• প্রচ্ছদ » » ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান, ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন, তা হলো বাংলাদেশ ভ‚খÐ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান, ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন, তা হলো বাংলাদেশ ভ‚খÐ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ

আমাদের নতুন সময় : 12/12/2019

এনামুল হক : মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, রাজনীতিক। মওলানা ভাসানী নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি। তার জীবন ছিলো গ্রামভিত্তিক, মতবাদ উগ্র এবং ঔপনিবেশিক রীতিনীতির প্রতি আস্থাহীন। সারা রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রচুর প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন এবং বেশ কিছু সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিলেন, তবে কখনো ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিলো কৃষক শ্রমিক জনসাধারণ, যাদের অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে গেছেন।
ভাসানী ১৮৮০ সালে ১১ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধনপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন হাজি শরাফত আলী খান। স্থানীয় স্কুল ও মাদ্রাসায় কয়েক বছর অধ্যয়ন ছাড়া তার বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলো না। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন টাঙ্গাইলের কাগমারিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। পরে তিনি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট এলাকার কালা গ্রামে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। পরে তিনি টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে গিয়ে তথাকার অত্যাচারিত কৃষকদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ত্রিশের দশকের শেষদিকে তিনি আসামের ঘাগমারায় বসবাসকারী বাঙালিদের স্বার্থরক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ওই এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাসানচরে বন্যার কবল থেকে বাঙালি কৃষকদের রক্ষার জন্য তিনি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। ভাসানচরের জনসাধারণ তাকে ‘ভাসানী সাহেব’ বলে অভিহিত করে এবং পরবর্তীকালে এ উপাধি তার নামের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। আসাম সরকার আইন করে এমন একটি ভৌগোলিক সীমারেখা টেনে দেয় যে বাঙালিরা ওই সীমা অতিক্রম করে বসতি স্থাপন করতে পারতো না।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ছাত্র নিহত হন। ভাসানী এর কড়া প্রতিবাদ করেন এবং ২৩ ফেব্রæয়ারি তাকে তার গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। রাজনৈতিকভাবে ভাসানী এতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে ভাসানী সবচেয়ে প্রতিবাদী এবং শ্রদ্ধেয় রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে ভাসানী তখনকার পাঁচটি বিরোধীদল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি মোর্চা গঠন করেন। এ মোর্চার অপরাপর নেতা ছিলেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন লাভ করে এবং মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৭টি আসন। বারবার কারাবরণের ফলে কারাগারে কমিউনিস্টদের সঙ্গে মওলানার যোগাযোগ ঘটে এবং তিনি সমাজতান্ত্রিক মতবাদ সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্টরা তাকে আদমজী জুটমিল মজদুর ইউনিয়নের এবং পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি করে। ১৯৫৪ সালের মে দিবসে তিনি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে দুটি বৃহৎ শ্রমিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। ওই বছরই তিনি পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সভাপতি হন। এর কিছুদিন পর তিনি কমিউনিস্ট প্রভাবিত আন্তর্জাতিক শান্তি কমিটির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি পদে আসীন হন এবং স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। এ সুযোগে তিনি ইউরোপের বহু দেশ ভ্রমণ করে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করেন। ইতোমধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং কৃষক শ্রমিক পার্টির দ্ব›েদ্বর কারণে যুক্তফ্রন্ট ভাঙনের সম্মুখীন হয়। আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি এ দ্ব›দ্ব মেটাতে পারেননি। এদিকে ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন এবং আতাউর রহমান খানকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারেও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মওলানার মতবিরোধ দেখা দেয়। প্রস্তাবিত পাকিস্তান সংবিধানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মওলানা তীব্র প্রতিবাদ করেন। সোহরাওয়ার্দী পৃথক নির্বাচনের পক্ষপাতি ছিলেন। মওলানা তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা বৈদেশিক নীতিরও বিরোধিতা করেন। তিনি চেয়েছিলেন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে কাগমারিতে আওয়ামী লীগের এক সম্মেলন আহŸান করেন। ওই সম্মেলনে তিনি সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন। এ মতবিরোধের কারণে দলে ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই বছর মওলানা ভাসানী ঢাকায় পাকিস্তানের সব বামপন্থী দলের একটি সম্মেলন আহŸান করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। তিনি এ দলের সভাপতি হন এবং এর সেক্রেটারি জেনারেল হন পশ্চিম পাকিস্তানের মাহমুদুল হক ওসমানী। এ সময় থেকে মওলানা প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতি অনুসরণ করতে থাকেন। তিনি আইয়ুব সরকারকে সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় হিসেবে গণ্য করেন এবং আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তাকে মুক্তি দানের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। বিরোধীদলের কঠোর আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসীন হন। রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। মওলানা নির্বাচন বয়কট করে নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে উপক‚লীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগ করেন। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার কারণে মওলানা প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে তিনি সর্বপ্রথম যে দাবিটি তোলেন তাহলো বাংলাদেশ ভ‚খÐ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ। ওই বছর ২৫ ফেব্রæয়ারি তিনি হককথা নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। অচিরেই পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পত্রিকাটি অল্পদিন পরই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মওলানা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি হুকুমত-ই-রব্বানী তরিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকার এবং ভারত-সোভিয়েতের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ছয়টি দল নিয়ে মওলানার নেতৃত্বে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। এ ফ্রন্ট ভারত-বাংলাদেশ সীমানা চুক্তি অবিলম্বে রদ এবং বিরোধীদলের বিরুদ্ধে নির্যাতনমূলক কর্মকাÐ বন্ধ করার দাবি জানায়। ৩০ জুন মওলানাকে গ্রেপ্তার করে টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে স্বীয় বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়। মওলানা ভাসানী ফারাক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করেন। তিনি ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে এক লং মার্চে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]