• প্রচ্ছদ » » হৃদয় থেকে, সততা দিয়ে আমি তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি


হৃদয় থেকে, সততা দিয়ে আমি তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি

আমাদের নতুন সময় : 15/12/2019

 

ডা. নুজহাত চৌধুরী

হৃদয়ের সবটুকু আন্তরিকতা ও সততা দিয়ে আমি তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এ বাংলায় প্রতিষ্ঠার কাজটি এখনো অসমাপ্ত এবং সেই যুদ্ধ এখনো চলছে বলে আমি মনে করি। সেই যুদ্ধের অংশ মনে করেই তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি এবং সে কাজটি আমি তীব্র আবেগ নিয়ে করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শুধু ইতিহাসের পরিসংখ্যান নয়, মুক্তিযুদ্ধের শোকগাথা যদি প্রোথিত করে দিতে পারি তরুণদের হৃদয়ে, তবে তারা প্রগাঢ়ভাবে দেশপ্রেমিক হবে, কখনো এ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, কখনো দেশের সঙ্গে বেইমানি করবে না, দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করবে না, কখনো রাজাকারদের সঙ্গে হাত মেলাবে না এবং সবচেয়ে বড় যে আশায় আমি চিকিৎসকের ব্যস্ত জীবনের বিশ্রামের সময়টুকু জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াই তা হলো যদি তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, শহীদদের কথা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে তাহলে তাদের মধ্য থেকে হয়তো কোনোদিন কোনো এক গ্রাম থেকে আবার কোনো এক খোকা বঙ্গবন্ধু হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াবেন। দিনে দিনে যে বিশাল পঙ্কিলতার দেনা জমেছে, যে ভুলের পাহাড় গড়ে উঠেছে, আমাদের আপসের কারণে রাজাকারদের অপরাজনীতি যে মহীরুহ হয়ে উঠেছে, তার সব কিছু নিঃশেষ করে দিতে আবার সেই ভরাট কণ্ঠে কোনো এক তরুণ ডাক দেবে, ‘এবারের সংগ্রাম…’ আমি সেই চরম একটি যুদ্ধের আশায়, আদর্শিক লড়াইয়ের শেষ বিজয় দেখার আশায়, আরেকবার বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে যাওয়ার লোভে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে বঙ্গবন্ধুর কথা বলে বেড়াই। তাদের ভেতর থেকে কেউ বঙ্গবন্ধু হবে সেই আশায়। তরুণদের কাছে কথা বলতে গেলেই আমার মনে পড়ে বাবার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটির কথা। মনে পড়ে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মাথা উঁচু করে যুদ্ধে যাওয়া রুমীর কথা, মনে হয় বীরাঙ্গনা মায়েদের কথা। আমার খালি মনে পড়ে এই তরুণরা, যারা আমার ভবিষ্যৎ নেতা, তারা বোঝে কি না তাদের এই সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রায় পাঁচ দশক আগে তাদেরই বয়সী কতো তরুণ, গুডস হিলের সেই নির্যাতন কেন্দ্রে কি তীব্র নির্যাতনের জাঁতাকলে মাথা পেতে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। সেই তরুণেরও মা ছিলো, হয়তো প্রেয়সী ছিলো, ছিলো স্বাভাবিক একটি জীবনের আকাক্সক্ষা। মৃত্যুকে সেও চায়নি, নির্যাতনকে নিশ্চয়ই সেও ভয় পেতো। তবু তারা গিয়েছিলো। সব জেনে-বুঝে। নিজেদের বর্তমানকে তারা উৎসর্গ করেছিলো, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো থাকে, যেন স্বাধীন সোনার বাংলার প্রতিটি মানুষ সুখী হয়। আমি এটুকুই তরুণদের বোঝাতে চাই। আমার চোখ দিয়ে প্রতিবারই অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকে। আমি ব্যাকুলভাবে তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি, তারা বুঝলো কি না আমার কথা, তাদের বুকে বিঁধলো কিনা দেশপ্রেমের তীব্র দহন। যদি তারা বোঝে তাহলেই শুধু সার্থক হবে এতো আত্মদান। কারণ একবার যদি দেশপ্রেমের আগুন স্পর্শ করে কারও হৃদয়, তবে সে আগুন তাকে চিরকাল পুড়িয়ে খাঁটি করে রাখবে, এ আমি বিশ্বাস করি।

যদি তরুণ প্রজন্ম দেশপ্রেমের আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, তাহলে তারা কখনো দেশের মানুষের হক্ব মারবে না, তারা দুর্নীতি করবে না, দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবে না, কোনো মানুষকে অপমান করবে না। তারা বুঝতে পারবে তাদের এ সুন্দর জীবনের পেছনে আছে কতো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সে কৃতজ্ঞ হবে, বিনয়ী হবে। রাজা হবে না, সেবক হবে। এ অর্জন তার নয়, নাম না জানা মুটে-মজুর আর কৃষকের, সে তা অনুধাবন করে নিজের সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করবে জীবনে। এই আশায়ই কথা বলি। এই আশায়ই পথ চলি। কিন্তু মাঝে মাঝে এতো বড় ঝাঁকুনি আসে বিশ্বাসে যে কথা বন্ধ হয়ে যায়, কলম চলে না, পা থেমে যায়। যে তরুণ ছোট ভাইদের ডাকে ছুটে যাই, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, বঙ্গবন্ধুর কথা বলি, হৃদয় রক্তাক্ত করে বারবার চোখের জলে নিজের ব্যথা উপস্থাপন করে বাবার কথা বলি, বাবাকে আকুল হয়ে খুঁজে ফেরা একটা ছোট মেয়ের কথা বলি, যাদের উপর ভরসা করি, তাদের যখন দেখি অমানবিক কাজ করতে, তখন স্তম্ভিত হয়ে যাই। যারা তরুণ, যারা নবীন রাজনীতিবিদ তাদের কিছু বিষয় বুঝতে হবে। আওয়ামী লীগ তৃণমূল থেকে মানুষের জন্য রাজনীতি করে গড়ে ওঠা দল। আদর্শের জন্য রক্ত ঝরানো দল। স্বার্থের জন্য বন্দুকের নল দিয়ে গায়ের জোরে তৈরি করা দল নয়। অনেক ত্যাগ ও রক্ত ঝরিয়ে আওয়ামী লীগ মানুষের বুকে অবস্থান করে নিয়েছে। সুতরাং শুধু জয় বাংলা স্লোগান দিলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হওয়া যায় না, শুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি পোস্টারে লাগালেই আওয়ামী লীগার হওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ করতে হলে আদর্শিক সততা থাকতে হবে, ইতিহাস পাঠ করতে হবে, মানুষের জন্য ত্যাগের রাজনীতির চর্চা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির অর্থ বুঝতে হবে, তার চর্চা করতে হবে। আজকের নবীন রাজনীতিবিদরা তা বোঝেন কী?
বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশিরভাগ সময় জেলে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হাতে গোনা কয়টা দিন। আগরতলা মামলায় জেলে থাকার সময় জানতেন ফাঁসি হবে, ভাবনায় প্রধানমন্ত্রিত্বের কথা আনাও ছিলো অসম্ভব। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আপোস করেননি। জীবন দিয়ে বিশ্বস্ততার দাম চুকিয়েছেন। সেই বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ, সেই জাতীয় চার নেতার দল আওয়ামী লীগ। যদি নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী বা নেতা দাবি করতে চান তাহলে আগে অন্তরে সেই আদর্শিক দৃঢ়তা, চারিত্রিক সততা তৈরি করুন। দলের চেয়েও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বড়। যদি সত্যি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মানুষ মনে করেন তবে নিজেকে আদর্শিকভাবে পরিশুদ্ধ করুন যেন আপনার হাতে দেশ, দেশের মানুষ নিরাপদ থাকে। এই দেশটা ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমানত। এই আমানতের খেয়ানত করলে, তার জবাব দিতে হবে ইতিহাসের কাছে। সততায় হয়তো আপনার তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি কম হবে, কিন্তু মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান লাভ করে বঙ্গবন্ধুর বা তার কন্যার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারবেন। লেখক : শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]