আইসিজে এবং আমাদের স্বপ্ন

আমাদের নতুন সময় : 13/12/2019

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ

আমাদের বিশাল স্বপ্ন যে আইসিজেতে বা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাতে যদি প্রমাণ করা যায় যে মিয়ানমার একটি গণহত্যাকারী রাষ্ট্র, তবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবে। আচ্ছা মেনে নিলাম, কোনো কারণে আইসিজে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হোল যে মিয়ানমারে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? এটা ঠিক যে, একটি নৈতিক বিজয় হবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার কি সমাধান হয়ে যাবে আইসিজিতে পাওয়া রায়ের সঙ্গে সঙ্গে? অবশ্যই নয়। আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই দিবাস্বপ্ন দেখছেন, আইসিজেতে মিয়ানমারের গণহত্যা প্রমাণিত হলে দেশটির নেত্রী আং সাং সুচির বিচার হবে। আমাদের অতি আবেগ মাঝে মাঝে আমাদের বিভ্রান্ত করে। আইসিজে আইন, ঝঃধঃঁঃব ড়ভ ঃযব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়ঁৎঃ ড়ভ ঔঁংঃরপব, ১৯৪৫, অনুযায়ী (৩৬ অনুচ্ছেদে) আইসিজে যে কোনো উদ্ভূত বিরোধ নিরসনে মোট চারটি বিষয়ে এখতিয়ার রাখেÑ ক. কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনগত ব্যাখ্যা প্রদান করার, খ. আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে উত্থাপিত কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়ার, গ. আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন প্রমাণে সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার এবং ঘ. আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্ষতিপূরণের প্রকৃতি ও পরিমাণ নির্ধারণ করার।
তাহলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা প্রমাণিত হলেও আইসিজেতে আং সাং সুচি কেন, অন্য কোনো ব্যক্তিরই বিচার হওয়া সম্ভব নয়। ব্যক্তির বিচার করার কোনো এখতিয়ারই নেই আইসিজের। উপরন্তু, গাম্বিয়া যে মামলাটি আইসিজেতে করেছে সেখানে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারটি মোটেও বিচার্য বিষয় নয়। আইসিজে আইনের অনুচ্ছেদ ৪১ অনুযায়ী গাম্বিয়া এই মুহূর্তে শুধু চাইছে যে মিয়ানমারে চলমান গণহত্যা বন্ধের একটি ‘প্রভিশনাল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের নির্দেশ যেন আইসিজে তার রায়ে দেয়। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব শরণার্থীরা মিয়ানমারে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বসবাস করছে তাদের কী হবে? আইসিজে কী এমন কোনো নির্দেশনা দেবে তার রায়ে? নাকি গাম্বিয়া এমন কোনো নির্দেশনা দেয়ার আবেদন করেছে? উত্তর হচ্ছে, না। তাহলে এই আইসিজে শুনানি থেকে বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন ঘটানোর কোনো নির্দেশ আসার সম্ভাবনা নেই। তবে বাংলাদেশ নিজে আইসিজের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। আইসিজে আইনের অনুচ্ছেদ ৬২ অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্র চাইলে ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাতে রহঃবৎাবহব করে বা পক্ষভুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপর আইসিজে থেকে ‘প্রভিশনাল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা চাইতে পারতো। সময় এখনো চলে যায়নি। আমরা চাইলে এখনো ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাতে রহঃবৎাবহব করতে বা পক্ষভুক্ত হতে পারি।
আমরা অনেকে স্বপ্ন দেখছি যে আইসিজেতে চলমান ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলার মাধ্যমে পুরো বিশ্ব মিয়ানমারের উপর একটা চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আসলেই কি তাই? আইসিজে আইনের ৫৯ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা আছে যে আইসিজের রায় শুধু মামলার পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক। অতএব, আইসিজের রায় শুধু গাম্বিয়া এবং মিয়ানমারের উপর বাধ্যতামূলক, আর কোনো রাষ্ট্রের উপর নয়। এই রায় নিয়ে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে কোনো বাধ্য বাধকতার মধ্যে ফেলতে পারবে না। আরেকটি ব্যাপার, আইসিজের মামলা চলবে বহু বছর। তবে বর্তমানে যে শুনানি চলছে মিয়ানমারের উপর ‘প্রভিশনাল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে, তার সিদ্ধান্ত আসলে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে? যদি মিয়ানমার তা না মানে, তবে আইসিজের হাতে আর কী পথ খোলা আছে?
আইসিজে আইনের ৪১(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি আইসিজে কোনো মামলাতে ‘প্রভিশনাল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেয়, তবে তার নোটিশ শুধু মামলা পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র সমূহকেই দেবে না, আইসিজে সেই ‘প্রভিশনাল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার নোটিশ জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল বা নিরাপত্তা পরিষদের কাছেও পাঠাবে। উদ্দেশ্য হলো আইসিজের রায় না মানা দেশের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে যেন নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু চীন এবং রাশিয়া ভেটো ক্ষমতা ব্যাবহার করে কিছুতেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেবে না। তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত : বাংলাদেশের উচিত আইসিজি আইনের ৬২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাতে রহঃবৎাবহব করে বা পক্ষভুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপর আইসিজি আইনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইসিজে থেকে নির্দেশনা চাওয়া। দ্বিতীয়ত : শুধু মিয়ানমার নয়, বরং সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি করা। লেখক : আইনজীবী ও আইনের অধ্যাপক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]