• প্রচ্ছদ » শেষ পাতা » বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে মন্ত্রণালয় ও পিডিবির হিসারে পার্থক্য


বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে মন্ত্রণালয় ও পিডিবির হিসারে পার্থক্য

আমাদের নতুন সময় : 14/11/2019

 

বিশেষ প্রতিনিধি : বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নিয়ে মন্ত্রণালয় আর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিপরিতমুখী অবস্থান ভিন্ন। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এজন্য চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরে উৎপাদন খাতে ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দাম না বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ কমেছে। বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেছেন, আগে বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি গড় উৎপাদন খরচ ছিল ৬ টাকা ১৬ পয়সা। এখন যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৬৪ পয়সা। সঙ্গত কারণে বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। একই তথ্য জাতীয় সংসদে দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তবে পিডিবির হিসেবে গড় ব্যয় ৬ টাকা পাঁচ পয়সা। এতে সচিব আর পিডিবির মধ্যে ৫৯ পয়সার ব্যবধান লক্ষ করা যাচ্ছে। আর সচিবের দাবি অনুযায়ি, গড় উৎপাদন ব্যয় কম হলে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। বা সরকার থেকে বাড়তি ভর্তূকিও নিতে হবে না। কারণ পিডিবির আগের হিসেবে গড়ে প্রতি ইউনিটের জন্য ব্যয় হতো ৫ টাকা ৮৩ পয়সা। মন্ত্রী-সচিবের তথ্য অনুযায়ি তা এখন ৫ টাকা ৬৪ পয়সা গড় ব্যয় হলে ১৯ পয়সা সাশ্রয় হচ্ছে।

রেন্টাল আর কুইক রেন্টালসহ বিভিন্ন ব্যয় বহুল প্রকল্প চালু রাখার পরও এক সেমিনারে বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বললেন, ‘বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনও নেতিবাচক প্রভাব এই খাতে পড়েনি। তাই বিদ্যুতের অতিরিক্ত উৎপাদনে সমালোচনা না করে ধন্যবাদ দিন।’
এদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কি পরিমাণ খরচ বেড়েছে এবং এই বাড়তি খরচ সমম্বয় করতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না সরকার ভর্তূকি দিবে তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাওয়ার সেল সূত্রে জানা গেছে, ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস দিয়ে। তাই গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণ থেকেই নিতে হবে। তাছাড়া গত ১ জুলাই গ্যাসের দাম বাড়ার আগেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেয়া ছিল। আর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য পিডিবি নতুন করে প্রস্তাব দিয়েছে। এটাকে সমন্বয় করতে হবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাড়তি ভর্তুকি চাইবে পিডিবি। সরকার এ খাতে বাড়তি অর্থ দিতে সম্মত না হলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলারিটি কমিশনে (বিইআরসি) দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। আগামী ২৮ নভেম্বর থেকে শুরু হবে তা নিয়ে গণশুনানি।
বিতরণকারী বা খুচরা বিক্রেতা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডেসকো, ডিপিডিসি, ওজোপাডিকো ও নেসকো দাম বাড়ানোর আবেদন করলেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাইকারি দাম না বাড়লে তাদের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না।

পিডিবির হিসাবে আরইবি ৪৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এছাড়া পিডিবি ১৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ডিপিডিসি ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ডেসকো ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, নেসকো ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ওজোপাডিকো ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে।
গত ১ জুলাই বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে পিডিবি। এতে বলা হয়েছে, চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছর বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গড়ে ১২৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করবে পেট্রোবাংলা। তবে চাহিদা অনুপাতে তা ১১০ থেকে ১৪৫ কোটি ঘনফুটে উঠানামা করতে পারে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি-সংক্রান্ত ঘোষণায় এ বিষয়ক নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। আর বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৯ হাজার ৪৮৭ মেগাওয়াট। এতে চলতি অর্থবছর গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে প্রায় ৫ হাজার ৩৪৪ কোটি কিলোওয়াট ঘন্টা। গ্যাস ছাড়াও ফার্নেস অয়েল, ডিজেল, কয়লা, হাইড্রো, নবায়নযোগ্য উৎস ও আমদানি মিলিয়ে চলতি অর্থবছর প্রায় ৭ হাজার ২০৫ কোটি ৫০ লাখ কিলোওয়াট ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে পিডিবি। আর বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি (বাল্ক) বিদ্যুৎ মূল্য হার প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। এতে সংস্থাটির আয় হবে ৩৪ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। গ্যাসের দাম বাড়ার আগে নিজস্ব কেন্দ্রে উৎপাদন ও বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির ব্যয় হতো গড়ে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা। গ্যাসের দাম বাড়ানো না হলে চলতি অর্থবছর বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির মোট ব্যয় হতো ৪২ হাজার ৮ কোটি টাকা। এতে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়াত ৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা।

তবে গত ১ জুলাই গ্যাসের দাম বাড়ানোয় নতুন অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির গড়ে ব্যয় পড়বে ৬ টাকা পাঁচ পয়সা। নতুন অর্থবছর বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবিকে মোট ব্যয় করতে হবে ৪৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এ সংস্থাটির লোকসান বেড়ে দাঁড়াবে ৮ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্যাসের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির লোকসান বেড়ে যাবে প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।
তথ্যমতে, উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় গত নয় বছর ধরে বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে পিডিবিকে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি মেটাতে ভর্তুকি দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য ও উৎপাদন ব্যয়ের যে পার্থক্য থাকছে তা পিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। গত অর্থবছরও প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও একই প্রক্রিয়ায় ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য হার ৪ টাকা ৮৪ পয়সা এবং গড় খুচরা মূল্য হার ৬ টাকা ৮৫ পয়সা। তবে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি পুরো তুলে দিলে প্রতি ইউনিটে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে ১ টাকা ৩৫ পয়সা। এতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য হার দাঁড়াবে ৮ টাকা ২০ পয়সা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]