বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন

আমাদের নতুন সময় : 17/02/2020

নূহ-উল-আলম লেনিন

বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষাদর্শন এবং শিক্ষাভাবনা তার রাজনৈতিক দর্শন থেকেই উৎসারিত। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মতাদর্শ, দার্শনিক বীক্ষা এবং সমাজচিন্তাসহ জীবনের সব কর্মকাÐের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশের মানুষ। তিনি কেবল বাঙালির জন্য একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তার চিন্তা এবং আজীবনের সংগ্রামকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই রাষ্ট্রটির চরিত্র কেমন হবে, কেমন হবে এর রূপ কাঠামো, রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কর্তব্য, ক্ষমতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের লক্ষ্যও তিনি স্থির করে দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর এই রাষ্ট্রদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার অনেক আগেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা-সমাজভাবনা এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তার নানা বক্তৃতায়, কথায় ও ঘোষণার মাধ্যমে আমরা জেনেছি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, প্রথমে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ এবং তারপর ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না ‘মুক্তি’ ও ‘স্বাধীনতা’ শব্দ দুটির গভীর অর্থ-বঞ্চনা বুঝেই বঙ্গবন্ধু তা চয়ন করেছিলেন। স্বাধীনতার অর্থ সহজবোধ্য। কিন্তু ‘মুক্তি’? বঙ্গবন্ধুই সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন আমাদের সংগ্রাম অর্থনৈতিক মুক্তির। মানুষে মানুষে ভেদ-বৈষম্য অব্যাহত থাকলে, শোষণ-বঞ্চনা, অসাম্য অব্যাহত থাকলে এবং আমরা দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে’। ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু তার ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা’ গড়তে হলে আমার ‘সোনার মানুষ’ চাই। নিরক্ষরতার অভিশাপ দূর করে প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত করতে না পারলে, সোনার মানুষ গড়া যাবে না।
সংবিধান প্রণয়নের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই প্রতিফলিত হয়। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুস্পষ্টবোধ শিক্ষার্থীর চিত্তে জাগ্রত করে তাকে সুনাগরিকরূপে গড়ে তোলাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য’। এই কমিশন দুই বছর নিরন্তর কাজ করে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. অজয় রায় বলেছেন, ‘… শিক্ষা সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে এবং শিক্ষা স্তরের সর্বাঙ্গীন ব্যবস্থাকে স্পর্শ করে একটি বৃহৎ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে নিষ্ঠা ও ধৈর্য সহকারে। কার্জন ও স্যাড্লার কমিশনের পর এতো চমৎকার অনুপুঙ্খ প্রতিবেদন এই উপমহাদেশে তৈরি হয়েছে বলে আমার জানা নেই’।
এই শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার চৌম্বক দিকগুলো হলো : ‘১. … সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা… সালের মধ্যে প্রবর্তন করা, ২. মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে সুসমন্বিত কল্যাণধর্মী ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনযাপনের জন্য সচেতন কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ, সৎ ও প্রগতিশীল জীবন সৃষ্টির সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করা, ৩. দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়াসে প্রয়োজনীয় মধ্যম স্তরের কর্মকুশল দক্ষ ও কর্তব্যনিষ্ঠ কর্মী সরবরাহ করা, ৪. মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা, ৫. প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার স্তরকে প্রাথমিক শিক্ষা-স্তরে উন্নীত করা। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষাভাবনাকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছিলো বাংলাদেশের শিক্ষানীতি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে কেবল ক্ষমতার রদবদলই ঘটেনি। জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে সামরিক শাসকগোষ্ঠী আমাদের সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি এবং রাষ্ট্রের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রূপকে পর্যন্ত পাল্টে দেয়। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শনের পাশাপাশি শিক্ষাদর্শন তথা কুদরাত-এ-খুদা কমিশনও বাতিল করা হয়। পুনর্মুষিকোভব-এর মতো বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানি ভাবাদর্শের কারাগারে আবদ্ধ হয়। ঈষৎ সংক্ষেপিত




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]