• প্রচ্ছদ » » একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ


একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

আমাদের নতুন সময় : 12/12/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ১৯৪৭ সালের আগস্টের মাঝামাঝি দ্বিজাতি তত্ত্ব বা ধর্মীয় ভিন্নতায় ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত ও পাকিস্তান তাদের স্বাধীনতা লাভ করে। তাতে সর্বশেষ পাকিস্তানের দুটি অংশের মাঝে রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে ঢাকার বিমান পথের দূরত্ব গিয়ে দাঁড়ায় ১,২৫৬ মাইল বা ২,০২২ কিলোমিটার। তদুপরি অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠার ভিত্তিতে বিজয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সে বছর আগেভাগেই জনরোষ সামাল দিতে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সেনা বাহিনী প্রেরণ করে, যারা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ অর্থাৎ ‘গণহত্যা’ সাধন করলে, সেটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে দ্রুত বেগবান করে।

বস্তুত পশ্চিম পাকিস্তানে চারটি প্রদেশ ছিল- পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। পূর্ব পাকিস্তান ছিল পঞ্চম প্রদেশ। সেগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় পূর্বের তুলনায় পশ্চিমে বিপুল ব্যয় সাধিত হয়। একমাত্র ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সালে সামগ্রিক রফতানির ৭০ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তান করলেও আমদানির জন্য মাত্র ২৫ শতাংশ অর্থ পায়। এছাড়াও পূর্ব থেকে পশ্চিমে অভ্যন্তরীণ সম্পদের স্থানান্তর ঘটে। এক হিসেবে দেখা যায়, ১৯৪৮-৪৯ থেকে ১৯৬৮-৬৯ সাল অবধি পূর্ব থেকে পশ্চিমে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ৩,১০০ কোটি রুপির স্থানান্তর ঘটে এবং তাতে ১৯৭১ সাল অবধি ডলারের মূল্যমান ১১.৯০ রুপি হিসেবে ২,৬০০ কোটি ডলার স্থানান্তরিত হয়। উপরন্তু ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ১১টি এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৯টি কাপড়ের মিল। অথচ ১৯৭১ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২৬ ও ১৫০। পাশাপাশি প্রাদেশিক জনসংখ্যাধিক্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠি সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অধিক হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা তারাই কুক্ষিগত করে। সেটাই ক্রমাগত পূর্ব পাকিস্তানকে বিদ্রোহী করে তোলে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সে কথা জোরেশোরেই বলেন। পরিণতিতে ওই সংগ্রামই স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে।

আগেই যোগ হয়েছিল ভাষাগত বৈষম্য। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে চরম মতানৈক্য দেখা দেয়। কেননা পশ্চিমে মোহাজির ও পূর্বে বিহারিদের ভাষা ছিল উর্দু। ওই বিবেচনায় পশ্চিমে অধিকাংশের ভাষা ছিল পাঞ্জাবী ও সিন্ধী এবং পূর্বে বাংলা। সে কারণে পূর্ব পাকিস্তান বিষয়টি মেনে নেয়নি, বরং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপ্রতিরোধ্য বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে ৭ জন ছাত্রের আত্মাহুতি ঘটে। এতে দিবসটি ভাষা আন্দোলনের দিন বিবেচিত হয়, যা ২০০০ সাল থেকে প্রথমে ইউনেস্কো ও পরে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পায়। পাশাপাশি ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভোলার সাইক্লোনে ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ও বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তচ্যুত হলে অপ্রতুল ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন মানুষের দুর্ভোগ জনরোষ জাগায়।

১৯৭০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করলে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবি করেন। কেননা তার দল জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মাঝে ১৬০ আসনে জয়লাভ করে। সে বিজয় তাকে সরকার গঠনের অধিকার দিলেও পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেননি। সেটাই যুদ্ধের সূচনা করে। আগেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ২৫ মার্চের আগে সংসদের অধিবেশন ডেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। এ সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় এসে পূর্ব বাংলার গর্ভণর হন। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিচারকবৃন্দ অনীহা প্রকাশ করেন। ফলশ্রুতিতে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নৃশংস পন্থায় বাঙালিদের বিরোধীতা গুড়িয়ে দেবার অপপ্রয়াস চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। ২৬ মার্চ অতি প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন।

পরিণতিতে রাজনৈতিক সংঘাত তুঙ্গে উঠে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য মুক্তিবাহিনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন। গেরিলা হিসেবে মুক্তি বাহিনী প্রশিক্ষিত হয়। ভারত শরণার্থী আশ্রয়ের পাশাপাশি মুক্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সহযোগিতা জোগায়। তাতে মুক্তি বাহিনীর প্রশিক্ষণকালীন তাদের বিদ্রোহ ঠেকাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজাকার হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী বাঙালিদের উৎসাহিত করে। বর্ষাকালে পাকিস্তানি বাহিনী সমস্যার মুখোমুখি হয়। সেটাই মুক্তি বাহিনীর জন্য সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। ভারত তাদের ভূমিকায় সক্রিয় থাকে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সেনা ও বিমান বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেন। তাতে ভারতের তিন রাজ্য- পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা থেকে ঢাকা অভিমুখে ত্রিমুখী আক্রমণ রচিত হয়। ফলে ভারতীয় সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী তাদের সহযোগিতা জোগায়। আর ভূমিতে মুক্তি বাহিনীর তিনটি গ্রুপ ও ভারতীয় বাহিনী মিলে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দুধর্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাকিস্তানিরা প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।

সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী তথা মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় সেনা বাহিনীর সমন্বয়ে সম্মিলিত বাহিনীর কাছে ঢাকার পতন ঘটে। ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার’ বা পরাজয়ের দলিলটি রমনা রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় সময় ১৬:৩১ মিনিটে পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি ও বিজয়ী ভারতীয় জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন। এতে সেদিনই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘বিস্তৃত ঘাঁষের মাঠে…আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে, পূর্ব পাকিস্তান অভিমুখে ভারতীয় বাহিনীর ১৩ দিনের যাত্রায় তা শেষ হয়েছে।’ পরে নিয়াজি তার জীবনীগ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি যখন কম্পিত হাতে দলিলে স্বাক্ষর করলাম, বেদনা তখন হৃদয় থেকে নয়নে উৎসারিত হলো, তবু হতাশা ও আক্ষেপের সে রোদন দেখা দিলেও গড়ায়নি।’ এভাবেই বাংলাদেশ সেদিন স্বাধীন হয়েছিল। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]