কাছ থেকে দেখা মহারাজ সৌরভ

আমাদের নতুন সময় : 13/12/2019

প্রভাষ আমিন

পিঙ্ক টেস্টের তৃতীয় দিনে আমরা ইডেনের ৩ নম্বর বক্সে কলকাতা ডেপুটি হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে খেলা দেখছিলাম। উদ্বোধনের দিনে এই বক্সটি নির্ধারিত ছিলো শেখ হাসিনা ও মমতা ব্যানার্জির জন্য। তখনো বক্সের দরজায় তাদেরই নাম লেখা ছিলো। তৃতীয় দিনে ভিভিআইপিদের ভিড় নেই। খেলাও তেমন জমেনি, তাই সব কিছুতে ঢিলেঢালা ভাব। হুট করে সেই বক্সে এলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। কিছুক্ষণ খেলা দেখলেন। মুন্নী সাক্ষাৎকারের আবদার করতে না করতেই বাংলাদেশ অলআউট, খেলা শেষ। গাঙ্গুলীর তাড়াÑ তাকে মাঠে যেতে হবে। ফিরে এসে হবে, বলেই উঠে চলে গেলেন। সিরিয়াসলি বললেন না তাৎক্ষণিকভাবে ঝামেলা এড়াতে বললেন, বোঝা মুশকিল। তবু ‘ফিরে এসে হবে’ এইটুকু আশ্বাসে ভরসা করে আমি আর মুন্নী নিচতলায় বেরোনোর গেটে দাঁড়ালাম। দাঁড়ালাম তো দাঁড়িয়েই রইলাম। কতো মানুষ, কতো তারকা আসে যায়, কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলীর কোনো খবর নেই। নিচতলায় সিঁড়ির ডানপাশে ভারতের ড্রেসিং রুম, বাঁ পাশে বাংলাদেশ। ভারতীয় দল বেরুবে বলে নিরাপত্তারক্ষীরা বেশ কয়েকবার আমাদের তাড়া দিলো। আমরা একবার ডানে তো একবার বাঁয়ে, এসব করে টিকে থাকলাম। কড়া নিরাপত্তায় ভারতীয় দল এবং অল্প নিরাপত্তায় বাংলাদেশ দল ইডেন ছাড়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু ‘দাদা’ আসেন না। এক ফাঁকে আমরা ভারতীয় ড্রেসিং রুম হয়ে মাঠেও ঢুকে পড়লাম। গিয়ে দেখি গাঙ্গুলীকে ঘিরে বেশ ভিড়। সবাই তার সাক্ষাৎকার নিতে চান। এই ভিড়ে আমি আর মুন্নীও ঢুকে পড়লাম। চট করে গাঙ্গুলী আমাদের দিকে ফিরে বললেন, উপরে আসো। ব্যস আমাদের আর পায় কে? আমরা তখন যেন ইডেনের মালিক বনে গেলাম। দাদার পিছু নিলাম। পদে পদে নিরাপত্তার বাধা। কিন্তু বারবার গাঙ্গুলীই মনে করে আমাদের তার সঙ্গে নিয়ে গেলেন। যেতে যেতে একপর্যায়ে নিজেদের আবিষ্কার করলাম ইডেন গার্ডেনে সৌরভ গাঙ্গুলীর রুমে। ক্লান্ত সৌরভ বসে কথা বলতে চাইছিলেন। মুন্নীর আবদার দাঁড়ালে ভালো হয়। তাই সই। মুন্নী যখন তার মোবাইল সামনে ধরলো গাঙ্গুলী বললেন, তুমি থাকবে না ফ্রেমে? আমি বললাম, আমার মোবাইলে পুরো ইন্টারভিউ রেকর্ড হচ্ছে। ইডেন গার্ডেনে দুই ক্যামেরায় ধরা দিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। আমরাও কাছ থেকে পেলাম গাঙ্গুলীর সৌরভ।
ছোট্ট ইন্টারভিউতে গাঙ্গুলী কথা বললেন নানা প্রসঙ্গে। স্মৃতিচারণ করলেন, বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের। বললেন, অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করেছিলো। আমাদের জিততে কষ্ট হয়েছিলো। পরে ছবি তোলার সময় আমি মনে করিয়ে দিলাম, বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ছিলো অধিনায়ক হিসেবে গাঙ্গুলীরও অভিষেক। একটু কি স্মৃতিকাতর হলেন গাঙ্গুলী? বাংলাদেশের ক্রিকেটের অকৃত্রিম বন্ধু সৌরভ। সেদিনের সাক্ষাৎকারেও বলতে ভোলেননিÑ ‘ঢাকায় গেলে মনে হয় কলকাতাতেই আছি।’ বাংলাদেশের দর্শকদের জন্যও তার কণ্ঠে গভীর মমতা। বললেন, আশা করি তাদের জন্য (বাংলাদেশের দর্শক) তাদের দল আরও ভালো খেলবে। কলকাতারই এক ক্রিকেট সংগঠন জগমোহন ডালমিয়ার ক্রিকেট ক‚টনীতির সুবাদে ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছিলো বাংলাদেশ। অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিলো ভারত। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো টেস্টে টস করতে নেমেছিলেন দুই বাঙালিÑ বাংলাদেশের নাইমুর রহমান দুর্জয় এবং ভারতের সৌরভ গাঙ্গুলী। কিন্তু ফিরতি সফরের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯ বছর। ডালমিয়ার মতো বাংলাদেশের বন্ধু যেমন আইসিসিতে ছিলেন, তেমনি ছিলেন শ্রীনিবাসনের মতো বিদ্বেষীরাও। এই শ্রীনিবাসনদের কারণে মাঝে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কে বিদ্বেষের অনেক বিষ জমেছে। গাঙ্গুলীর মতো বাংলাদেশের একজন সত্যিকারের বন্ধু এখন ভারতের ক্রিকেট কর্তা। আশা করি, গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কের বিষটুকু উবে যাবে, ফিরবে সুস্থ প্রতিযোগিতার ধারায়। এমনিতে অনেক আগেই প্রতিযোগিতার বিবেচনায় ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ-ভারত লড়াই। গাঙ্গুলী খেলা ছেড়েছেন প্রায় এক যুগ আগে। কিন্তু এখনও ডাউন দ্যা উইকেট গিয়ে তার ছক্কা মারার স্মৃতি ভোলেনি দর্শকরা। শুধু খেলা নয়, দাঁতে নখ কামড়ানো, চোখ পিটপিট করা, চিন্তা করার সময় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরাÑ সেসব মুদ্রাদোষ হারিয়ে যায়নি এখনো। সেই চেনা গাঙ্গুলীই, কলকাতার দাদা এখন ভারতীয় ক্রিকেটের মহারাজা। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]