• প্রচ্ছদ » শেষ পাতা » বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ৫৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় ওডারল্যান্ড যোগ দিয়েছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে


বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ৫৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় ওডারল্যান্ড যোগ দিয়েছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে

আমাদের নতুন সময় : 06/12/2019

 


অজয় দাশগুপ্ত : পার্থে তখন তিনি শেষ দিনগুলো পার করছিলেন, ভীষণ ইচ্ছে ছিলো তার সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু তখন আমি নতুন অভিবাসী। মাত্র এসেছি এই দেশে। নিজেরা থিতু হওয়ার সংগ্রাম করছি। সে সময় সম্ভব ছিলো না অতোটা পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমি প্রায়ই ফোন করতাম। নম্বর যোগাড় হওয়ার পর আমার অবিরাম চেষ্টার ফসলে তার স্ত্রী একবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বারণ ছিলো উত্তেজিত হওয়ার। শেষ জীবনে বিশ্রাম আর শান্তিতে থাকা ভদ্রলোক বাংলাদেশের কথা শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কারণ আছে তার। তখন বাংলাদেশ শাসন করছিলো বাংলাদেশের জন্মবিরোধী রাজাকার ও জগাখিচুড়ি দল বিএনপির জোট। তাদের কাজকর্মে কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার খুশি হওয়ার কারণ ছিলো না। বিশেষত একজন বিদেশি- যিনি আমাদের জন্য তার ক্যারিয়ার, পরিবার ও জীবনবাজি রেখেছিলেন। জানা যায় পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর উল্লাসরত তার এক কর্মচারীকেও বরখাস্ত করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীনের মৃত্যু তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি। ফোনে তার রাগ-অভিমান আর ক্রোধ শুনেছি। তলায় জমে থাকা বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুরাগ ছিলো স্পষ্ট। আর পাঁচজন বিদেশির মতোই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড চাকরি করতে এসেছিলেন এ দেশে। এ দেশ তখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ। ১৯৭১ সাল। পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। স্বাধিকারের দাবিতে দৃঢ়সংকল্প বাঙালির আন্দোলনে উত্তাল সমগ্র দেশ।
ওডারল্যান্ড ওই বছরের শুরুতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে যোগ দিয়েছেন বাটা শু কোম্পানিতে। টঙ্গীতে তার কার্যালয়। দেশের পরিস্থিতি আঁচ করতে মোটেই অসুবিধা হয়নি তার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ মার্চ বাঙালিদের গণহত্যা ওডারল্যান্ডকে অত্যন্ত বিচলিত করে তোলে। জঘন্য গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিকা-, নারী নির্যাতন ওডারল্যান্ডের মনে এক পুরনো ক্ষতকেই যেন নতুন করে জাগিয়ে তোলে। রক্তের ভেতর আবার সেই পুরেনো ডাক অনুভব করেন তিনি যুদ্ধে যাওয়ার। বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্তা ৫৪ বছর বয়সী ওডারল্যান্ড আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন যোদ্ধার ভূমিকায়।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে অবাধে চলাচলের সুযোগ ছিলো তার। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে হত্যা-নির্যাতনের ছবি তুলে সে সব ছবি গোপনে বিদেশের গণমাধ্যমে পাঠাতে থাকেন। সেইসঙ্গে চেষ্টা করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ সৃষ্টির। একটা পর্যায়ে তিনি গভর্নর লে. জে. টিক্কা খান ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জে. নিয়াজী, রাও ফরমান আলীসহ পাকিস্তানি সেনাদের মাথা-মুরব্বিদের সঙ্গে দহরম-মহরম করে তথ্য সংগ্রহের কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই করছিলেন তিনি, যেমন করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাশিবিরে গিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ওডারল্যান্ডের পিতৃভূমি হলেও ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তার জন্ম হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামে। জীবিকার তাগিদে ১৭ বছর বয়সে তিনি একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, পরে সেখান থেকে বাটা শু কোম্পানিতে। জার্মানির নাৎসি বাহিনী হল্যান্ড আক্রমণ করলে তিনি ডাচ সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে যোগ দেন। নাৎসিরা ১৯৪০ সালে বিমান হামলায় হল্যান্ডের রটারডাম শহর বিধ্বস্ত করে দেয়, হল্যান্ড চলে যায় তাদের দখলে। ওডারল্যান্ড বন্দি হন জার্মানদের হাতে। তবে কৌশলে তিনি বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের ক্যাম্পে কাজ করতে থাকেন। যোগ দেন ডাচ-প্রতিরোধ আন্দোলনে। ডাচদের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জার্মান ভাষা রপ্ত ছিলো তার। এই সুযোগ নিয়ে তিনি জার্মানদের গোপন আস্তানায় ঢুকে পড়েন। তথ্য সংগ্রহ করে পাঠাতে থাকেন মিত্রবাহিনীর কাছে। ১৯৪৩ সালে তিনি কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কমান্ডো সৈনিক ওডারল্যান্ড এই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছেন ঢাকায় নানাভাবে। প্রথম পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করলেও শুধু এতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি তিনি। এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আমাদের সঙ্গে। যিনি নিজের পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে নিয়াজীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। আর সে সুযোগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে সব খবর পৌঁছে যেতো মুক্তিবাহিনীর কাছে। পদে পদে বিপদকে মাথায় রেখে এই মানুষটি লড়াই করেছেন। বাংলাদেশে ঢাকায় তার নামে একটি রাস্তার নামাকরণ করা হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর সম্ভবত একবার গিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি আর মুক্তিযুদ্ধের অপমান মানতে পারতেন না বলে আর যাননি। আমাদের সমাজে এখনো যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি এখনো যে তর্ক তার নিরসনে তাদের জানা জরুরি। এতো বছর পর আমরা কিন্তু আমাদের শিশু, কিশোর ও তারুণ্যকে জানাতে পারিনি। ওডারল্যান্ড বাংলাদেশকে কেমন ভালোবাসতেন তা তার একমাত্র সন্তান এ্যানি হ্যামিলটনের কথাতেই জেনেছি। এ্যানি এসেছিলো সিডনিতে বাংলা সংস্কৃতি সম্মেলনের আয়োজনে। পিতা তাকে বলতো বাংলাদেশ আমার মন। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। এই মানুষটি আমাদের পতাকা সংগীত ও স্বাধীনতার এক মূর্ত প্রতীক। জর্জ হ্যারিসন রবিশংকর, আঁদ্রে মালরো এমন কিছু মানুষের পাশাপাশি তিনিও আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা একা নই। আমাদের মা জননী দেশ কখনো একা ছিলো না।
প্রত্যেক বিজয়ী জাতির ইতিহাসে এমন কিছু বীর থাকেন যারা সময়ের ধারক আর দুঃসময়ের ধ্রুবতারা। আমাদের দেশ ও জাতির জীবনে তিনি তেমনই একজন। আমি কামনা করি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমলে তার বীরত্বের কাহিনির বহুল প্রচার। শেখ হাসিনা যখনই এ দেশে এসেছেন পার্থে গেলে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসতে ভুল করেননি। তার ধমনীতে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত। তিনিই আমাদের একমাত্র বিদেশি বীর প্রতীক। লেখক : বিশ^বিদ্যালয় পরীক্ষক ও কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]