• প্রচ্ছদ » » অকৃতজ্ঞ দেশকে তিনি দুহাত ভরে দিয়েই গেলেন


অকৃতজ্ঞ দেশকে তিনি দুহাত ভরে দিয়েই গেলেন

আমাদের নতুন সময় : 11/12/2019

চিররঞ্জন সরকার

কেবলই গøানি আর লজ্জা। একটি চরম অবক্ষয়গ্রস্ত, মৌলবাদমুখী অকৃতজ্ঞ দেশকে তিনি দুহাত ভরে দিয়েই গেলেন। বিনিময়ে ফেরত পেলেন না কিছুই। যথাযথ মর্যাদা, সম্মান-স্বস্তি-ন্যায়বিচার কিছুই পেলেন না। অজয় রায় স্যারের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই তার শান্ত-মৌম্য-বুদ্ধিদীপ্ত-সুন্দর মুখটির কথা মনে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা হয় ২০০৭ সালে ইনস্টিটিউট ফর এনভারনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামে একটি সংস্থায় কাজ করার সময়। তখন আমরা একসঙ্গে জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের জন্য সম্প্রীতি মঞ্চ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম। আমি ছিলাম স্যারের সহযোগী। সেই সময় স্যারের নেতৃত্বে বন্যার্তদের সাহায্য, বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা, একটি বিকল্প শিক্ষা নীতির খসড়া প্রণয়নসহ বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো। সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং একটি প্রগতিমুখী সমাজ গড়ার জন্য তার আন্তরিকতা ছিলো সীমাহীন। নিপীড়িত মানুষের জন্য অকৃত্রিম দরদ আমি তার মতো খুব কম মানুষই দেখেছি। ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব সৎ ও নির্বিরোধী মানুষটার জীবনটা আসলে এলোমেলো হয়ে যায় ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারি। এ দিন তিনি হারান প্রিয় ছেলেকে। যে ছেলেকে নিজ আদর্শ ঢেলে দিয়ে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, সেই ছেলের নির্মম মৃত্যু দেখতে হয়েছে তাকে। উগ্র ধর্মান্ধরা ড. অভিজিৎ রায়কে পৈশাচিকভাবে মেরে ফেলার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। তবুও এই ‘জংলি দেশে’ সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে গেছেন দিনের পর দিন। কিন্তু সেই বিচার তিনি দেখে যেতে পারেননি। একদল নরঘাতকের হাতে সন্তান হারাবার শোকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে থাকা ছোটখাটো শরীরের এ তেজস্বী অধ্যাপকের কথা ভাবলেই প্রবল এক অপরাধবোধ আর অন্তহীন বেদনা একনিমিষে শূন্য করে দেয় ভেতরটা। কতো মস্ত অভিমান আর দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে চলে গেলেন তিনি। রাষ্ট্র, সরকার, সরকারপ্রধান-জীবদ্দশায় কারও কাছ থেকেই প্রাপ্য মর্যাদা আর সম্মান তিনি পাননি। তাই বুঝি লাশ বহনের দায় থেকেও তিনি সবাইকে রেহাই দিয়ে গেছেন। তিনি তার মরদেহটি দান করে গেছেন বারডেম হাসপাতালকে। নিজের লাশটাও দিয়ে গেলেন তিনি দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে। কিন্তু ধর্মের আবরণে ঢেকে যাওয়া রাষ্ট্রটির কাছ থেকে জীবদ্দশায় তিনি কী পেলেন? অথচ দেশ, দেশের নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে কিনা করেছেন তিনি? ২০০১ সালের নির্বাচনের অব্যবহিত পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন এবং নিপীড়ন বৃদ্ধি পেলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে ‘নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি’র ব্যানারে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি মনিটরিং সেল গঠন করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলে সংখ্যালঘুদের সহায়তা করেন। ইন্টারনেটে সংখ্যালঘুদের দুর্দশার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ শিরোনামে সিরিজ শুরু করেন। ভোলার অন্নদাপ্রসাদ গ্রামে বিভিন্ন নির্যাতিত নারীদের শেল্টারের ব্যবস্থা করেন এবং দাঙ্গায় যারা গৃহ হারিয়েছিলেন, তাদের গৃহ পুনঃনির্মাণে উদ্যোগী ভ‚মিকা পালন করেন। অধ্যাপক জিল্লুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ‘গণতদন্ত কমিশন’ গঠন করেন, যার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ডিসেম্বর ২০০২ সালে। দেশের পাহাড়ি জনগণ এবং আদিবাসীদের অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনও তিনি জোরালোভাবে সমর্থন করেন। তিনি মনে করেন, পার্বত্য এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ও বাঙালি অধিবাসীদের অবিলম্বে সরিয়ে নেয়া দরকার।তিনি বাংলাদেশে বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পেছনে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মজীবন থেকে অবসর নেয়ার পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চ গড়ে তোলেন। তিনি বিজ্ঞানকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াসে তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার এবং সভার আয়োজন করেন। তিনি ‘মুক্তমনা’র উপদেষ্টামÐলীর সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করছেন। যার লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবকল্যাণবোধ প্রতিষ্ঠা। তিনি বাংলাদেশের কৃষক-দার্শনিক আরজ আলী মাতব্বরকে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করার পেছনেও উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা রেখেছেন। যে ব্যক্তিটি আমৃত্যু দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজের সামর্থ্যরে শেষবিন্দু পর্যন্ত দিয়ে গেছেন, তাকে আমরা কী দিতে পারলাম? কেবল লজ্জা, লজ্জা আর লজ্জা। কেবলিই মাথা হেঁট হয়ে যায়। প্রবাসী লেখক ঙসধৎ ঋধৎড়ড়য় খীঁ-এর ভাষায় বলতে হয় : ভুল দেশে, ভুল সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পিতা-পুত্র দুজনেই। মুক্তিযুদ্ধ থেকে দেশ গড়ার লড়াই, নিজেদের মেধা, শ্রম আর জীবন দিয়ে আজন্ম যুদ্ধ আর প্রগতিশীলতার লড়াই করে গেছেন একটা অন্ধ, মূর্খ আর বেইমান জাতির জন্য। দেশ আর দেশের মানুষ আপনাদের ভালোই প্রতিদান দিয়েছে। পিতা অধ্যাপক অজয় রায় আর পুত্র অভিজিৎ রায়, ইতিহাস আপনাদের কতোটা মূল্যায়ন করেÑ সেটা দেখার জন্য এই অন্ধকার দেশে আমরা বেঁচে থাকবো তেলাপোকার মতো আরও কিছুদিন। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]