• প্রচ্ছদ » » ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি পালিত হয়েছিলো জাতীয় শোক দিবস


১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি পালিত হয়েছিলো জাতীয় শোক দিবস

আমাদের নতুন সময় : 17/01/2020

উদিসা ইসলাম : মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের স্মরণে ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি নতুন সরকার জাতীয় শোক দিবস পালন করে। মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, যাদের প্রাণের বিনিময়ে লাল সবুজ পতাকাÑ শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে এদিন তাদের স্মরণ করেছে জাতি। দিনটিতে স্মৃতিসৌধ তৈরির সিদ্ধান্তসহ বেশ কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার খবর পাওয়া যায় সেই সময়ের গণমাধ্যমে। অমর শহীদ স্মৃতি জাতীয় পতাকা আজ অর্ধনমিত রাখা হয়। উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। নিয়ম করে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা কালোব্যাজ ও কালো বাহুবন্ধনী ব্যবহার করেন। দৈনিক বাংলার ১৬ জানুয়ারির সংবাদপত্রে লিড স্টোরিতে ছিলো জাতীয় শোক দিবসের খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রাণের সব সম্ভ্রম দিয়ে স্মরণ করছি তাদের যারা নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন বাংলাদেশে দখলদার বর্বর সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী নরপশুদের হাতে। আজ একটি স্বাধীন জাতির নাগরিক হিসেবে আমরা তাদের স্মরণ করছি। মুক্তি সংগ্রামের তাৎপর্য ও আগামী দিনের দায়িত্ব সম্পর্কে অনুষ্ঠিত হয় বেশ কিছু আলোচনা সভা। বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় শোকসভা ও শোভাযাত্রা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, সেবামূলক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালন করে। গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন জাতীয় নেতৃবৃন্দ।
দেশব্যাপী জাতীয় শোক দিবস পালনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই দিনে সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। কালোব্যাজ ও বাহুবন্ধনী ধারণ বাধ্যতামূলক এবং উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়। জাতীয়ভাবে দিনটিকে স্মরণের যাবতীয় প্রস্তুতি ছিলো। শোকে মুহ্যমান একটি জাতি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তার প্রাথমিক প্রচেষ্টাও ছিলো দিনটিকে ঘিরে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহŸান জানান।
দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছেÑ বঙ্গবন্ধু এদিনও এই শঙ্কা প্রকাশ করেন এবং ষড়যন্ত্রের সব প্রচেষ্টা ধ্বংস করে দিতে হবে বলে তার বক্তৃতায় আহŸান জানান। তিনি দলের এক সভায় কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ষড়যন্ত্র রুখে দিতে তাকে সরকারে আসতে হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের গোরস্তান হবে বাংলাদেশ। দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের সামনে অশ্রæসিক্ত চোখে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি কখনো প্রধানমন্ত্রী হতে চাইনি। আমি শুধু আমার জনগণের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘শত্রæকে মোকাবেলার আহŸান জানিয়েছিলাম। বাংলার জনগণ তাতে সাড়া দিয়েছিলো। আমি জানতাম আমার জনগণ এমনটাই করবে। তাই কারারুদ্ধ থাকাকালীন এমনকি প্রায় মৃত্যু জেনেও আমি তাদের সামনে মাথা নিচু না করার সিদ্ধান্ত নিই। আমি জানি, আল্লাহ আমাদের ইচ্ছা পূরণ করবেন’। তিনি তার বক্তৃতায় আরও বলেন, ‘সংগ্রামে আমরা কতো শেখ মুজিবকে হারিয়েছি। পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। ফেরাউন-নমরুদের সঙ্গেও তাদের তুলনা চলে না’। শহীদদের ঋণ শোধ করতে হলে যারা আপনজন হারিয়েছেন তাদের মুখে হাসি ফেরাতে হবে। সবার আগে দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন জাতির জনক। দলীয় কর্মীদের সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে একটি সুখী জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করার আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দল গণতান্ত্রিক দল। জনগণের ইচ্ছার উপর ভিত্তি করেই সরকার গঠন করা হয়েছে। পার্টির মাধ্যমেই জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। এ সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোন কোন দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এখনো কারা যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেননি এবং যুদ্ধকালীন আটকে থাকা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ছিলো নিয়মিত আয়োজনে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে নানা উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ও পরিলক্ষিত হয়। জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়কে কীভাবে দেখা হয়েছে সে সবের আলোচনা নিয়েও লেখা প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু সেই সময়ের স্মৃতি থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে নৃশংসতার স্মৃতি সেসব আসলে বিভীষিকা। লাখো প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীন দেশÑ নাগরিক হিসেবে শহীদদের স্মরণ করা আমাদের কর্তব্য ছিলো। এখনো সে সব বিভীষিকা মনে হলে আঁতকে উঠতে হয়। কী নির্মম সময়। পরবর্তীতে সেই দোসরদের বিচারের কাঠগড়ায় দেখে অনেক কষ্ট লাঘব হয়েছিলো। ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জরুরি সরকারি প্রেসনোট জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকার সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব বেসামরিক কর্তৃপক্ষের এবং আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে কেবল তারাই ব্যবস্থা নিতে পারবে। দালাল ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেসামরিক সংস্থাগুলোকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুসারে, সব অপরাধীর বিচার করা হবে। সরকারের কাছ থেকে বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত বেসামরিক পুলিশ অথবা সংস্থাসমূহ ছাড়া আর কেউ কোনোরূপ গ্রেপ্তার, তল্লাশি অথবা আটক করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত ছিলো সবচেয়ে বড় বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের গণমাধ্যমও বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে জনমত তৈরি করেছে। তাদেরই একজন ভারতের সংবাদ পরিক্রমার পাঠক দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় সে সময় দেশে এলে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মিরপুর মোহাম্মদপুর থানা কমান্ডার শহীদুল হক (মামা) গ্রæপের পক্ষ থেকে ধানমন্ডিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এ সময় বিভিন্ন সেক্টরের প্রধান ও গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর নৃশংসতার ফলে ছাত্রসমাজ যে দুঃখ, কষ্ট ও অসুবিধা ভোগ করেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সকল সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বেতন মওকুফ করে দেয়। হ্যান্ডআউটের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের বেতন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে সে বিষয়েও সরকারের ভাবনা আছে বলে জানানো হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো শহীদদের স্মৃতি জাগ্রত রাখতে একটি সৌধ নির্মাণের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে রমনা রেসকোর্স ময়দানে একটি জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু ১৫ জানুয়ারি এ ঘোষণা দেন। বাসসের সংবাদ বলছে, আওয়ামী লীগের এক সভায় বঙ্গবন্ধু এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাংলাট্রিবিউন। পত্রিকা কার্টেসি : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]