রোহিঙ্গা বিষয়ে গাম্বিয়ার সাহসিকতা অতুলনীয়

আমাদের নতুন সময় : 14/11/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : আফ্রিকা মহাদেশের ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া গত সোমবার ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে পরিচালিত গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগোষ্ঠি নিধন সংবলিত ৪৬ পৃষ্টার অভিযোগ হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-তে দাখিল করেছে। এতে রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদি তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় চলে, তবে প্রথমবারের মতো ওই আদালত কোনো প্রকার, যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (আইসিটি)-র নির্ভরশীলতা ছাড়াই পরিচালিত হবে।

আইসিজে-র বিধি মোতাবেক ওই মামলায় কার্যত যুক্তি উপস্থাপন করে বলা হয়েছে যে, সদস্যভুক্ত এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপর রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের দায়ে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে; সেটা গণহত্যা সম্পর্কিত ১৯৪৮ সালের আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতাধীন অপরাধ বিষয়ক প্রতিরোধ ও শাস্তি সংশ্লিষ্ট।

ফলশ্রুতিতে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-ভুক্ত গাম্বিয়া অগ্রগামী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের দাবীদার; যদিও তা সেই সংস্থার অপরাপর সদস্য দেশ কর্তৃক সমর্থিত। তাতে এ বছর শেষে ডিসেম্বরেই প্রাথমিক শুনানি হতে যাচ্ছে। এই ক্ষুদ্র দেশটির ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠিই মুসলিম এবং তাদের সেই প্রয়াসকে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ স্বাগত জানিয়েছে। গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচার মন্ত্রী আবুবকর মেরি তাম্বাদো অতীতে রুয়ান্ডা গণহত্যায় গঠিত আইসিটি-র প্রধান কৌশলির বিশেষ সহযোগি ছিলেন এবং তিনিই ক্রীড়ক হিসেবে ওআইসি-ভুক্ত দেশগুলোকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেছেন। তার দাখিলকৃত মামলায় বর্ণিত যে, ‘২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের একটি ক্ষুদ্র দল মূলত লাঠি, ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ মিয়ানমারের নিষ্পেষন প্রতিরোধে উত্তর রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ফাঁড়ির উপর হামলা চালায়।’ এরপরই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ‘ক্লিয়ারেন্স অপরারেশন’ শুরু করে। এতে আরও বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী ‘সুপরিকল্পিত পন্থায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর গুলিবর্ষন, হত্যা, অপহরণ, ধর্ষন, দলবদ্ধ ধর্ষন, শ্লীনতাহানি, আটক ও প্রহার ছাড়াও তাদের ঘর-বাড়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা, দোকানপাট ও কুরআন শরীফে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংস সাধন করেছে।’

ওই বিচার মন্ত্রী তাম্বাদো নিজেই যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষিত ব্যারিষ্টার এবং তার ভাষ্য হচ্ছে- ‘মিয়ানমার সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বচ্ছ বার্তা প্রদান যে এই পাশবিক নৃশংসতা নিশ্চুপ মেনে নেয়া যায় না। এটা আমাদের প্রজন্মের কাছে লজ্জাকর যে চোখের সামনে সংঘটিত গণহত্যায় আমরা নিষ্ক্রিয় থাকছি।’

ওই মামলার খসড়া তৈরিতে সহযোগিতা জুগিয়েছেন অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি, যার রয়েছে গণহত্যা সংশ্লিষ্ট চুক্তির উৎস বিষয়ক একটি গ্রন্থ। গাম্বিয়ার কৌশলি হিসেবে তার বক্তব্য: ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) হচ্ছে গণহত্যা চুক্তির সর্বশেষ আশ্রয়স্থল, যা সাত দশক আগে আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন কর্তৃক প্রণীত, যাতে ওই চুক্তির অধীনে পাশবিক হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, যেমনটা মিয়ানমারে সংঘটিত। আদালত তার দায়িত্বাবলী সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত এবং সে মতেই ব্যক্তি ও গোষ্ঠির নিরাপত্তায় বদ্ধপরিকর।’

একই সঙ্গে হেগে অবস্থিত অন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-র কৌশলিরাও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে নেমেছে, যদিও সেক্ষেত্রে দেশটি চুক্তিবদ্ধ বা আওতাধীন নয়। তথাপি আইনি দৃষ্টিতে শত-সহ¯্র রোহিঙ্গা প্রতিবেশী আইসিসি-ভুক্ত বাংলাদেশে বিতাড়নের বিষয়ে গাম্বিয়ার দাবিটি জটিল প্রক্রিয়াধীন।
তবে কী বাংলাদেশ এখন গাম্বিয়ার ওই সাহসী প্রয়াসকে স্বচ্ছ অবস্থানগত চিত্তে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানাবে?




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]