• প্রচ্ছদ » » পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির ইতিহাস রচনা এখনই শুরু করা দরকার


পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির ইতিহাস রচনা এখনই শুরু করা দরকার

আমাদের নতুন সময় : 11/11/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী  : ভয়াবহ পঁচাত্তরের হত্যাকা- শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেনি বাংলাদেশকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পশ্চাৎমুখী করেছে। প্রতিবছর আমরা পঁচাত্তরের এসব হত্যাকা- নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি ও আলোচনা করি। এর হয়তো কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়ে। মানুষ সেসময়ের ভয়াবহ হত্যাকা-ের নানাদিক সম্পর্কে কমবেশি জানার সুযোগ পায়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত লেখা এবং আলোচনা ঘুরেফিরে একই জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। এটি খুববেশি গভীরে গিয়ে জানা ও বোঝার সুযোগ দেয় না। তাছাড়া গণমাধ্যমের কাজ তাকে মূলতই ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। তবে এর অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান, উপস্থাপন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ যাবতীয় বিষয়টি করতে হয় গবেষকদের, ইতিহাসবেত্তা, রাজনীতি বিজ্ঞানসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অথরিটিসম্পন্ন ব্যক্তিদের। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বরের অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, জেল হত্যা, ৭ নভেম্বর ক্ষমতা দখল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারা থেকে সরিয়ে নেয়ার সামগ্রিক বিষয়টি এখনো পর্যন্ত যথাযথভাবে গবেষণা করা হয়নি। যদিও এই সময়ের নানা ঘটনা নিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলো অবশ্যই গবেষণার জন্য মূল্যবান সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে।

কিন্তু এসব গ্রন্থ নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন থাকতে পারে। সেসব প্রশ্নের অধিকতরও তথ্যনির্ভর উত্তর খোঁজা সত্যাসত্য যাচাই করা ইত্যাদি বিষয়গুলো গবেষকদের আরাধ্য কাজ। কিন্তু সেই কাজটি এখনো আমাদের দেশে শুরুই করা যায়নি। দীর্ঘ সময় ছিলো ১৯৭৫ সালের হত্যাকা- নিয়ে দেশে গণমাধ্যমেও তেমন লেখালেখি করা যেতো না, গবেষণা করার জন্য তথ্য-উপাত্ত, সরকারি দলিলপত্র সংগ্রহ করা অনেকটাই নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৮ পরবর্তী সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যা, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, ষড়যন্ত্রের নানা নীলনকশা, ৩ নভেম্বরের জেলা হত্যা, খালেদ মোশারফের অপরিকল্পিত অভ্যুত্থান, ৭ নভেম্বরের জাসদ জিয়ার ক্ষমতা আরোহণ, জাসদ নিক্ষেপণ ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা এবং লেখালেখি দেশে চলছে। তবে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি সরকারের সময় এসব বিষয়ে লেখালেখি নিষিদ্ধ ছিলো। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিএনপিসহ ১৯৭৫ সালের হত্যাকা-ে সুবিধাভোগীরা অধিষ্ঠিত হলে আবারও এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে লেখালেখি, গবেষণা, বইপুস্তক রচনা কতোটা করা যাবে তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। অথবা লেখা হলেও ভুল এবং বিকৃত ইতিহাস রচনার জন্য সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও সহযোগিতা বিপুলভাবে প্রসারিত হতে পারে। সেটি ঘটলে বিকৃত ইতিহাসের ছড়াছড়িতে পরবর্তী প্রজন্ম ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ হত্যাকা-ের প্রকৃত ইতিহাস কতোটা উদ্ধার করতে পারবে, লেখালেখি ও গবেষণা করতে পারবে সেটি একটি মস্তবড় প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতায় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইতিহাসের অনেক তথ্য-উপাত্ত মানুষের জানার সুযোগ হয়েছে। পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার হয়েছে তবে হত্যাকা-ের নেপথ্য শক্তির বিষয়াদি উদ্ঘাটিত হয়নি। একইভাবে জেলহত্যার মামলা হয়েছে, রায়ও একটি হয়েছে, কিন্তু এখনো এসব হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। ৭ নভেম্বর নিয়ে জাসদ এবং বিএনপির মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার কারণে তারাই এর সুবিধা ও কৃতিত্ব নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে। এটি মোটেও জাতীয় ইতিহাসের এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে চলতে দেয়া যায় না। সে কারণে দাবি উঠেছে ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার এবং নিকটজনদের হত্যা এবং ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকা- নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অনুসন্ধান কমিশন গঠন করা। সরকারের দিক থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও কখন এটি করা হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময় এখনো জানা যায়নি। তবে এমন একটি কমিশন কাজ করলে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে পঁচাত্তরের হত্যাকা- ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধারায় রাষ্ট্র পরিচালিত করার নানা ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত, দলিলপত্র সংবলিত প্রতিবেদন পাওয়া যেতো যার উপর ভিত্তি করে ইতিহাসবেত্তারা এই পর্বের সঠিক ইতিহাস গবেষণায় ও রচনায় হাত দিতে পারতো। ব্যক্তি পর্যায়ে এমন বিশাল কাজ করা মোটেও সম্ভব নয়।

আমাদের ধারণা পঁচাত্তরের হত্যাকা-ের সঙ্গে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জড়িত ছিলেন অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন অথবা খুব কাছ থেকে বিষয়গুলো দেখেছেন তাদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই। যারা জীবিত আছেন তাদের অনেকেই হয়তো এসব বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত দানে এখন অনেক বেশি উদারভাবে এগিয়ে আসবেন। সরকারের বিভিন্ন বাহিনী এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে যেসব দলিল দস্তাবেজ তথ্য-উপাত্ত চাপা পড়ে আছে সেসব তথ্যাদি এখন সরকারের আনুকূল্যে অনেক বেশি সহজে উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। সে কারণে সরকারকে এখনি উদ্যোগ নিতে হবে, পঁচাত্তরের ঘটনাবলি দলিলপত্রাদি যথাসম্ভব গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া এবং সরকারি অর্থানুকূল্যে অথবা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ও লোকবলের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের ধারা পঁচাত্তরের ইতিহাস নির্মহভাবে তুলে আনার দায়িত্ব প্রদান করা। এটি এখনি শুরু করা দরকার।

অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বা ভুক্তভোগী অথবা অংশগ্রহণকারীর বেঁচে থাকার কারণে মৌলিক কিছু তথ্য-উপাত্ত বের হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে যা তাদের মৃত্যুর পর পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেকারণে যতো বেশি বিলম্ব হবে ততো বেশি তথ্য-উপাত্ত থেকে আমরা বঞ্চিত হতে পারি। সেক্ষেত্রে পঁচাত্তরের প্রকৃত ইতিহাস রচনা ভবিষ্যতে অপূর্ণই থেকে যেতে পারে। সেকারণে সরকারের উচিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে, ইউজিসি, বাংলা একাডেমিক, এশিয়াটিক সোসাইটিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই পর্বের ইতিহাস গবেষণা ও রচনার সুযোগ করে দেয়া। তাহলে নিকট ভবিষ্যতে জাতীয় ইতিহাসের এই পর্বটি অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ হবে, রাজনৈতিকভাবে অসংখ্য বিতর্কের অবসান করবে, স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি করার সুযোগ করে দেবে। এই কাজটি এখনই আমাদের করা দরকার। লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]