• প্রচ্ছদ » » একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষের নাম অজয় রায়


একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষের নাম অজয় রায়

আমাদের নতুন সময় : 11/12/2019

রাজেকুজ্জামান রতন

অধ্যাপক অজয় রায় নেই। আমরা কি প্রস্তুত ছিলাম এই ধরনের খবরের জন্য? বয়সজনিত অসুস্থতাসহ নানা জটিলতা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে আইসিইউতে ছিলেন তিনি। ফলে তার মৃত্যুর জন্য মানসিক প্রস্তুতি হয়তো ছিলো, কিন্তু মেনে নেয়াটা বড় কষ্টের। তিনি চলে গেলেন তার উপর অর্পিত অথবা যে দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তা যথাসাধ্য পালন করে। প্রিয়জনের মৃত্যু কি শুধু হৃদয়ে হাহাকার তোলে? তা কখনো বেদনা জাগায়, ক্ষুব্ধ করে, প্রতিবাদী করে, কিন্তু সবসময় চোখে জল আনে। অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যু বেদনার সঙ্গে ক্ষুব্ধতা নিয়ে চোখের জলের সঙ্গে চোয়ালকেও দৃঢ় করে তুললো না কি? অন্যান্য প্রাণীর মতো মানুষকে তার আকৃতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, বয়সের মাপেও মাপা যায় না তার কৃতী। তার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে না তার সাফল্য বা সার্টিফিকেটের ওজন দিয়ে। তিনি জীবনব্যাপী সংগ্রামে প্রমাণ করেছেন তিনি শুধু বিদ্যা অর্জন করেননি শিক্ষা অর্জন করেছেন। এটা তো আমরা দেখছি প্রতিদিন, বিদ্যা গ্রহণ সহজ, শিক্ষা অর্জন কঠিন। বিদ্যা আবরণের মতো, তা কখনো অহমিকা বাড়ায়, কিন্তু শিক্ষা প্রকাশিত হয় মানুষের আচরণে, তার রুচি ও সংস্কৃতিতে। অধ্যাপক অজয় রায় ছিলেন আপাদমস্তক শিক্ষিত মানুষ।
অজয় রায়ের জন্ম ১ মার্চ ১৯৩৫ সালে দিনাজপুরে। তার জীবনাবসান ৯ ডিসেম্বর ঢাকায়। ৮৫ বছরের সংগ্রামমুখর এক জীবন। সাধারণভাবে বললে ৮৫ বছর একজন মানুষের জন্য দীর্ঘজীবন বটে। কিন্তু জীবনের দৈর্ঘ্য সবসময় এক অর্থ বহন করে না। সময়ের দৈর্ঘ্য সবসময় একরকম অর্থ এবং অনুভ‚তি বহন করে না। কখনো দ্রæত গতিতে কখনো ¯øথ গতিতে জীবন এগিয়ে চলে। জীবন কখনো গতিহীন বা পরিবর্তনহীন নয়। গতি পরিবর্তন আর বিকাশের স্রোতে বহমান ছিলো অজয় রায়ের জীবন। জন্মেছিলেন উত্তাল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগমনী শঙ্কার মধ্যে। কৈশোরে দেখেছিলেন স্বাধীনতার আবেগ আর সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততা। দীর্ঘদিন পাশাপাশি থাকা, কতো আবেগ অনুভ‚তিতে জড়িয়ে থাকা, একই আলো হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর মধ্যে বেদনাময় বিরোধ, বিভক্তি এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানির বীভৎসতা। কিন্তু ধর্মীয় সংখালঘু হিসেবে বিবেচনা করেননি নিজেকে আর ভয় তাকে জন্মভ‚মির প্রতি ভালোবাসা থেকে দূরে সরাতে পারেনি।
যৌবনে পদার্পণ করে দেখেছেন ভাষা আন্দোলন। ভাষার পক্ষে যুক্তি করতে করতে মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তাড়িয়ে যুক্তির ভাষা গ্রহণ করতে শিখছে তখন ক্রমাগত। তিনি দেখেছেন দেশের মানুষ লড়তে লড়তে অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক হয়ে উঠছেন। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের অযৌক্তিকতা আর অযোগ্যতা প্রমাণিত হচ্ছিলো তখন পদে পদে। যৌবনের শক্তি আর সাহসের সঙ্গে সঙ্গে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে পথ দেখালো পথে টানলো। ছোটখাটো মানুষটি তখন বিশাল সাহসের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠছেন। ৬৪’র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি। তাকে ভয় দেখায়নি বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। যুক্তির জমি বা মাতৃভ‚মি কোনোটাই ছাড়তে বাধ্য করতে পারেনি তাকে। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র পরবর্তীতে শিক্ষক তিনি ছিলেন। কতোশত ছাত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক। শিক্ষক আন্দোলনে তার ভ‚মিকা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন আর শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন অবিচল। তার শিক্ষা ও সংস্কৃতি তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে সংগ্রামের সব জটিল আবর্তে। দায় এড়ানোর মানুষ ছিলেন না তিনি, যতো কষ্টই আসুক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে যেতে হবে এই ছিলো তার ব্রত। তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হতে তার কোনো দ্বিধা বা ভয় ছিলো না, ছিলো কর্তব্যের আহŸানে সাড়া দেয়ার মানসিকতা। শিক্ষার সঙ্গে গণতান্ত্রিক চেতনা, অধিকারের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মানসিকতাকে লালন করেছেন আজীবন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তার সরব উপস্থিতি সাহসী করেছে অনেককে। ভালো শিক্ষক হিসেবে সুনাম স্বীকৃতির মোহে আচ্ছন্ন হওয়া নয়, যুক্তিসঙ্গত কর্তব্য পালন করতে গিয়ে সমালোচনার মুখেও অবিচল ছিলেন তিনি আজীবন। বাসদের উদ্যোগে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টকে নিয়ে শিক্ষার সংগ্রামে শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চ গড়ে তুলতে গিয়ে তিনি ছুটেছিলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। শিক্ষার বিষয়বস্ত হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, শিক্ষার অধিকার হবে গণতান্ত্রিক, শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই এই দাবিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পাওয়ার দাবিতে তিনি আন্দোলন গড়ে তুলতে শ্রম, মেধা নিয়োগ করেছিলেন। বক্তৃতা, আলোচনা, লেখালেখি, আন্দোলনসহ প্রয়োজনে যেকোনো কাজ করতে তার কোনো ক্লান্তি ছিলো না। মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভারি বোঝা হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। সন্তান হারানোর বেদনায় নীল হয়েছেন আবার নীলকণ্ঠের মতো বেদনাকে বহন করেছেন। প্রতি মুহূর্তে প্রতিবাদকে জারি রেখেছিলেন শুধু নিজের সন্তানের হত্যার বিচারের দাবিতে নয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে নিহত হওয়া সবার জন্য। নিজের বেদনাকে সংযত রেখে যুক্তির কশাঘাতে জর্জরিত করেছেন রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততাকে। সন্তান হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা তাকে বিষাদগ্রস্ত করেনি, বরং তার বেদনাকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সবার মাঝে। আজ তিনি নেই। মুখে স্মিত হাসি নিয়ে অন্তরের বেদনা লুকিয়ে নীরবেই চলে গেলেন তিনি। কিছু কী বলে গেলেন আমাদের? কিছু দায়িত্ব কি দিয়ে গেলেন না আমাদের কাঁধে? শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা রুখে সমতা ও মর্যাদার লড়াইয়ে তিনি কি আহŸান জানিয়ে গেলেন না তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে নিজের জীবন বিলিয়ে গেলেন তিনি। মৃত্যুতেই কি শেষ হবে এ সংগ্রাম? আমরা যেন চোখের জল মুছে চোয়াল চেপে বলি, মৃত্যুতে শেষ হয় না জীবন। অধ্যাপক অজয় রায়ের সংগ্রামী জীবনের প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]