• প্রচ্ছদ » » হুমায়ূন আহমেদের পুত্র সন্তানের শখ মেটানোর জন্য পাঁচটা সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে গুলতেকিনকে


হুমায়ূন আহমেদের পুত্র সন্তানের শখ মেটানোর জন্য পাঁচটা সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে গুলতেকিনকে

আমাদের নতুন সময় : 15/11/2019

সাদিয়া নাসরীন

হুমায়ূন আহমেদ। নাইন টেনের বয়সে বই পড়া শেখানো ছাড়া আর কোনো কারণেই খুব বিশেষ কিছু ইদানীং মনে হয় না আমার তাকে। বড় হতে হতে তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্যিক পরিচয় ছাপিয়ে আমার কাছে তার পুরুষ পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠেছে। যে পুরুষ খুব সাধারণ, গড়পরতা, আধিপত্যবাদী, অসংবেদনশীল, স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং খানিকটা পিডোফাইলও, যিনি প্রায়শই অল্প বয়স্ক মেয়ের জন্য কাতর থাকতেন। একটা সময় হুমায়ূন আহমেদের হাত-পা মেলে যেমন খুশি তেমন করে জীবনকে যাপন করার ক্ষমতা দেখে তাকে আমার রাজার মতো মনে হতো। এখন আর মনে হয় না। বরং নিজের খেয়ালখুশির জন্য বাইজি নাচানো এলেবেলে টাইপ নষ্ট রাজা মনে হয়। আমি দেখতে পাই তার এই রাজার মতো জীবনযাপনের পেছনে দুজন নারীর আজীবন সেক্রিফাইস, দহন, সামাজিক নিপীড়ন, বঞ্চনা আর অপচয়। একজন গুলতেকিন, একজন শাওন। দুজনেই নিজেদের জীবনের শুরুতেই হাত ধরেছিলেন হুমায়ূনের। একজন গুলতেকিন খান, একজন হুমায়ূন নির্মাণের পেছনে কোন বটবৃক্ষ হয়েছিলো, গুলতেকিনের কোন কোন ত্যাগের বিনিময়ে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠতে পেরেছেন সেসব গল্প আমরা জানি হুমায়ূনের লেখার সূত্রেই। হুমায়ূনের পুরুষালী ইচ্ছা, পুত্র সন্তানের শখ মেটানোর জন্য পাঁচটা (একজন মৃত সন্তানসহ) সন্তান জন্মদান করতে হয়েছে গুলতেকিনকে, যাদের প্যারেন্টিং করেছেনও এক হাতেই। সেই সুযোগে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে লেখালেখি আর শিল্প সাধনা করতে পেরেছেন হুমায়ূন। জয় করেছেন শিল্প সাহিত্যের সব শাখা। যুগ যুগ ধরেই পুরুষের শৌর্যবীর্য আর জয়ের মহিমা লেখা হয়েছে নারীর বলিদানের কলমে।যখন লেখক হুমায়ূন ধীরে ধীরে ‘সম্রাট’ হয়ে ওঠতে লাগলেন, তখনই গুহাচিত্র আঁকার আলো ধরার জন্য নতুন নারী দরকার হলো হুমায়ুনের এবং গুলতেকিনের ঘাড়েই চারটা কিশোর সন্তানের ভার চাপিয়ে নিজে ভারমুক্ত হয়ে গুহাচিত্র আঁকতে গেলেন নতুন আলোকর সঙ্গে নিয়ে। এর নাম পুরুষ। অতঃপর কিশোরী শাওন ধরলেন গুহাচিত্রকরের জন্য আলো। ৫৬ বছর বয়সী একজন পুরুষের গুহাচিত্র আঁকার শখের আলো ধরার জন্য সদ্য কৈশোর পেরোনো এই মেয়েটিকে কী পরিমাণ রক্তাক্ত হতে হয়েছে, কী পরিমাণ ছাড়তে হয়েছে, কী পরিমাণ ঘৃণার আগুনে পুড়তে হয়েছে, তার সাক্ষীও আমরাই। শাওনকেও প্রমাণ করতে হয়েছে তিন (একজন মৃত) সন্তানের মা হয়ে এবং মা হয়েই তাকে হয়তো নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হবে জীবনতক। হুমায়ূন যতোই পুরুষ হয়েছেন ততোই নারী হয়ে মাতৃত্বের খোলসে বন্দি হয়েছেন গুলতেকিন এবং শাওন। তাতে এই সমাজের করুণা, সমবেদনা আর সম্মান পেয়েছেন তারা নিজেদের অপচয়ের দামে। এর নাম সমাজ। যে সমাজে মা মানেই মাটি। মা যদি রক্ত মাংসের মানবিক জৈবিক চাহিদাসম্পন্ন মানুষ হতে চায় তবে সেই মা ঘৃণিত। যদি সেদিন গুলতেকিনও বিয়ে করতেন তবে শাওনের সমান নিন্দাই কুড়াতে হতো তাকেও। অথচ কেউ কেশাগ্রও স্পর্শ করতো না হুমায়ূনের। পুরুষ যতো খুশি নারীসঙ্গ করুক, নারীকে থাকতে হবে একা। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে? তুমি মা, একা থাকো। স্বামী মারা গেছে? তুমি মা, একা থাকো। স্বামী অন্য নারীকে বিয়ে করেছে? তুমি মা, একা থাকো। বয়স যাই হোক, নারী যতোক্ষণ একা থাকবে, যতোক্ষণ সন্তান বুকে করে রাখবে, যতোক্ষণ নিজের কথা না ভাববে ততোক্ষণ এই সমাজ নারীর মহত্ত¡ বর্ণনা করবে। নারী নিজের কথা ভাবলেই মোড়লরা তেড়ে আসবে। সন্তানের দোহাই দেয়া হবে, সন্তান বড় হচ্ছে, তাদেরই প্রেম করার বয়স, আর এখন কিনা নিজেই সঙ্গী খুঁজবে নারী? তো সেই নারী নষ্টা। সন্তান রেখে বিয়ে করবে না। তো কোনো পুরুষের সঙ্গে স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক করবে? তাও হবে না। চারদিকে ছিঃ ছিক্কার ওঠবে। তো, নারী কী করবে? একা থাকবে। নিজেকে ক্ষয়ে দেবে। নিজেকে নিঃশেষ করলেই তবে প্রমাণ হবে মা মহান। নিজেকে শুকিয়ে না ফেলতে পারলে তবে নারী কিসের মহান মায়ের জাত। সেই নারী জীবনের অপচয়ের একই চক্রে বাঁধা পড়ে আছে সম্রাটের জীবন ভোগ করে যাওয়া হুমায়ূনের জীবনের দুই নারী। সেই পনেরো বছর আগে নিজের আলো খুঁজে নিয়েছিলেন হুমায়ূন। তারপর থেকে সন্তানদের নিয়ে একলা গুলতেকিন। এর মধ্যে সন্তানরা বড় হয়েছে, সবার নিজেদের আলাদা জগৎ, আলাদা সংসার হয়েছে। গুলতেকিন একা থেকে একাতর হয়েছেন। একা চলার এই এতোগুলো মুহূর্ত, এতোগুলো দিন, এতোগুলো রাত… কেউ জানবে না সেইসব বেদনা যাপনের খবর। একই পথে হাঁটছেন শাওনও। সমাজের মাপমতো ভালো মা, ভালো নারী হওয়ার জন্য একলাই হাঁটছেন দুসন্তানকে হাতে ধরে। এই একাকীত্বের শুরু হুমায়ূন মারা যাওয়ার আরও আগে থেকেই। যখন থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীর সেবায় নিজেকে মন্দাকিনী সাজতে হয়েছিলো কোলে-পিঠে দুই শিশু সন্তান নিয়ে, সেই থেকেই তার দিনগুলো একার, রাতগুলো একার, লড়াইগুলো একার, চেপে যাওয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাসগুলোও একার। একদিন তার সন্তানরাও বড় হবে, তাদেরও আলাদা সংসার, আলাদা জগৎ হবে। শাওনও একা থেকে একাতর হবে। কেউ জানবে না তার এই একা চলার, কষ্ট ভোলার স্মৃতিপিষ্ট জীবনের খবর।
কিন্তু সমাজের মোড়লরা হারিকেন জ্বালিয়ে পাহারা দেবে শাওন কোনো পুরুষসঙ্গ করছে কিনা। পরখ করে দেখবে শাওন মৃত হুমায়ূনের প্রতি নিষ্ঠা পালনে কোনো ব্যত্যয় করছে কিনা। শাওনের হাসির মাপ মনিটর করা হবে, চোখে-মুখে কোনো তৃপ্তি বা আনন্দের ছাপ আছে কিনা সেটা নিবিড় পরীক্ষণ হবে। শাওনকে পিচ্ছিল মাটিতে পা টিপে টিপে সন্তানদের যোগ্য মানুষ বানিয়ে প্রমাণ করতে হবে সে যথার্থ মা, হুমায়ূনের যোগ্য স্ত্রী। তবেই হুমায়ূনের সমাজে তার ‘কলঙ্ক’ কিছুটা লাঘব হবে। হুমায়ূনের জন্মদিনে আমি বরং কামনা করি গুলতেকিন এবং শাওন দুজনেই মানুষ হয়ে ওঠুক। মা, মাটি, মাতৃত্ব এসব গোলকধাঁধা কাটিয়ে রক্ত মাংসের জৈবিক মানুষ হোক। তারা মনে রাখুক, মা যশোদা হয়ে বিশ্বসংসারকে মাতৃস্নেহে পালতে গেলে শেষ বেলায় নির্বান্ধব একলা মরতে হয়। গুলতেকিন এবার একা থেকে দোকা হোক, শাওনও একা থেকে দোকা হোক। পুরুষের জীবনের বাতিঘর হয়ে না থেকে তারা নিজের জীবনের চিত্রকর হোক এবার। সেই ক্ষমতা তাদের আছে। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]