• প্রচ্ছদ » » ঘরহীন, রাষ্ট্রহীন ও পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়ায় কেউ তাদের নিতে চায় না, কিন্তু কেন?


ঘরহীন, রাষ্ট্রহীন ও পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়ায় কেউ তাদের নিতে চায় না, কিন্তু কেন?

আমাদের নতুন সময় : 19/02/2020

প্রভাষ আমিন

সোমবার সকালে ঘুম ভাঙে অফিসের ফোনে। সেন্টমার্টিনের কাছে ট্রলার ডুবেছে। অনেকেই নিখোঁজ। মনটা খারাপ হয়ে যায়। সব মৃত্যুই ভয়ঙ্কর। তবে সাগরের মাঝখানে গাদাগাদি করে মানুষ বোঝাই ছোট্ট একটা ট্রলার যখন ডুবে যায়, তাও গভীর রাতে; মানুষ বড্ড অসহায় হয়ে যায় তখন। ভাবুন একবার, চারপাশে অথৈ সাগর। ওই অক‚ল পাথারে সাঁতার জানা না জানায় কিছু যায়-আসে না। বিদায়ের আগে যে একবার পৃথিবীকে দেখবে, সে উপায়ও নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অসহায় ডুবে যাওয়া। জরুরি সেবা ৯৯৯ ছিলো বলে এতো কিছুর মধ্যেও ৭৩ জনকে উদ্ধার করা গেছে। ১৫ জনের তবু লাশ পাওয়া গেছে। বাকি ৫০ জনের কোনো খোঁজ নেই। জীবিত পাওয়ার তো নেই, তাদের লাশও হয়তো কখনো পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই আপনাদের কাউকে বলে দিতে হবে না, অসহায় এই মানুষগুলো রোহিঙ্গা।
ঘরহীন, রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন এই মানুষগুলো কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়ায়, কেউ তাদের নিতে চায় না। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় মানবগোষ্ঠী এই রোহিঙ্গা। স্বীকৃতি থাকুক না থাকুক, ঘর থাকুক না থাকুক; রোহিঙ্গারাও তো মানুষ। কিন্তু এই ভাবনাটাতেই আমাদের বড় গলদ হয়ে যায়। জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট বাংলাদেশ ১১লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়। আর যাদের আশ্রয় দেওয়ার সামর্থ্য-সুযোগ আছে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। মিয়ানমার তাড়িয়ে দেয়, ভারত আশ্রয় দেয় না, চীন-রাশিয়া মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ায়। দেখেশুনে আমি অবাক হয়ে যাই, হতাশ হয়ে যাই; তথাকথিত সভ্যতার ওপর ঘেন্না ধরে যায়। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আলোচনা এলেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, চীন, ভারত, রাশিয়া সবাই নিজ নিজ স্বার্থ দেখবে। আমিও জানি, সবাই নিজের স্বার্থটাই সবার আগে দেখবে। কিন্তু তাই বলে মানবতার কথা, ন্যায্যতার কথা কেউ ভাববে না; একুশ শতকেও আমাদের এটা দেখতে হবে। আমার স্বার্থ, তাই বলে আমি মানুষের জীবনের কথা ভাববো না।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতা ডুবে যাচ্ছে আর ভেসে উঠছে শুধু স্বার্থ। এই দেখতে দেখতে যখন সভ্যতার ওপরই আমার বিশ্বাস টুটে যাচ্ছিল, তখন সেটা ফিরিয়ে দিলো আফ্রিকার ছোট দেশ গাম্বিয়া। মিয়ানমারে গণহত্যা হচ্ছে, এমন অভিযোগে গতবছরের নভেম্বরে নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজ)-তে মামলা করে গাম্বিয়া। মিয়ানমার প্রথমে গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল। পরে দাবি করেছিল, আরাকানে কোনও গণহত্যা হয়নি। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি হেগে’র আইসিজের শুনানিতে অংশ নিয়ে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গান। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। আইসিজে গাম্বিয়ার অভিযোগকে বিবেচনায় গত মাসে চারটি অন্তবর্তী আদেশ দিয়েছে। আইসিজে সরাসরি গণহত্যা না বললেও আইসিজে’র অন্তবর্তী আদেশে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত সহিংসতা ও বৈষম্যের নীতিতে গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। অন্তবর্তী চার আদেশে গণহত্যার সনদ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন থেকে নিবৃত্ত থাকা, সেনাবাহিনী বা অন্য কেউ যাতে গণহত্যা সংঘটন, ষড়যন্ত্র বা উসকানি দিতে না পারে তা নিশ্চিত করা, গণহত্যার অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব সাক্ষ্যপ্রমাণ রক্ষা করা এবং চার মাসের মধ্যে আদেশ অনুযায়ী মিয়ানমার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তা আদালতকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। মিয়ানমার আইসিজের আদেশ সুড়সুড় করে মেনে নেবে, নিপীড়ন বন্ধ করবে; এমন আশা আমি করিনি বা করছিও না; বরং আইসিজের আদেশের দু’দিনের মধ্যে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আইসিজের আদেশ মানবে না। তারপরও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এই আদেশ মানবতার ওপর আমার বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। কেন সেটা পরে বলছি।
তার আগে বলি, মানবতার বিপক্ষে যেমন কেউ কেউ আছেন, পক্ষে থাকা লোকের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। মুখে মুখে হলেও সবাই বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে, তাদের নিরাপদে নিজেদের ভূমিতে ফিরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সেটা করতে হলে মিয়ানমারের ওপর যতটা চাপ দেওয়া দরকার; ততটা চাপ দেওয়া হচ্ছে না। হচ্ছে না, কারণ মানবতার বিপক্ষের লোকেরা আবার কৌশলে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আইসিজের অন্তবর্তীকালীন আদেশের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছিল। কিন্তু চীনের ভেটো, সঙ্গে ভিয়েতনামের আপত্তিতে এ ব্যাপারে কোনও যৌথ বিবৃতি দিতে পারেনি। অথচ নিরাপত্তা পরিষদের শক্ত অবস্থান আইসিজের আদেশ মানার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে পারতো। চীন ও ভিয়েতনাম কোন মুখে, কীভাবে আইসিজের আদেশের বিরোধিতা করে, আমি বুঝি না। আইসিজে তো নিপীড়ন বন্ধ করতে বলেছে। তাহলে কি চীন-ভিয়েতনাম চায় নিপীড়ন চলুক? তাদের এই মানবতাবিরোধী অবস্থানে মন খারাপ হলেও আবার মন ভালো হয়ে যায়, কারণ নিরাপত্তা পরিষদ যৌথ বিবৃতি দিতে না পারলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আলোচনার পর আইসিজে’র আদেশের বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে আইসিজের আদেশ মেনে চলতে মিয়ানমারের প্রতি আহŸান জানিয়ে বলা হয়েছে, আদালতের আদেশ মেনে চলার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বলছিলাম, সভ্যতার ওপর বিশ্বাস ফিরে আসার কথা। চীন-ভিয়েতনামের মানবতাবিরোধী অবস্থানে মন যতটা খারাপ হয়; ততটাই ভালো হয়ে যায় আইসিজের-এর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-আইসিসির উদ্যোগে। আইসিসি এবার রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। আইসিজে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে আর আইসিসি খুঁজবে ব্যক্তির অপরাধ। দুটি আদালতই নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগে অবস্থিত। দ্য হেগ থেকে আইনের শাসন আর মানবতার যে পতাকা উড়লো, তা মানব সভ্যতাকেই এগিয়ে নেবে সামনের দিকে। আসলে ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার যে প্রকল্প নিয়ে মাঠে মিয়ানমার, তা সভ্যতার জন্যই এক কলঙ্ক। সবাই যেভাবে স্বার্থের গল্প শোনাচ্ছিলেন, তাতে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম; আইনের শাসন, সভ্যতা, মানবাধিকার, মানবতা বলে বুঝি আর কিছু নেই। আইসিজে আর আইসিসি আমাদের সে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে দিলো। একটা কথা প্রমাণিত হলো, অন্যায় কখনও তামাদি হয় না। বাংলাদেশে ৪৭ বছর পর যেমন একাত্তর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়, তেমনি বিশ্বের যেখানেই যে অন্যায় করবে; কখনও না কখনও তার বিচার হবেই। সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে হাল ছাড়ার কিছু নেই। আর বিশ্বের যেখানেই অন্যায় হোক, সবার অধিকার আছে তার প্রতিবাদ করার, তা রুখে দাঁড়ানোর। এবার যেমন নিজেরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় তুলেছে। মানবতা আক্রান্ত হলে আসলে প্রতিটি দেশ, প্রতিটি মানুষ আক্রান্ত হয়।
আশা করি চীন, ভারত, রাশিয়া, ভিয়েতনামও বিষয়টি বুঝবে। সবাই মিলে মিয়ানমারকে চাপ দেবে, তাদের ভুলটা বুঝিয়ে দেবে। এখানে পক্ষটা বাংলাদেশ-মিয়ানমার নয়। এখানে ন্যায়-অন্যায়, মানবতা আর মানবতাবিরোধিতার লড়াই। আমাদের অবশ্যই মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আগে তো মানুষের জীবন বাঁচবে, তারপর স্বার্থ। লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]