• প্রচ্ছদ » » কে শক্তিশালীÑ জনগণ, সরকার নাকি একচেটিয়া কারবারীরা?


কে শক্তিশালীÑ জনগণ, সরকার নাকি একচেটিয়া কারবারীরা?

আমাদের নতুন সময় : 16/11/2019


মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : দেশের বাজার পরিস্থিতি কে নিয়ন্ত্রণ করে এমন প্রশ্ন প্রায় সবারই। কিন্তু উত্তর জানা নেই সম্ভবত কারওই। কেননা, বাজারে এই জিনিসের দাম হুহু করে বাড়ছে তো কয়দিন পর অন্য জিনিসের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে। অজুহাত একটাই সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি। দারুণ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আমাদের কারবারীরা। এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি একটা নয়, দুটি ছাড়িয়ে তিনটির দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হচ্ছে। বুলবুল দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু সেটি ভূখ-ে আসতে আসতে সুন্দরবন তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাই আমরা অনেকটা রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু আমাদের বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন পৃথিবীর সব মহাসংকেতকে ছিন্নভিন্ন করে কেবল এগিয়েই চলছে। তাকে রোধ করবে কে? সরকার? সেই ক্ষমতা নেই যে সেটি বোঝাই গেলো। কারবারীদের একই কথা সরবরাহ কম।

তাই বাজার বাড়বেই। কিন্তু কথা হচ্ছে কারবারীদের পেঁয়াজের কেনা মূল্যটা তাদের কতো? বাজারে বিক্রি করছেন তারা কতো দামে? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য ২/৩/৪ গুণ যদি হয়ে যায় তাহলে এর কী উত্তর তাদের দেয়ার রয়েছে জানি না। আমরা নিশ্চিত পেঁয়াজের আমদানিকারকেরা এখনো যা আমদানি করছেন তার দাম নিশ্চয় এক-দেড়শ টাকা কেজিতে হয় না। কিংবা আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের কেনা মূল্য ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে না। কিন্তু আমদানিকারক, আড়তদার এবং খুচরা বিক্রেতারা একজন আরেকজনের দিকে দাম বাড়ানোর অভিযোগটা করে সবাই যে যার মতো করে মূল্য হাঁকিয়ে ক্রেতাদের সর্বস্বান্ত করছে। ৫০/৬০ টাকায় পেঁয়াজ কিনে ব্যবসায়ীরা এখন সরবরাহের অজুহাত দিয়ে কেজিতে ২০০/২৫০ টাকা দামে বিক্রি করতে ভারি আনন্দ পাচ্ছেন। সবারই গুদামে এখন পেঁয়াজের চাইতে টাকার মজুদ ঢের বেড়ে চলছে। ভারতে যেদিন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করা হয় সেদিনই বাংলাদেশের দোকানে দোকানে পেঁয়াজের দাম হুহু করে বাড়িয়ে দেয়া হলো। ব্যবসায়ীরা মনে হলো সেদিনই পেঁয়াজ ভারত থেকে কিনে এনেছিলেন তাই কেনা মূল্যের চাইতে সামান্য বাড়তি মূল্যে সেদিনই ক্রেতাদের পকেট কাটা শুরু করলেন। আবার বিদেশ থেকে কমদামে পেঁয়াজ আনা হলে চমৎকার যুক্তি তোলা হবে যে, বাজারে এই পেঁয়াজ যেহেতু তারা বেশি দামে কিনেছেন তাই লস দিয়ে পেঁয়াজ কেন তারা বিক্রি করবেন? অথচ কমদামে কিনে বেশি বেশি দামে বিক্রি করতে তাদের এমন যুক্তি শোনাতে দেখি না। বাংলাদেশে সব কিছুই সম্ভব। যুক্তিও যে যার মতো করে বানাতে পারে। আসলে এই মুহূর্তে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ কম আমদানি করে যদি বেশি বেশি লাভ করতে পারেন তাহলে তারা কেন বেশি বেশি পেঁয়াজ আমদানি করে বাজার মূল্য কমাতে যাবেন? এমন লাভের ব্যবসা তাদের সহজে আসে না। তাই এই সুযোগটা বড় বড় আমদানিকারকেরা হাতছাড়া করবেন কেন? তারা কম আমদানি করবেন, বেশি লাভ করবেন এটিই তো মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল দর্শন।

বাজারে এখন চালের দাম কেজি প্রতি ৪/৫ টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে চাতাল মালিকরা চাল বাজারে কম সরবরাহ করছেন। বাজারে নাকি এখন ধানের ঘাটতি। কারণ অল্প কদিন পরই নতুন ধান উঠবে। তার আগে তো ধানের ঘাটতি থাকবেই। অথচ ৪/৫ মাস আগেই দেশে কৃষকরা ধানের মূল্য পায়নি। চাতালের মালিকরা ধান কেনেনিÑ এমনটি মোটেও বলা যাবে না। তখন তারা ৩০০/৪০০ টাকা মণে ধান কিনে গুদামজাত করেছেন। এখন তারা ধান নেই অজুহাত দেখিয়ে মণ প্রতি ২/৩শ টাকা বাড়তি দামে দেশব্যাপী চাল বিক্রি করছেন। তাদের কে নিয়ন্ত্রণ করবে। ধান কেনার সময় তাদের যুক্তি থেকে শোনা গেছে পর্যাপ্ত টাকা নেই, গুদামের অভাব তাই বেশি বেশি ধান কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ যদি সত্য কথা হতো তাহলে বিশ্বাস করা যেতো। তখন তারা যেমন মিথ্যা কথা বলেছেন, এখনো বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে মিথ্যা অজুহাত খাড়া করছেন। একচেটিয়া কারবারীদের হাতে সরকার এবং জনগণ যখন জিম্মি হয়ে পড়ে তখন সরকার যতো হাজার ম্যাজিস্ট্রেট নামিয়ে বাজার তদারকির চেষ্টা করেন না কেন লাভের লাভ কিছুই হবে না। একজন আড়তদারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা করলে সেই আড়ত বন্ধ হয়ে যায় না। মজুদ কয়েক বস্তা পেঁয়াজ ২০০/৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করলে যে লাভ হবে তা ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে নির্ধারণ করবেন। চালের চাতাল, মোকাম এবং আড়তদারদের অবস্থাও একই।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলে চামড়ার ব্যবসায়ীরা বিশ্ব বাজারের অজুহাত দেখিয়ে গুরু ছাগলের চামড়ার দাম অনেকটা বিনা পয়সা মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। অথচ সারা বছরই তারা ওই কম অর্থে কেনা চামড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন করে কতো লাভে তা রপ্তানি করেন সেই হিসাব আমাদের জানার সুযোগ নেই। কোরবানির সাধারণ চামড়া বিক্রেতারা প্রতিবছর কীভাবে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে তা আমাদের দেখেই যেতে হয়, কিছুই করার নেই। আবার রমজান ও কোরবানির ঈদে কখনো মসলার দাম, কখনো শাকসবজি, তেল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের পকেট কাটতে প্রতি বছরই দেখা যায়। যতোই বলা হোক বাজার তদারকি হলে এমনটি হতো না। বাস্তবে কি এতোসব দোকানপাট তদারকি করার মতো ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের দেশে রয়েছেন? নাকি বাজার তদারকির জন্য আমাদের বিদেশ থেকে লাখ লাখ তদারককারী ভাড়া করে আনতে হবে। আমি নিশ্চিত যতো তদারককারী এখানে বসানো হোক না কেন আমাদের একচেটিয়া কারবারী, আমদানিকারক, আড়তদার, মধ্যস্বত্বকারবারী এবং খুচরা দোকানদার সবাই যেসব ‘অর্থনৈতিক যুক্তি’ হাজির করবে তার উত্তর কেউই দিতে পারবেন না। দিলেও খুব একটা লাভ হবে না। কেননা আমাদের দেশে সবাই অপরাধ ও দোষের আঙ্গুলটি অন্যের দিকে তাক করিয়ে দেন, নিজের দিকে সাধু সন্ন্যাসী সাজার ভাণ করেন। এভাবেই চলছে আমাদের দেশের উঠতি ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রতিষ্ঠান এবং এর হর্তাকর্তারা। দেশের আইন নীতি নৈতিকতা- এসব কেতাবে থাকবে, বাজারে নয়। হালাল-হারাম বিশেষ বিশেষ জায়গায় থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিসহ অন্য কোথাও প্রশ্ন করা যাবে না। এ এক অদ্ভুত দ্বিচারিতার দেশ। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে কী তুমি?
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]