• প্রচ্ছদ » শেষ পাতা » ঘরোয়া তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দুই জায়ের মধ্যে বিরোধ, স্ত্রীর পরামর্শে সগিরা মোর্শেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন স্বামীর বড় ভাই


ঘরোয়া তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দুই জায়ের মধ্যে বিরোধ, স্ত্রীর পরামর্শে সগিরা মোর্শেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন স্বামীর বড় ভাই

আমাদের নতুন সময় : 16/11/2019

সুজন কৈরী : সগিরা মোর্শেদ সালামকে গুলি করে হত্যার ৩০ বছর পর মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। গ্রেপ্তার চারজন হলেন- সগিরার ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, ডা. হাসানের শ্যালক প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের ভাগ্নে আবাসন ব্যবসায়ী মারুফ রেজা।
গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইর ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে মেয়ে সারাহাত সালমাকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছিলেন সগিরা। পথে মোটরসাইকেলে তার রিকশার গতিরোধ করে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতিকারীরা। তারা সগিরার হাতের বালা ধরে টান দেয়। বালা দিতে অস্বীকার করলে তাকে গুলি করে। পরে গুরুতর অবস্থায় সগিরাকে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় সগিরার স্বামী আ. ছালাম চৌধুরী রমনা থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ১৯৯০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ছিনতাইকারী মিন্টু ওরফে মন্টুর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে ডিবি পুলিশ।
আদালত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন। নেয়া হয় ৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি। এতে সন্দেহভাজন আসামি মারুফ রেজার নাম আসায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। কিন্তু আদালতের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে মারুফ হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২৬ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করেন। কিন্তু চলতি বছরের গত ১১ জুলাই হাইকোর্ট মামলাটি খারিজ করে অধিকতর তদন্তের পিবিআইকে নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআই তদন্ত শুরু করে।
পিবিআই গত ১০ নভেম্বর রামপুরা থেকে আনাসকে গ্রেপ্তার করে। তার দেয়া তথ্যে ১২ নভেম্বর ধানমন্ডি থেকে স্ত্রীসহ ডা. হাসান ও পরদিন বেইলী রোড থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মারুফকে। ডিআইজি বনজ কুমার বলেন, গ্রেপ্তার চারজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী সগিরার ভাসুর ও জা। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য আরো দুমাস সময় চাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রিকশাচালক ছালাম। অনেক অনুসন্ধান চালিয়ে তাকে খুঁজে বের করা হয়। এরপর তার দেয়া তথ্য এবং সগিরার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে খুনের প্রকৃত কারণ জানা গেছে।
পিবিআই জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় সগিরার সঙ্গে ছালাম চৌধুরীর মধ্যে সম্পর্ক তৈরী হয়। পরে দুই পরিবারের অভিভাবকদের সম্মতিতে ১৯৭৯ সালের ২৫ অক্টোবর তারা বিয়ে করেন। ১৯৮০ সালে শিক্ষকতা করতে ছালাম সপরিবারে ইরাক যান। ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে আসেন। রাজারবাগ পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন পৈত্রিক বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সগিরা ও ছালামের তিন কন্য্সান্তানÑ সারাহাত সালমা চৌধুরী, সামিয়া সারোয়াত চৌধুরী ও সিফাত আবিয়া চৌধুরী। তাদের দুইজন বিদেশে থাকেন।
অপরদিকে সগিরার ভাসুর চিকিৎসক হাসান বারডেম হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ১৯৮০ সালে সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিনকে বিয়ে করেন। ওই বছরের ২২ জুন স্ত্রীকে নিয়ে লিবিয়ায় যান। ১৯৮৫ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ দেশে ফিরে বাবার বাসায় মা, ভাইয়ের সঙ্গে নীচ তলায় কিছুদিন থাকেন। পরে বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় ছোট ভাইয়ের বাসার একটি রুমে থাকতে শুরু করেন। এক বাসায় থাকার কারণে দুই জায়ের মধ্যে গৃহস্থালী ছোটখাটো ব্যাপারে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রায় ৬ মাস পর ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে হাসান স্ত্রী-সন্তানসহ ওই বাড়ীর তৃতীয় তলায় উঠেন। সেখান থেকে ময়লা ফেলা ও বিভিন্ন কারণে হাসানের স্ত্রীর সঙ্গে সগিরার দ্বন্দ্ব আরো বাড়তে থাকে। দুই জায়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েনের একটি বড়ো কারণ ছিলো শিক্ষাগত যোগ্যতা। সগিরা উচ্চশিক্ষিত আর সায়েদাতুল মাহমুদা বিএ পাশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পারিবারিক তুচ্ছ বিষয়গুলো। এসব নিয়েই ডা. হাসান ও তার স্ত্রীর মনে ইগো-ক্রাইসিস দেখা দেয়।
১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে সগিরাকে একটু শায়েস্তা করার কথা সায়েদাতুল মাহমুদা তার স্বামীকে বলেন। স্ত্রীর কথায় হাসান রাজি হন, কথা বলেন তার এক রোগী, সেই সময়কার সিদ্ধেশ^রী এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মারুফ রেজার সঙ্গে। ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে শায়েস্তা করার জন্য ডা. হাসান ২৫ হাজার টাকা দেয়ার কথা ছিল মারুফকে। এছাড়া সগিরাকে চিনিয়ে দিতে হাসান তার শ্যালক আনাস মাহমুদকে মারুফের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করেন। ঘটনার দিন ডা. হাসান তার শ্যালককে বেলা ২ টার দিকে ফোনে মৌচাক মার্কেটের সামনে যেতে বলেন। আর মারুফ রেজা মোটর সাইকেলে যাওয়ার কথা জানান। হাসান তার শ্যালককে মারুফ রেজার সঙ্গে গিয়ে সগিরাকে দেখিয়ে দিতে বলেন।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ডা. হাসান শ্যালক মারুফের মোটর সাইকেলে উঠে সিদ্ধেশ^রী কালীমন্দিরের গলি দিয়ে গিয়ে স্কুলের সামনে সগিরার রিকশার গতিরোধ করেন। মারুফ সগিরার হাত ব্যাগ নিয়ে নেন এবং হাতের বালা ধরে টানা হেঁচড়া করেন। তখন আনাসকে চিনে ফেলেন সগিরা এবং বলেন ‘এই আমি তো তোমাকে চিনি, তুমি এখানে কেন?’। এই কথা বলার পরপরই মারুফ ব্যাগ ছেড়ে পিস্তল দিয়ে ১ টি গুলি করে। এটি সগিরার হাতে লাগে। এরপর মারুফ আরো ১টি গুলি করে, যা সগিরা মোর্শেদের বাম বুকে লাগে। এ সময় সগিরা রিকশা থেকে পড়ে যান। এরপর আরো ২ টি ফাঁকা গুলি করে মারুফ ও আনাস মোটর সাইকেলে করে শান্তিনগরের দিকে পালিয়ে যায়।
হত্যাকা-ের পর ডা. হাসান সগিরার স্বামীকে মামলা তুলে নিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকিসহ চাপ দিতে থাকেন। ‘তোমার তিন মেয়েকে নিয়ে ভাল থাকো, মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না’ মর্মে চিরকুট লিখে বাদীর বাসার দরজার নিচ দিয়ে প্রবেশ করান। সেইসঙ্গে মারুফ রেজাও বেনামী টেলিফোনে মামলা উঠিয়ে নিতে হুমকি দিতে থাকেন। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]