10/2019

কামরুল হাসান মামুন : সব প্রফেশন এক নয়। প্রত্যেক প্রফেশনের কিছু আলাদা মাত্রা আছে। এই মাত্রা জ্ঞান কি আমাদের এখন আছে? আমার বাবা ছিলেন দেওয়ানি আদালতের ষধুিবৎ। দেওয়ানি আদালত থানা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ থানা কিংবা উপজেলাতেই ছিলো। বাজিতপুর উপজেলার মুনসেফ কোর্ট ১০০ বছরের বেশি পুরনো। একসময় ওই কোর্টে শতাধিক ষধুিবৎ ছিলেন যাদের মধ্যে কেবল একজন মুসলমান ছিলেন। আবার তিনিও ছিলেন কাদিয়ানী গোষ্ঠীর। অনেক প্রতিথযশা উকিল ছিলেন ওই কোর্টে। তাদের মধ্যে মনিন্দ্র রায় (নামটা ভুলও হতে পারে) নামে এক জাদরেল উকিল ছিলেন। যেকোনো বিষয়ের উপর অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারার সুখ্যাতি ছিলো। একবার এক ব্রিটিশ সিনিয়র জজ বাজিতপুরে পরিদর্শনে যান। ওখানে গিয়ে মনিন্দ্র উকিলের অনেক নামডাক শুনেন। কোর্টে পরিদর্শনে গিয়ে মনিন্দ্র উকিলকে ডাকলেন। সবার সামনে বললেন আপনি কি ‘জিরো’ অর্থাৎ শূন্যের উপর এক ঘণ্টা বলতে পারবেন। ওই ব্রিটিশকে তাক লাগিয়ে দিয়ে এক ঘণ্টার পরও না থামানো পর্যন্ত বলতে থাকেন আর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই শোনেন। একসময় আমাদের গ্রামে-গঞ্জেও এমন লোকজন ছিলো।
আমার স্কুল-কলেজ কেটেছে সেই উপজেলাতেই। কিন্তু আদালতের মুনসেফকে মানে বিচারককে কখনো রাস্তাঘাটে কিংবা বাজারে, চা-স্টলে বা কোনো আড্ডায় কোনোদিন দেখিনি। আমার বাবা বলতো তাদের সাধারণের সঙ্গে মিশতে নিষেধ আছে। তাদের যেন বাজার কিংবা অন্য কোনো কাজে বাইরে যেতে না হয় সেইজন্য মুন্সেফদের সব কিছু দেয়া হতো। এই নিয়মটা এসেছে ব্রিটিশদের কাছ থেকে। জানি না এখনো এ রকম আছে কিনা। তার কারণ বিচারকরা যদি সাধারণের সঙ্গে মিশে যান তাহলে বিচার কাজে রাগ-অনুরাগের প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রফেশনেই কিছু ‘ফড়ং ধহফ ফড়হ’ঃং’ আছে। শিক্ষকদেরও এ রকম কিছু অলিখিত হলেও ফড়ং ধহফ ফড়হ’ঃং ছিলো।
আমার বাজিতপুর কলেজের ইংরেজির এক শিক্ষক ছিলেন। যিনি এখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তিনি আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। দেখতে খুবই সুন্দর ছিলেন। শিক্ষক হিসেবেও অত্যন্ত ভালো এবং ব্যক্তিত্ববান ছিলেন। এখন জানতে পারি তার পরিবারের প্রায় সবাই আওয়ামীগ করে। সৈয়দ আশরাফদেরও আত্মীয় ছিলেন। পরিবারের অন্যরা আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা। কিন্তু চাকরি জীবনকালে বাজিতপুরের কেউ জানতেই পারেনি তার রাজনৈতিক আদর্শের কথা। কখনো কোথাও কোনো আড্ডায়, মিটিং-সমাবেশে যোগ দিতে দেখিনি। মাথা নিচু করে সবসময় কলেজে যেতেন আবার ফিরে আসতেন। অনেকের কাছে এসব কথা কাল্পনিক মনে হতে পারে। একই কথা সাজে ওই কলেজের অনেক শিক্ষকের ক্ষেত্রে। আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষককেও কেউ কোনোদিন রাস্তাঘাটে আড্ডা মারতে, চাস্টলে গল্প করতে কিংবা বাজার করতে দেখেছে বলে বলতে পারবে না। স্কুলের একজন শিক্ষককেই জানতাম রাজনীতি করতেন। তাও বাম দল। আর কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় আমরা ছাত্ররা অন্তত জানতাম না। আর এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব পর্যায়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয় ছাত্র থেকে শুরু করে সবাই জানে। শিক্ষকরা এখন এলাকার মেম্বার চেয়ারম্যানের বাসায় গিয়ে বসে থাকতেও শুনেছি। স্কুল-কলেজে এখন আর প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষের কোনো কমান্ড নেই। স্কুল-কলেজ চলে ম্যানেজমেন্টের নামে মেম্বার, চেয়ারম্যান ও এমপির নির্দেশে। সব ক্ষেত্রে রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়ে আমরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি। এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত অনর্গল সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে ক্যামোফ্লেজ কথা বলেন। শিক্ষকদের মানুষ কেন এখন সম্মান করবে? রাজনীতির নামে দলীয় অন্ধত্ববরণ করেন। শিক্ষকদের মানুষ কেন এখন সম্মান করবে? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]