ইতিহাস : শুনে নয়, জেনে বলুন

আমাদের নতুন সময় : 27/01/2020

মাসুদ রানা :  বাঙালি জাতির ইতিহাসবোধ খুবই ভ্রান্তিপূর্ণ। এটি যেমন জাতীয় ক্ষেত্রে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সত্য। আর এটি হয়ে থাকে ইতিহাস জেনে নয়, শুনে বলার সহজ প্রবণতা থেকে।
জাতীয় : বাংলা ভাঙলো কারা? এর জনপ্রিয় ও ভুল উত্তর হচ্ছে ‘মুসলমানেরা’। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রথম আদম শুমারির শুরু থেকে যেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত ও সর্ববিদিত যে, সমগ্র বাংলায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেখানে মুসলিম নেতা ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সেখানে বাংলার ভাঙন মুসলমানেরা চাইবে কেন? ধর্মের ভিত্তিতে ভারতের ভাঙন চেয়েছে মুসলিম লীগের নেতারা যার অন্যতম ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই চাওয়ার ভিত্তিতে যে আইন তৈরি হয়েছিলো তাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ প্রদেশ হিসেবে সমগ্র বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিলো। বাংলার ভাঙন মুসলিম লীগের দাবি হতেই পারে না। কারণ তখন বাংলা ছিলো তাদের নেতৃত্বাধীন। বাংলার ভাঙ্গন চেয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু করে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী দল হিন্দু মহাসভা এবং তাদের আন্দোলনের মুখে আইন পরিবর্তন করে বাংলাকে ভাগ করা হয় ধর্মের ভিত্তিতে। কৌতুকের বিষয় হচ্ছে এই যে, এতো বড় একটি সত্য ঘটনাকে পুরো উল্টে ফেলে ‘বাংলার ভাঙনের জন্য মুসলমান বাঙালি দায়ী’ বানানো হলো এবং খোদ বাঙালি মুসলমানেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করলোÑ হিন্দুরা তো বটেই। সৌভাগ্যবশত বাঙালি হিন্দু পটভ‚মির কতিপয় স্কলার একসময় প্রতিষ্ঠিত মিথ্যাটিকে উন্মোচন করে প্রকাশ করলেন যে, বাংলার ভাঙনের জন্য মুসলিমরা নয়, দায়ী হচ্ছে বাঙালি হিন্দু নেতৃত্ব।
আন্তর্জাতিক : বাঙালিদের মধ্যে একটি অদ্ভুত দাবি লক্ষ্য করি : স্তালিন নাকি হিটলারের সঙ্গে একটি মৈত্রী চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে হিটলার-স্তালিন মৈত্রী চুক্তি বলে কোনো চুক্তি নেই। প্রসঙ্গটি এসেছে সুভাষ বসুকে নিয়ে করা আমার একটি সম্প্রতি পোস্ট থেকে। সুভাষ বসুর হিটলারের কাছে আশ্রয় নেওয়া এবং তার সহযোগী হওয়া ঘটনাকে জায়েজ করতে গিয়ে একাধিকজন হিটালের সঙ্গে স্তালিনের ‘মৈত্রী চুক্তি’ ও ‘হাত মেলানোর’ উল্লেখ করেছেন। বস্তুত এটি একটি জনপ্রিয় ভ্রান্ত ধারণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারের নেতৃত্বধীন জার্মানির সঙ্গে স্তালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ১০ বছরের জন্য যে একটি যুক্তি হয় ১৯৩৯ সালের ২৩ অগাস্ট, সেটি কোনো ‘মৈত্রী চুক্তি’ ছিলো না। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশ মন্ত্রী মলটভ ও জার্মান বিদেশ মন্ত্রী রিবেন্ট্রোপের মধ্যে একটি অনাগ্রাসন বা অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ইংরেজি নাম হচ্ছে ‘ঞৎবধঃু ড়ভ ঘড়হ-অমমৎবংংরড়হ নবঃবিবহ এবৎসধহু ধহফ ঃযব টহরড়হ ড়ভ ঝড়ারবঃ ঝড়পরধষরংঃ জবঢ়ঁনষরপং’.
আমাদের বুঝতে হবে, মৈত্রী চুক্তি ও অনাক্রমণ চুক্তির মধ্যে পার্থক্য আছে। মৈত্রী (সামরিক) চুক্তির বলে চুক্তিবদ্ধ একপক্ষ একে আক্রান্ত বা আক্রমণ করলে অন্যপক্ষ তার সাহায্যে দাঁড়ায়, কিন্তু অনাক্রমণ চুক্তির ফলে একে অন্যের উপর আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে এবং এক পক্ষ তৃতীয় পক্ষের কাউকে আক্রমণ করলে বা আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষ নিরপেক্ষ থাকে। জার্মান-সোভিয়েত অনাগ্রাসন বা অনাক্রমণ চুক্তিটির মেয়াদ ছিলো ১০ বছরের, যা ১৯৪৯ সালের ২৩ আগস্টে সমাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু হিটালের জার্মানি ১৯৪১ সালের ২২ জুন চুক্তি ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। সে বছরের ৩০ জুলাই চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। ২৫/০১/২০২০, লÐন, ইংল্যাÐ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]