• প্রচ্ছদ » » টিভি রিপোর্টারের ওপর হামলা, ‘বাটাম’ সংস্কৃতির উত্থান ও বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ


টিভি রিপোর্টারের ওপর হামলা, ‘বাটাম’ সংস্কৃতির উত্থান ও বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ

আমাদের নতুন সময় : 13/02/2020

কাকন রেজা : একজন টিভি রিপোর্টার ও ক্যামেরা পার্সনের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের মারধোর করা হয়েছে। যারা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে যাচ্ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সে কারণেই তাদের ওপর হামলা। এ নিয়ে অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। বিচার চেয়েছেন। প্রশ্নটা এই ‘চেয়েছেন’ জায়গাটিতেই। আমার সাংবাদিক পুত্রও খুন হয়েছেন। সাংবাদিকতার জগতে এই খবর জানা সকলের দরকার। জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মুখে মানববন্ধন হয়েছিলো সেই ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন ওরফে ফাগুন রেজা হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে। যে মানববন্ধনে ফাগুনের বড় জ্যাঠা আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্বয়ং নিজেও দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর আটমাস পার হয়ে গেছে, এখনো হত্যাকারী ধরা পড়েনি, বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। ফাগুনের চলে যাওয়ার আট মাস, আর সাগর-রুনি চলে গেছেন আট বছর। আজও আমাদের মতন দু’চারজনকে লিখতে হচ্ছে সেই হত্যাকাÐের বিচার চেয়ে। অথচ গণমাধ্যমের বেশির ভাগ মোড়লরা চুপ। এই ‘চুপ’ই সেই প্রশ্নটার সম্ভাব্য উত্তর; আমরা আসলেই বিচার চাই কিনা। চাইলে হয়তো সব হত্যার বিচারই হতো। থামতো এই মৃত্যুর মিছিল, নির্যাতন আর হামলার প্রক্রিয়া। এক দশক আগের কথা বলছি। যখন গণমাধ্যমকর্মীদের আলাদা একটা মর্যাদা ছিলো। কোথায় গেলে অন্তত এক কাপ চা সাধা হতো। আর এখন ‘পোলাপাইনে’র ভাষায় ‘বাটাম’ দেওয়া হয়। এই ‘বাটাম’ দেওয়া ও প্রাপ্তির দাবিদার কিন্তু আমরাই। আমাদের গণমাধ্যমকর্মীদের লেজুরবৃত্তিই এই ‘বাটাম সংস্কৃতি’র উত্থানের কারণ। এই লেজুরবৃত্তি শুধু নিজেদের জন্য ‘বাটাম সংস্কৃতি’র উত্থান ঘটায়নি, পুরো সংস্কৃতিটাই ‘বাটাম’ময় হয়ে গিয়েছে। খবরে দেখুন, যে যেখানে যাকে সুযোগমতো পাচ্ছে ‘বাটাম’ দিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং বলতে পারেন, ‘বাটামকাল’ পাড়ি দিচ্ছি আমরা। আর এ অবদান অনেকটা গণমাধ্যমেরই। সেই অবদান লেজুরবৃত্তির।
‘কতোটুকু ব্যথা পেলে তোমারও কান্না পাবে, আমার ঘরের আগুন কখন তোমার ঘর পোড়াবে। কতোটুকু ক্ষতি চাই তোমাকে জাগাতে হলে, তোমাকেও পাশে পাবো কতোটুকু কেড়ে নিলে।’ এটা একটা গানের কথা। শায়ানের গাওয়া গান। অনেকে বলবেন, কে এই শায়ান। তাদের বলি, পদ্মভূষণ, একুশে পদক পাওয়া গুণিজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সামনে দাঁড়িয়ে যে মেয়েটি গেয়েছিলো, ‘স্বাধীনতার পক্ষে শক্তি তোমার কাছে বলি, আমার যত স্বাধীনতা সেসব এখন কই?’ তার গানে গানে করা এই প্রশ্নের জবাব দেয়া অনেকের পক্ষেই অনেকাংশেই অসম্ভব। কেন অসম্ভব তার ব্যাখ্যাটাও খুব কঠিন নয়। এই ব্যাখ্যার কথা বলতে গেলেও হয়তো কেউ বলবেন, ‘উঁচু গলায় এসব বলার কী দরকার!’ জানি, আপনাদের এমন কথা মঙ্গলকামনা থেকেই উৎসারিত। কিন্তু আমরা কেন বলি তার উত্তর শায়ানের গানের কথাতেই রয়েছে। শায়ান বলেছেন, ‘খোয়া গেছে আমার সব, তাই কেটে গেছে ভয়; সব হারিয়ে বুঝেছি, ঘুমিয়ে থাকার সময় এটাতো নয়। আমি জেগে আছি, আমি বেঁচে আছি ঘুমোতে পারি না বলে; তোমার মনের কড়া নেড়ে চলি, তোমাকে জাগাবো বলে।’ হ্যাঁ সে কড়া নাড়তেই আমাদের বলা, যাতে আপনাদের বুকের মানিক হত্যা আর নির্যাতনের শিকার না হয়। আপনাদের চোখও সারাদিন জলে অবরুদ্ধ না থাকে।
সাগর-রুনি’র মেঘ এখন বড় হয়ে গেছে। বাবা-মা হারা সন্তান, আর আমরা সন্তানহারা বাবা-মা। আমাদের কষ্টটা আমরাই বুঝি। শায়ান সেজন্যেই গেয়েছেন, ‘আমিতো আপনহারা তাই এত চিৎকার, আমিতো নিয়েছি আমার দু’কাঁধে মৃত পুত্রের ভার।’ এই ভার যে না বয়েছেন তার পক্ষে এই ভারের ভর অনুভব করা অসম্ভব। সঙ্গত কারণেই আমাদের ‘এতো চিৎকার’। দু’দিন পরপর গণমাধ্যমকর্মী নির্যাতন আর তাদের উপর হামলার খবর শুনতে শুনতে শায়ানের গানের মতন ক্ষুব্ধতা জাগে। যারা ‘স্পিকটি নট’ থাকেন তাদের বলতে ইচ্ছে করে, ‘ কতোটুকু ক্ষতি চাই তোমাকে জাগাতে হলে, তোমাকেও পাশে পাবো কতোটুকু কেড়ে নিলে।’ না, কাউকে অভিশাপ দিতে নয়, কারও ক্ষতি চাইতে নয়, আমরা যারা হারিয়েছি তারা চিৎকার করছি অন্যদের বাঁচানোর জন্য। তবে এমন চিৎকারে যাদের ঘুম না ভাঙে তাদের জন্যই শায়ান বলেন, ‘কতোটুকু ব্যথা পেলে তোমারও কান্না পাবে?’
আমি নিজেও আমার ছেলের জন্য মানববন্ধনে কথা বলতে গিয়ে সম্মুখে অনেক তরুণদের দেখেছি, যারা নিউজ কাভার করতে এসেছে। কথা বলতে গিয়ে তাদের বলেছি, এই যে আজকে আমার সম্মুখে যে তরুণরা, যারা এক বুক আশা নিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছেন, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? আজও বলছি, আপনাদের নিরাপত্তা আপনাদেরই দিতে হবে। নিরাপত্তা অর্জন করতে হবে। নষ্ট অগ্রজদের লেজুরবৃত্তির শিক্ষাকে নাক কুচকে ঝেড়ে ফেলে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হোন। এই ঐক্যবদ্ধতাই আপনাদের বাঁচাবে। আমাদের বুড়োদের উপর ভরসা করবেন না। আমাদের ঘরে যতক্ষণ না আগুন লাগবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্যের ঘরের আগুনে আমরা শীত পোহাবো। আবারও বলছি বুড়োদের উপর ভরসা নয়, নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হোন। নিজেরা বাঁচুন, অন্যদের বাঁচান।
দুই. ‘বাটাম সংস্কৃতি’ নিয়ে আরো দু’এক কথা বলা উচিত। তার আগে বলি নিহত সাগরের মা’র কথা। উনাকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর বলেছে, আসামিদের ‘ছেড়ে দেওয়া উচিত’। এ কথা কতোটা হতাশার আর বুকের কতোটা পাঁজর ভেঙে বেড়িয়েছে সেটা আমি বুঝি, বোঝে ফাগুনের মা। আমাদের ঘর পুড়েছে বলেই হয়তো আমরা বুঝি। এমন অনেকেই আছেন যারা বোঝেন। যাদের সন্তান খুন হয়েছেন, নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এ সংখ্যাটা লেজুরবৃত্তির বৃত্তে যারা আটকানো তাদের চেয়ে কম বলেই বৃত্তবন্দী তারা বুঝতে পারছেন না। এই বৃত্তটা যখন ভেঙে যাবে তখন হয়তো তারা বুঝবেন। হয়তো তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। ‘বাটাম সংস্কৃতি’র কথায় আসি। চিনের কথা বলি। গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিশ্বের কাছে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার কথা জানিয়েছিলেন যে রিপোর্টার তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি হাপিশ হয়ে গেছেন। একই ভাবে করোনা আক্রান্তদের নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরেক রিপোর্টার। এ সবই ‘বাটাম সংস্কৃতি’ এবং তার ফল। ‘বাটাম সংস্কৃতি’র কৌশলই এটা। যে কৌশলে ‘বাটাম’ খেয়েছেন নিউজ টোয়েন্টিফোরের রিপোর্টার ও ক্যামেরা পার্সন।
বলতে পারেন, এই সংস্কৃতির পরিবর্তন কি সম্ভব নয়? এক কথায় আপাতত নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি এবং আপনারা ঐক্যবদ্ধ না হোন। যুবাদের বিশ্বকাপ জয় দেখে অনুপ্রাণিত হন। তরুণদের ভ্যাট, কোটা সংস্কার, কিশোরদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দেখে শিখুন। তবেই যদি গণমাধ্যমে ‘বাটাম সংস্কৃতি’র বিনাশ ঘটে। আর গণমাধ্যম ‘বাটাম সংস্কৃতি’ মুক্ত হলে, তার ধারাবাহিকতায় অন্যান্য জায়গাগুলো থেকেও সমূলে উৎপাটিত হবে ‘বাটাম সংস্কৃতি’। ডুবে যাবে ‘বাটাম সংস্কৃতি’র ‘মাদার ভ্যাসেল’। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]