পাটকল যেন লাভজনক হয়

আমাদের নতুন সময় : 19/01/2020

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

দেশে পাটকল শ্রমিকরা অবশেষে মজুরি পে-¯িøপ পেতে শুরু করেছেন। আগামী সপ্তাহে শ্রমিকরা বকেয়া বেতন পাবে বলে আশা করছেন। দীর্ঘদিন থেকে দেশের জুটমিলগুলোতে কর্মরত শ্রমিকরা বকেয়া পরিশোধের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। কয়েকবার প্রতিশ্রæতিও দেওয়া হয়েছিলো তাদের দাবি মেনে নেওয়ার। ২০১৫ সালে সম্পাদিত চুক্তি প্রায় চার বছর সময় লেগেছে বাস্তবায়ন করতে। দেশের ৩২টি পাটকলের মধ্যে ২২টি পাটকল/জুটমিল, ৩টি নন-জুটমিল, ১টি বন্ধ মিল, ৬টি পুনঃগ্রহণকৃত মিল। এগুলোতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৭০ হাজারের মতো, কর্মকর্তার সংখ্যা ৫,৫০০ জন। মিলগুলো ক্রমাগত লোকসানে যাচ্ছে। সে কারণেই শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া থেকে যাচ্ছে। প্রায় ৬-৭ মাস বকেয়া রয়েছে এমন শ্রমিকের সংখ্যা কম নয়। অনেক দেনদরবারের পর অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেওয়ায় পে-¯িøপ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সে কারণে জুটমিলগুলোর শ্রমিকরা পে-¯িøপ পেয়ে খুশি, ধন্যবাদ জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রশ্ন হচ্ছে কতোদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লোকসানী প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শ্রমিকের বকেয়া বেতন পরিশোধ করবেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রশ্ন তুলেছেন কেন রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিলগুলো লাভের মুখ দেখছে না। অথচ বেসরকারি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে লাভ করছে, চলছেও ভালো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিলগুলোর ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশে একসময় আদমজী জুটমিল বিশ্বে প্রসিদ্ধ ছিলো। সেই আদমজী লোকসান টানতে টানতে অনেকবারেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকার সেটি বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশে আরও অনেকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। অথচ পাটের উৎপাদন বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি হয়। পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা কমেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই, বরং পণ্য বৈচিত্র্যে পাটজাত দ্রব্য পৃথিবীর দেশে দেশে চাহিদা তৈরি করছে। দেশেও যুগোপযোগী পাটজাত পণ্য সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে। বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পাটজাত পণ্য উৎপাদন, বিপণন এবং রপ্তানিকরণে যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ জুট মিলস্ করপোরেশন তথা বিজেএমসি পরিচালিত বেশিরভাগ জুটমিল। স্বাধীনতার পর থেকে জুটমিলের সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে কম কথা হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্যাই বড় হয়েছে, সমাধান খুব বেশি হয়নি। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরে চলে গেছেন। তাদের পরিবারগুলো খুব বেশি দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশে জুটমিল এখন প্রায় ভুলে যাওয়া শিল্প কল-কারখানায় পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় কল-কারখানা মানেই জুটমিল একনামেই দেশব্যাপী পরিচিত ছিলো। এখন যেমন গার্মেন্টস শব্দের সঙ্গে সবাই পরিচিত। সেই জুটমিলের কথা নতুন প্রজন্ম খুব একটা জানে না। জীবন্মৃত জুটমিলগুলোর শ্রমিকরা যখন বকেয়া পাওনার দাবিতে আন্দোলন করে, রাস্তাঘাট অবরোধ শুরু করে তখন খবর হয় দেশে জুটমিল নামক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমন বিবর্ণ চিত্রের কথা আমরা কেউ আগে ভাবতে পারিনি। অথচ সম্ভাবনাময় এই জুটমিল আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবন তথা জাতীয় অর্থনীতি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জুটমিলগুলোকে আধুনিকায়ন করা গেলে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করা গেলে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারতো। বিশ্বে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উৎকণ্ঠা বেড়েই চলছে। পলিথিনের ব্যবহার নিয়ে সারা পৃথিবী উদ্বিগ্ন। অথচ আমাদের পাটজাত ব্যাগ এবং নানা ধরনের উদ্ভাবিত পণ্যসামগ্রী পরিবেশবান্ধব, টেকসই, দৃষ্টিনন্দন, সহজলভ্য ইত্যাদি গুণেই গুণান্বিত হতে পারে। বাজার সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের বহুমাত্রিক ব্যবহার, পণ্য উৎপাদন, ব্যবহার ইত্যাদির কথা গুরুতের সঙ্গে বলে থাকে। কিন্তু আমাদের বিজেএমসি পারেনি এ পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যসামগ্রীর উদ্ভাবন, উৎপাদন ও রপ্তানির কোনো পরিকল্পনা তৈরি করতে। এই প্রতিষ্ঠানটি পাটকলগুলোকে বহু বছর পুরনো যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনায় আবদ্ধ রেখেছে। এগুলো প্রথাগত পাটকলের ধারণা ও উৎপাদন থেকে বের হতে পারেনি। ফলে পাটের চাহিদা যেমন এ সব কল-কারখানা সৃষ্টি করতে পারেনি, নিজেরাও পাটজাত পণ্য উৎপাদন করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে দায় কার? কতোটুকু সেটি এখনো পর্যন্ত নিরূপণ করা হয়নি। অথচ এখানে কর্তৃপক্ষের যেমন বড় দায় রয়েছে, একইসঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরে নানা ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন নামধারী প্রতিষ্ঠানের নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থও এখানে কম নয়। উভয় শক্তির স্বার্থের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছেন ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। যারা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পানির দামে ক্রয় করে নিজেরা লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেকে জুটমিল কিনেছে, কিন্তু চালায়নি। অর্থ ও সম্পদের লোপাট করেছে। এ রকম নানা কাহিনি আছে বিভিন্ন জুটমিলকে কেন্দ্র করে। সে কারণেই এখন ৭০ হাজার পাটকল শ্রমিকের বেতন বকেয়া পড়ছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য উৎপাদন ও বিপণন ঘটাতে পারলে দেশের পাট উৎপাদন এবং পাটজাত পণ্যের নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলাদেশে একচেটিয়াভাবে গড়ে উঠতে পারতো। গার্মেন্টস নিয়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হয় অনেক দেশের সঙ্গে। কিন্তু পাট বা পাটজাত পণ্য নিয়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হতো না। আমরা নিজেরাই অপ্রতিদ্ব›দ্বী। কিন্তু এই অপ্রতিদ্ব›দ্বী জুটমিল এখন কীভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে সেটি দেখে আমাদের মন কতোটা কাঁদে জানি না। তবে এখন যে ৭০ হাজার শ্রমিক পে-¯িøপ পেলেন তাদের মুখে যে হাসিটি আসছে তার স্থায়িত্ব কতো দিনের। পাট ও পাটজাত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ঘটিয়ে যদি আমরা এই শিল্পকে ঢেলে সাজাতে পারি তাহলে আমাদের দেশে লাখ লাখ মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য পাট ও পাটশিল্পে আবার ফিরে আসতে পারে। সরকারকে বিজেএমসিকে কঠোর অবস্থানে নেওয়ার মাধ্যমে দেশের পাটশিল্পকে একুশ শতকের উপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতেই হবে? লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com