ঝুলিতে অর্থনীতির নোবেল, ভাঁড়েতে মা ভবানী!

আমাদের নতুন সময় : 22/10/2019

কাকলী সাহা, কলকাতা : একুশ বছরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে অর্থনীতিতে দু-দুটি নোবেল অথচ উপমহাদেশে অর্থনীতির হাল বেহাল। ড. অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে এবং তার একুশ বছর পর ড. অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাঙালি তথা ভারতবর্ষের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, একথা বলতে নিশ্চয় কারো কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু যে ভারতবর্ষ একের পর এক কৃতী অর্থনীতিবিদ উপহার দিতে পারে, সেই ভারতবর্ষ তার হাঁড়ির হাল শামাল দিতে পারে না কেন? যে মুহূর্তে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল মিললো, তার সাথে সাথেই প্রায় সামনে এলো বিশ্বের ক্ষুধাসূচকে ভারতের স্থান আরো খানিকটা নেমে এসে মায়ানিমার, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেরও বেশ খানিকটা নিচে রয়েছে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ভারতের অর্থনীতির এই অধোগতির জন্য উদারনীতিকেই সরাসরি দায়ী করেছেন।
তবে উন্নয়ন কোন পথে হবে, তা নিয়ে একাধিক মত আছে। সারাপৃথিবীতেই এ-নিয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে, বেশ কিছুকাল ধরেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার গ্ল্যামার হারাচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, আর্থিক মন্দার কারণে সেখানে তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বহু মানুষের কর্মচ্যুতি ঘটেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বহু সংস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। বহু চেষ্টা করেও তাদের অর্থনীতিতে জোয়ার আসেনি। এতে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও উদারনীতির ওপর প্রশ্নচিহ্ন পড়েছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে ডঃ অমর্ত্য সেন পথ দেখিয়েছেন, কীভাবে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বঞ্চনা ও অসাম্য দূর করা সম্ভব। ড. ইউনুস দেখিয়েছেন ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভের দ্বারা দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি সাধন সম্ভব। আর সবশেষে ডঃ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে তার দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করার ওপরই সর্বাধিক জোর দিলেন।

দেশের দুই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদই তাদের গবেষণায় ভারতের অর্থনৈতিক অধোগতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এদেশের বেশিরভাগ মানুষের প্রতি নজর না দেওয়া। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্যই ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করে দিয়েছে। ডঃ অমর্ত্য সেনের মতে, সকলের অংশীদারিত্বসহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তা থেকে পাওয়া সংশোধনগুলোকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। আর এই ব্যাপারেই যে ভারতের ব্যর্থতাই যে সর্বাধিক, একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেননি। এ-ব্যাপারে তিনি মেয়েদের প্রয়োজনগুলোর দিকে নজর না দেওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি সামাজিক পরিষেবা যেমন-জল, বিদ্যুৎ, প্রয়োঃনিষ্কাশন, পরিবহন এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুত্ব আরোপের কথা বলেছেন। উদার অর্থনীতির ক্ষেত্রে অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগ এনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা গেছে, এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি। কারণ উদারনীতি আসলে সব মানুষের ভেতরকার বৈষম্য দূর করতে পারে না। মুষ্টিমেয় সচ্ছল বা আপাতসচ্ছল পরিবারের সমস্যা নিয়েই তাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। তাই ড. অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বেশিরভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজার অধোমুখী হয়েছে। বাজারঅর্থনীতির সবচেয়ে বঢ় অবক্ষয়ের সূত্রপাত এখান থেকেই। যে দেশের ৭০% মানুষ গ্রামে বসবাস করে, সেখানে তাদের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা না করে বাজার চাঙ্গা করার চেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। কেবল তাত্ত্বিক গবেষণা নয়, এমআইটির গবেষণাকেন্দ্রে ওঁরা যুগ্মভাবে ‘আব্দুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’ গড়ে তুলে ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বের দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেছেন।

এদেশের অর্থনীতির পরিচালনাপদ্ধতি নিয়েও তিনি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, যে প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতি ছিল, তাও কাজ করছে না, কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না, ব্যবসাজগতের মানুষরাও নয়! কিছু বললেই সরকারি দপ্তর বলছে, অপেক্ষা করুন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সাথে কথা বলছি। তারপর পিএমও ব্যস্ত সুতরাং কিছুই হচ্ছে না। প্রকারান্তরে ড. অমর্ত্য সেনের ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে যথাযথ মূল্য দেওয়ার বিষয়টি তিনিও স্বীকার করে নিয়েছেন। সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হলো, ব্যর্থতাগুলো ঢেকে রাখা নয়, সেগুলিকে সরকারি স্তরে নীতিগত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি দেশে ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনাগুলো নিয়ে জনপরিসরে স্পষ্টভাবে আলোচনা ও অনুধাবন করা প্রয়োজন। ভারতের ৭০% মানুষ যেখানে গ্রামে থাকে, সেখানে মুষ্টিমেয় জায়গায় ভূমিসংস্কার বা জমিবণ্টন সম্ভব হয়েছে। আর যেখানেও তা হয়েছে, সেখানে জমির প্রতি সুবিচার করা হয়নি বার হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থাৎ সেচ, বিদ্যুৎ, বীজÑএসব দিকে রাষ্ট্র নজর দেয় না, বিগত বছরগুলিতে বহু কৃষকের আত্মহত্যা তারই সাক্ষ্য বহন করে। শহরাঞ্চলেও কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও বেকারের সংখ্যা বেড়ে ওঠায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকছে। অথচ সরকার কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎ, পরিবহন প্রভৃতি জরুরি পরিষেবায় ক্রমাগত ভরতুকি হ্রাস করে উপমহাদেশের অর্থনীতিকে গভীর সঙ্কটের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের গুটিকয়েক পরিবারের হাতে অধিক সম্পদ গচ্ছিত হলে তাতে বাজারে কোনো সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তার ফলে সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই গবেষণালব্ধ বিষয়কে আত্মীকরণ করে দেশের মানুষের সত্যিকার বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব হয়, ততদিনে ভারতের ক্ষুধাসূচক কোত্থেকে কোথায় যায়, সেটাই এখন গভীর চিন্তার বিষয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]