ভারতে ৮৫ লাখ কোটি ডলারের স্বর্ণমজুদের সুবিধা নিয়ে অ্যাপভিত্তিক বন্ধকি ঋণের জমজমাট ব্যবসা

আমাদের নতুন সময় : 07/11/2019

নূর মাজিদ : ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে চান একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ভারতীয় নাগরিক বিজয় মাথুর। সেই খরচের হিসেবে ঘাটতি ছিলো প্রায় দুই লাখ ভারতীয় রুপি। সঞ্চিত স¤পদের মাঝে ছিলো স্ত্রীকে উপহার দেয়া কিছু স্বর্ণালংকার। সেটাই বন্ধক রেখে ঋণ নেন তিনি। তবে এজন্য তিনি কোনো জুয়েলারি বা সুদ ব্যবসায়ের দ্বারস্থ হননি। বরং এর পরিবর্তে ব্যবহার করেন একটি মোবাইল অ্যাপ। এরপরের গল্প খুবই সহজ। একঘণ্টার মাঝেই রূপেক ফিনটেক প্রাইভেট লিমিটেড নামক অনলাইন সোনা বন্ধকি ঋণ কো¤পানির এজেন্ট চলে আসেন তার মুম্বাইয়ের বাড়িতে। সেখানে তার পরিবারের সকল সদস্যের উপস্থিতিতেই একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ক¤িপউটার স্ক্যানার দিয়ে অলংকারের ব্যবহার করা সোনার মান যাচাই করেন ওই এজেন্ট। ওই তথ্য চলে যায় কো¤পানির সার্ভারে। সেখান থেকে নিশ্চিত করা হয় শ্রী মাথুর এসব অলংকারের বিপরীতে দুই লাখ রূপি ঋণ পেতে পারেন। নির্ধারণ করা হয় ঋণে সুদের হার এবং পরিশোধের সময়।
এখানে শুধু বন্ধকী ঋণের বিষয়টি জড়িত নয়। ছিলো পারিবারিক মর্যাদারও বিষয়। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণেই ভারতের নাগরিকরা পারিবারিকভাবে স্বর্ণ সঞ্চয় করে থাকেন। কিন্তু, এই স¤পদের বন্ধকিতে প্রচলিত উৎসগুলো ঠিক বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ব্যবসা করে না। পাশাপাশি বন্ধক রাখতে গিয়ে জানাজানি হওয়ার সম্ভাবনায় সামাজিকভাবেও বিব্রত হতে পারতেন মাথুর। এসব ঝামেলা থেকে তাকে সহজেই মুক্তি দিয়েছে রূপেক ফিনটেক। এজেন্টের উপস্থিতিতেই তার ব্যাংক একাউন্টে ট্রান্সফার করা হয় ঋণের অর্থ। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরেই গহনাসহ মোটরসাইকেলে করে ফেডারেল ব্যাংক নামুক রূপেকের বাণিজ্যিক অংশীদার একটি ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ওই এজেন্ট। এসময় কো¤পানির সার্ভার থেকে সার্বক্ষণিকভাবে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকে অলংকারগুলো ঠিকঠাক জমা পড়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয় এভাবেই। অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত এই লেনদেন ইতোমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ভারতে। পাশাপাশি দেখাচ্ছে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের ক্ষেত্র।
ভারতীয় গ্রামীণ মধ্যবিত্ত এবং শহুরে মধ্যবিত্তদের মাঝে সোনা ক্রয়ের সঞ্চিত আয় সংরক্ষণের প্রবণতা হাজার বছরের প্রাচীন প্রথা। বিয়ে ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে এসব অলংকার প্রদর্শনের বাহার নারীদের মাঝে ঠিকই লক্ষ্য করা যায়। এরপরে বিপদের দিনে স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখাও যায়। তবে সেখানে আছে গৃহীত ঋণে ৪৮ শতাংশের মতো উচ্চসুদ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রদত্ত ঋণের ২৫-৩০ শতাংশই নগদ কেটে নেন সুদ ব্যবসায়ী মহাজন শ্রেণি। এই বিষয়ে রুপেকের প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নির্বাহী সুমিত মানিয়ার বলেন, প্রচলিত বন্ধকি ঋণ শিল্প অসাধু ব্যবসায়িক চর্চার জন্য অনেকদিন আগেই মানুষের মাঝে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। নেহাত বাধ্য না হলে এবং বিকল্প কোনো উপায় না পেয়েই মানুষ এখনো তাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে যান। সেই তুলনায় অংশীদার ব্যাংকের গ্যারান্টি, সহজ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের সুযোগ এবং প্রদত্ত ঋণে সাড়ে ১০ দশমিক ৬ থেকে ২০ শতাংশ সুদের বিষয়টিও মানুষের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এমনকি এখন বন্ধকীতে আগ্রহী ভোক্তাচাহিদা সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে রূপেক। সিলিকন ভ্যালির সিকিওইয়া ক্যাপিটাল এবং এক্সেল এর মতো ফাইন্যান্সিয়াল টেক কো¤পানির সহযোগিতায় ইতোমধ্যেই তাদের ব্যবসা বার্ষিক দেড় কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
তবে এখনও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েই গেছে। এই বিষয়ে মানিয়ার বলেন, বর্তমানে বিশ্বে স্বর্ণের দর ১৮ শতাংশ বেড়েছে। আর ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের অতি সাম্প্রতিক হিসেবেই ভারতে ব্যক্তি ও বেসরকারি পর্যায়ে আছে ২৫ হাজার টন মূল্যবান ধাতুটির সঞ্চয়। যার বর্তমান বাজারমূল্য এখন ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এটা মার্কিন সরকারের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের মজুদ ফোর্টনক্সের মজুদের চাইতে কয়েকগুণ বেশি। তবে এই স¤পদে তারল্য আনার প্রচলিত জটিলতা একে সামগ্রিক অর্থনীতির ঘাড়ে এক বোঝা বানিয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ের স্বর্ণের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের বিপরীতে গৃহীত ঋণ, ভারতের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ হারে বাড়াতে পারে। এমনকি ২০২৫ সাল নাগাদ ৫ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি হওয়ার ভারত সরকারের লক্ষ্যপূরণেও মহাশক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে অ্যাপভিত্তিক বন্ধকি ঋণের এই ব্যবসা। সম্পাদনা : রমাপ্রসাদ বাবু




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]