বিজয় : ইতিবৃত্ত ও মর্মার্থ

আমাদের নতুন সময় : 15/12/2019

 

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

১৯৪৬-এর এপ্রিল মাসে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ লাহোরের উর্দু পত্রিকা ‘চাত্তানে’র সাংবাদিক সুরেশ কাশ্মিরীকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারের একটি পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, জিন্নাহ বাঙালির ইতিহাস জানে না, বাঙালিরা বেশি দিন বিদেশি শাসন পছন্দ করে না। কাজেই তারা পাকিস্তানের সঙ্গে একসময় থাকবে না। বাঙালি থাকেনি, ’৭১-এ বাঙালি স্বাধীন হয়েছিলো। তবে ’৪৭-এ পাকিস্তানের সঙ্গে জোড় বাঁধা হলেও বাঙালির স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়া সূচিত হয় ’৪৭ থেকেই। সে বছর আগস্ট মাসে পাকিস্তান হয়ে গেলে তখনই কলকাতার বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে কিছু সতীর্থকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘ওই মাউরাদের সঙ্গে বেশিদিন থাকা যাবে না’। বাঙালি বেশিদিন পাকিস্তানের সঙ্গে থাকেনি, ছিলো ২৪ বছর ৪ মাস ৩ দিন। ১৯৫৩তে শের-ই-বাংলা বললেন,
১৯৫৭তে মওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করার সময়ে পাকিস্তানকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন ‘আস্সালামু আলায়কুম’। ১৯৬১তে এক গোপন বৈঠকে বঙ্গবন্ধু কমরেড মণি সিংহ এবং কমরেড খোকা রায়কে জানিয়েছিলেন, বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কোনো আপোস করবেন না। ১৯৬৬তে ৬ দফার সারার্থ নিয়ে ধূ¤্রজাল তৈরি হলে এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু ন্যাপ (মস্কো) নেতা অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমেদকে বলেছিলেন, ‘আরে মিয়া, বুজলা না। দফা তো একটাই, গুরাইয়া কইলাম’। এই দফা যে স্বাধীনতার দফা তা সেদিন প্রশ্নকর্তা বুঝতে অপারগ হননি। ৬০ দশকের সূচনা থেকে গোপনে প্রয়াস চালানো ছাত্রনেতাদের অন্যতম বঙ্গবন্ধুর ভাজন আবদুর রাজ্জাক অনুযোগ করেছিলেন, ৬ দফায় কেন স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলো। বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিলো, ‘তোমাদের ওপারে যাওয়ার সাঁকো তৈরি করে দিলাম’। আবদুর রাজ্জাক এমন উত্তরের নিহিতার্থ বুঝেছিলেন। বিবিসিতে কর্মরত সৈয়দ শামসুল হকের প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ছিলো। ‘আমার দফা তিনটা। কতো নেছো, কতো দেবা, কবে যাবা’। স্বাধীনতার প্রণোদনা তৈরি হচ্ছিলো এভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে।

’৭০-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান আইনি কাঠামো আদেশ (খবমধষ ঋৎধসবড়িৎশ ঙৎফবৎ) জারি করে ৬ দফার আলোকে সংবিধান পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দিলেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা নির্বাচন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় বক্তব্য ছিলো, ‘নির্বাচন হয়ে গেলে আমি এল.এফ. ও. টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো। আমার লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা’।
’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও দলটি ক্ষমতাবঞ্চিত হলো, শুরু হলো উত্তাল মার্চ ’৭১। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা এলো : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শুধু স্বাধীনতা নয়, মুক্তির কথাও বলা হলো, স্বাধীনতার আগে ছিলো মুক্তির কথা। মুক্তির কথা বলা হয়েছিলো তিনবার, স্বাধীনতার কথা একবার। পরোক্ষ ও সাংকেতিক হলেও এই ভাষণই ছিলো স্বাধীনতার যথার্থ ঘোষণা। মার্চের ১৬ থেকে ২৪ চলেছিলো প্রহসনের আলোচনা, যার আড়ালে ইয়াহিয়া চক্র গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত করেছিলো। ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১-১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন, তার আগে বাণীবদ্ধ করা স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণায় তিনি বললেন, ‘সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। এভাবেই মাওলানা আজাদের ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে শুরু করলো। তিনি শত্রুর শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে বললেন। শুরু হলো বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন দেশকে শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে।

দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রক্রিয়া ছিলো ৮ মাস ২১ দিনের মুক্তিযুদ্ধ, যা ছিলো বিশ্বের সংক্ষিপ্ততম মুক্তি/স্বাধীনতা যুদ্ধ। অসম যুদ্ধ (ধংুসসবঃৎরপ ধিৎ) হিসেবেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো ব্যতিক্রমী। পেশাদার ও পরিপূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিপরীতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সিংহভাগই ছিলো তৃণমূলের আমজনতা, যারা জীবনে প্রথম অস্ত্র হাতে তুলেছিলো। কিন্তু এই অসম যুদ্ধে দুর্বলতর পক্ষের বিজয় হয়েছিলো, যার নানাবিধ কৌশলগত ) ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু আমি মনস্তাত্ত্বিক দিকটির উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করছি। ইতালীয় যুদ্ধ মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রাঙ্কো ফোরনারি বলেন, মা এবং মাতৃসম মাতৃভূমির জন্য মানুষ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। এই ত্যাগের মানসিকতা আমাদের মুক্তিযোদ্ধার ছিলো, কিন্তু যা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছিলো না। তারা ছিলো ভাড়াটে সৈন্যের মতো, আর বাংলাদেশর মাটি তাদের কাছে মাতৃসম মাতৃভূমি হতে পারেনি কখনো। মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যয়দীপ্ত মন-মানসিকতার রূপায়ণ করেছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। ১৯৪০-এর ১৩ মে তিনি কমন্স সভায় বলেছিলেন, ঠরপঃড়ৎু ধঃ ধষষ পড়ংঃং. ঠরপঃড়ৎু রহ ংঢ়রঃব ড়ভ ধষষ ঃবৎৎড়ৎ, ারপঃড়ৎু যড়বিাবৎ ষড়হম ধহফ যধৎফ ঃযব ৎড়ধফ সধু নব; ভড়ৎ রিঃযড়ঁঃ ারপঃড়ৎু ঃযবৎব রং হড় ংঁৎারাধষ. চার্চিল যেন ’৭১-এ আমাদের মনের কথা বলেছেন, তুলে ধরেছেন ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণকে। অন্যদিকে বিজয়-গর্বিত মুক্তিযোদ্ধার মানসিকতার বর্ণনা আছে ইংল্যান্ড বিজয়ী উইলিয়াম দ্য কনকয়েররের জবানিতে:
’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ছিলো বিজয়ের দিন, শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের দিন। কিন্তু এই বিজয় ছিলো খ-িত, শুধু সামরিক মাত্র, সর্বাত্মক বিজয় মানে যে মুক্তি তা তো তখনো অধরা। সেই কারণে বলি মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিলো ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর, আর মুক্তির যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ’৭১-এর ১৭ ডিসেম্বর থেকেই, যা আজও চলমান। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও মুক্তির যুদ্ধ চলতে হবে ততোদিন যতোদিন না বঙ্গবন্ধুর উক্তি অনুযায়ী (১০ জানুয়ারি ১৯৭২) ‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে’। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের সেক্টর ছিলো ১১টি, এখন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর অগণতি। ’৭১-মুক্তিযোদ্ধার নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিলো, এখন মুক্তির যুদ্ধে যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছাড়া সারাদেশের সব মানুষ। ’৭১-এ শত্রু চিহ্নিত ছিলো, এখন শত্রু ঘরে-বাইরে, সবখানে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ ছিলো কঠিন চ্যালেঞ্জ, এখন মুক্তিযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ কঠিনতর। ব্যষ্টিক-সামষ্টিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী ৎবংঢ়ড়হংব হলে না কী মানবিক সৃজন-প্রয়াসের স্ফূর্তি ঘটে, জীবন ও জগত সমৃদ্ধ হয়। এমন কথা ইংরেজ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবীর, যা তিনি বলেছেন তার
বাংলাদেশের বাঙালি স্বাধীন, তবে মুক্ত নয়। বিদেশির শৃঙ্খল থেকে স্বাধীন হলেও আমরা এখনো পরাধীন সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা কুশিক্ষা ও বৈষম্যের কাছে। এ দেশে এখনো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো না। সুতরাং ’৭১-এর বিজয়কে সম্পূর্ণ করতে হলে এখনো অনেক বিজয়ের প্রয়োজন আছে। বাঙালি শুধু যে লড়াকু, তা নয়, তারা স্বাধীনতাপ্রিয়-ও, তা তো মাওলানা আজাদ নির্দেশ করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ ফরাসিদের স্বাধীনতাপ্রিয়তা নিয়ে কথা বললেও বাঙালি নিয়ে এমন কোনো কিছু বলেননি। তার বিবেচনায় স্বাধীনতা ফরাসিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য : ‘সেই স্বাধীনতার উপর কেউ হাত দিয়েছে তো অমনি সমস্ত জাতি উন্মাদবৎ প্রতিঘাত করবে। কেউ কারও চেপে বসে হুকুম চালাতে পারে না, এটাই ফরাসি চরিত্রের মূলমন্ত্র’। মনে হয় স্বামী বিবেকানন্দ বাঙালির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অভিন্ন মন্তব্য করতে পারতেন। ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ বাংলা একাডেমি আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনায় প্রদত্ত একক বক্তৃতা।
লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল্স (বিইউপি)




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]