• প্রচ্ছদ » » ১৩ ডিসেম্বর প্রত্যুষে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধাসহ রেহাই চরের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে মহানন্দা নদী পার হন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রæর বেশ কয়েকটি বাঙ্কার দখল করে নেন


১৩ ডিসেম্বর প্রত্যুষে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধাসহ রেহাই চরের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে মহানন্দা নদী পার হন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রæর বেশ কয়েকটি বাঙ্কার দখল করে নেন

আমাদের নতুন সময় : 14/12/2019

মুয়ায্যম হুসায়ন খান : বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সামরিক বাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের অফিসার, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে তার জন্ম। পিতা আব্দুল মোতালেব হাওলাদার ছিলেন মরমী গানের প্রতি আসক্ত এক সংসার বিবাগী ব্যক্তিত্ব। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুলাদির পাতারচর প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে মুলাদি মাহমুদজান পাইলট হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে বি.এসসি অর্নাস ক্লাসে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৭ সালে ১৫তম শর্ট সার্ভিস কোর্সে প্রশিক্ষণার্থী অফিসার ক্যাডেট নির্বাচিত হন এবং কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন্ড পদ লাভ করে তিনি ১৭৩ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৮ সালের ৩ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৯-৭০ সালে রিসালপুরে মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বেসিক কোর্স ট্রেনিং এবং পরে ইনফ্যান্ট্রি স্কুল অব ট্যাক্টিক্র থেকে অফিসার উইপন ও ডবিøউ কোর্স-১৩ সমাপ্ত করেন। ১৯৭০ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সোয়াতের সাইদুর শরীফে ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে তিনি তার তিনজন সহকর্মী ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার ও ক্যাপ্টেন আনামসহ গোপনে ৩ জুলাই কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং দুর্গম পার্বত্য এলাকা ও মুনাওয়ার তায়ী নদী অতিক্রম করে শিয়ালকোটের নিকটে সীমান্ত পার হন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে ৭নং সেক্টরের মেহেদিপুর (মালদহ জেলায়) সাবসেক্টরের কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। এ সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান ৭নং সেক্টরের সেক্টর-কমান্ডার ছিলেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কানসাট, আরগরার হাট ও শাহপুরসহ কয়েকটি সফল অভিযানে অসাধারণ নৈপুণ্য ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। ফলে ডিসেম্বর মাসে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের জন্য তাকে একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃত্ব দেয়া হয়।
পাকবাহিনী ইতোমধ্যেই নবাবগঞ্জ শহর প্রতিরক্ষার জন্য মহানন্দা নদীর তীরে তিন কিলোমিটার এলাকাব্যাপী বাঙ্কার নির্মাণ করে রাখে। এ বাঙ্কারে ছিলো পাঁচ ফুট গভীর গতায়াত পরিখা। লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়াল এবং জনপঞ্চাশেক মুক্তিযোদ্ধাসহ মহিউদ্দিন নওয়াবগঞ্জ শহরের পশ্চিমে বারঘরিয়া নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন (১০ ডিসেম্বর)। ১৩ ডিসেম্বর প্রত্যুষে তিনি এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধাসহ রেহাই চরের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে মহানন্দা নদী পার হন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রæর বেশ কয়েকটি বাঙ্কার দখল করে নেন। পাকিস্তানি বাহিনী তখন পশ্চাৎপসরণ করে নওয়াবগঞ্জ শহরে অবস্থান নেয় এবং একটি দালানের ছাদ থেকে মেশিনগানে অনবরত গুলি চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের শহরাভিমুখে অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখে। এই সংকটময় সময়ে মহিউদ্দিন শত্রæর মেশিনগান ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেন। তিনি বাঁ হাতে এসএমজি ও ডান হাতে একটি গ্রেনেড নিয়ে গোপনে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসেন। হামাগুঁড়ি দিয়ে রাস্তা পার হয়ে তিনি দ্রæত মেশিনগানবাহী বাড়িটির দিকে ধাবিত হন। ত্বরিত গতিতে তিনি মেশিনগান বরাবর গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরিত গ্রেনেডের আঘাতে মেশিনগানের স্থলটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। অকস্মাৎ রাস্তার পাশের একটি দোতলা বাড়ি থেকে শত্রæর একটি গুলি তার কপালে বিদ্ধ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন (১৪ ডিসেম্বর)। এতে হতোদ্যম না হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যার দিকে শত্রæর অবস্থানের উপর প্রচÐ আক্রমণ চালায়। গভীর রাত পর্যন্ত এ আক্রমণ অব্যাহত ছিলো। পাকসেনারা শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে নওয়াবগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ভোররাতে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ উদ্ধার করে তাকে ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভ‚মিকা ও আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভ‚ষিত করা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা এখনো তার স্মৃতি বহন করছে। এগুলো হলো বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজ (বর্তমান স্বরূপনগরে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর গেট (ঢাকা সেনানিবাস), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর হাইস্কুল (রহিমগঞ্জ), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সরণি (রাজশাহীর একটি সড়ক), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরি (বিআইডবিøউটিসি), বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ক্লাব (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com